সাইবার নিরাপত্তায় এআইয়ের দ্বিমুখী প্রভাব ও নতুন আতঙ্ক
জেনারেটিভ এআইয়ের বিশ্বব্যাপী বিস্তার সাইবার নিরাপত্তার সমীকরণকে নাটকীয়ভাবে বদলে দিয়েছে। এআই প্রযুক্তি একদিকে যেমন সফটওয়্যার সুরক্ষা মজবুত করতে সাহায্য করছে, অন্যদিকে এটি সাইবার অপরাধীদের জন্য মারাত্মক এক ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ বা শক্তি বৃদ্ধিকারী মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রচলিত সাইবার আক্রমণের দক্ষতা না থাকলেও এখন কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অপরাধীরা তুলনামূলক কম সময়ে এবং সহজে জটিল সব সাইবার হামলা চালাতে পারছে।
সাইবার অপরাধের ‘গণতন্ত্রীকরণ’ ও অসম লড়াই
আগে কোনো বড় ধরনের সাইবার হামলা চালাতে যে ধরনের কারিগরি দক্ষতা বা সপ্তাহের পর সপ্তাহ গবেষণার প্রয়োজন হতো, এখন তা একটি উন্নত লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম)-এর মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টাতেই সম্ভব হচ্ছে। উপরন্তু, সাইবার নিরাপত্তা ক্ষেত্রটি নীতিগতভাবেই অসমান বা ‘অ্যাসিমেট্রিক’। একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞকে সম্ভাব্য সব ধরনের দুর্বলতা বা ডিজিটাল ছিদ্র বন্ধ করতে হয়, অথচ একজন হ্যাকারের জন্য একটিমাত্র গোপন ত্রুটি বা ‘জিরো-ডে ভালনারেবিলিটি’ খুঁজে পাওয়াই আক্রমণের জন্য যথেষ্ট। এআই ব্যবহার করে এই ধরনের গোপন সফটওয়্যার ত্রুটি খুঁজে বের করা এখন বহুগুণ সহজ হয়ে গেছে।
সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফিশিং আক্রমণের বিস্তার
সাইবার অপরাধীদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য থাকে সাধারণ ব্যবহারকারীর ভুল বা অসচেতনতাকে কাজে লাগানো। আগে ফিশিং ইমেইলগুলোতে ব্যাকরণগত ভুল বা অসংগতি দেখে সহজে চেনা যেত। তবে এআইয়ের ব্যবহারে এখন অত্যন্ত সাবলীল, নির্ভুল ও ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ‘স্পিয়ার ফিশিং’ বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ করে তৈরি বার্তা পাঠানো হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ফিশিং ইমেইলে এআই ব্যবহারের কারণে এই ধরনের ভুয়া লিংকে ব্যবহারকারীদের ক্লিক করার হার একলাফে ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৫২ শতাংশে পৌঁছেছে। পাশাপাশি মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করা (ভয়েস ক্লোনিং) এবং ডিপফেক ব্যবহার করে প্রতারণার হারও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এআই এজেন্ট ও নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি
ডিজিটাল কাজের গতি বাড়াতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এখন এআই এজেন্ট বা স্বয়ংক্রিয় অ্যাসিস্ট্যান্ট (যেমন- ওপেনক্ল) ব্যবহার করছেন। এই এজেন্টগুলোকে ইমেইল, ক্যালেন্ডার, আর্থিক অ্যাকাউন্ট এবং অভ্যন্তরীণ সিস্টেমের উচ্চমাত্রার প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। তবে এআই এজেন্টগুলোর মৌলিক নিরাপত্তার বোঝাপড়া না থাকায় এগুলো সাইবার অপরাধীদের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে। ‘প্রম্পট ইনজেকশন’ আক্রমণের মাধ্যমে ওয়েবসাইটের গোপন কোড বা বার্তার ভেতরে ক্ষতিকর নির্দেশনা লুকিয়ে রাখা হচ্ছে, যা এআই এজেন্টগুলো অজান্তেই সম্পাদন করে প্রতিষ্ঠানের সংবেদনশীল তথ্য পাচার করে দিচ্ছে।
ডিফেন্ডার বা সুরক্ষাকারীদের পাল্টা পদক্ষেপ
সাইবার অপরাধীরা দ্রুত নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করলেও নিরাপত্তাকর্মীরা হাল ছেড়ে দিচ্ছেন না। ট্রেন্ড মাইক্রোর জরিপ অনুযায়ী, ডিপফেক প্রতিরোধ এবং প্রম্পট ইনজেকশনের মতো অ্যাপ্লিকেশন হামলা ঠেকাকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে। মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ‘প্রজেক্ট পারসেপশন’-এর মতো এজেন্টভিত্তিক এআই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যেখানে লাল (পেনাল্টি বা হ্যাকিং পরীক্ষা), নীল (ঝুঁকি মূল্যায়ন) এবং সবুজ (প্রতিরোধ) নামের দল গঠন করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে এআইয়ের এই দ্রুত উত্থান সাইবার জগতকে এক বিরামহীন দৌড়ঝাঁপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, যেখানে প্রতিরক্ষার চেয়ে আক্রমণের সুযোগ সাময়িকভাবে হলেও খানিকটা এগিয়ে রয়েছে।
ডিবিটেক/বিএমটি





