নিষিদ্ধ না হলেও কেন আমেরিকার বাজারে শাওমির ফোন দেখা যায় না?
আমেরিকাবাসী যখন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্মার্টফোন ব্র্যান্ডগুলোর তালিকার দিকে তাকায়, তখন তারা একটি রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়: বিশ্ববাজারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও যুগান্তকারী কিছু মোবাইল প্রযুক্তি থেকে তারা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। মার্কিন ক্রেতারা মূলত অ্যাপল, স্যামসাং, গুগল এবং মটোরোলার মতো হাতে গোণা কয়েকটি ব্র্যান্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে গেলেই অপো, রিয়েলমি, অনার, হুয়াওয়ে এবং অবশ্যই শাওমির মতো ব্র্যান্ডগুলোর এক বিশাল সমাহার দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও, এই প্রতিবেদন লেখার সময় শাওমি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মোবাইল বিক্রেতা, যার দখলে রয়েছে বিশ্ববাজারের প্রায় ১০ শতাংশ শেয়ার। অনেক মার্কিন নাগরিকই ধরে নেন যে, শাওমি ১৭ আল্ট্রার মতো তাদের সর্বশেষ ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলো যেহেতু চীনের মালিকানাধীন, তাই হয়তো হুয়াওয়ের মতো এগুলোও যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ। কিন্তু বিষয়টি আসলে তা নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র আকার ধারণ করলেও এবং স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ওয়াই-ফাই রাউটার পর্যন্ত অনেক কিছুই ব্ল্যাকলিস্ট বা কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেও, শাওমি কেবল কয়েক বছর আগে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য এর মুখে পড়েছিল। আমেরিকার বাজারে তাদের ফোন বিক্রি না হওয়ার আসল কারণটি রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চেয়ে অনেক বেশি সরল: কোম্পানিটি নিজেই মার্কিন বাজারে প্রবেশের জন্য তেমন কোনো জোরালো প্রচেষ্টা চালায়নি। মূলত আমেরিকার বাণিজ্যিক পরিবেশ শাওমির নিজস্ব ব্যবসায়িক নীতির সাথে খাপ খায় না, এবং এরই মধ্যে চীন ও অন্যান্য বাজারে তাদের পণ্যের মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত হচ্ছে।
শাওমি কিন্তু (খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য) মার্কিন ব্ল্যাকলিস্টে ছিল
আপনার যদি মনে পড়ে যে যুক্তরাষ্ট্রে শাওমি ফোন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তবে আপনার স্মৃতি একেবারে ভুল নয়। ২০২১ সালের শুরুর দিকে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ক্ষমতা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তাঁর প্রশাসন চীনা প্রযুক্তির ওপর একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে হুয়াওয়ের ওপর, যা মার্কিন বাজারে অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছিল। ২০২১ সালের ১৪ জানুয়ারি রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, চীনা সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক থাকার অভিযোগে শাওমিকেও একটি ব্ল্যাকলিস্টে যুক্ত করে ট্রাম্প প্রশাসন। এর ফলে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য শাওমির শেয়ার লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়।
তবে সেই নিষেধাজ্ঞা বেশিদিন টেকেনি। মাত্র দুই সপ্তাহ পরেই শাওমি এই আদেশের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে মামলা ঠুকে দেয়। ফলশ্রুতিতে, কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার মাত্র চার মাসের মাথায়, ২০২১ সালের ২৫ মে মার্কিন সরকার শাওমির ওপর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়। এরপর আইনিভাবে শাওমি গ্যাজেট যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা না থাকলেও, কোনো মার্কিন নাগরিককে সাধারণত এই ফোন ব্যবহার করতে দেখা যায় না।
আমেরিকার বাজারে শাওমি প্রবেশ না করার একটি বড় কারণ বেশ স্পষ্ট। সেখানে ব্যবসা করতে যাওয়া মানে শাওমির মাথার ওপর সব সময় একটি ‘ড্যামোক্লিসের তরবারি’ বা অনিশ্চয়তার তলোয়ার ঝুলিয়ে রাখা। একবার যেহেতু তারা মার্কিন সরকারের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল এবং মার্কিন আইনপ্রণেতাদের কাছে যেহেতু চীনা প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত একটি জুজু বা আতঙ্কের নাম, তাই কোম্পানিটি নিশ্চিত হতে পারে না যে—অ্যাপল-স্যামসাংয়ের দ্বৈত আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করার পর আবারও কোনো রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে তাদের নিষিদ্ধ করা হবে না কিনা। তবে এর বাইরেও আরও কিছু বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে শাওমি ফোন নেই, তবে অন্য গ্যাজেট মিলবে
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ স্মার্টফোন ব্র্যান্ড হিসেবে আমেরিকার স্টোরগুলোতে আইফোন বা গ্যালাক্সির পাশেই শাওমি থাকার কথা ছিল। কিন্তু মার্কিন বাজার থেকে দূরে থাকার পেছনে শাওমির নিজস্ব কিছু স্ট্র্যাটেজি রয়েছে।
প্রথমত, ব্র্যান্ড কৌশল। যদিও শাওমির ফ্ল্যাগশিপ হার্ডওয়্যার এখন অবিশ্বাস্য উচ্চতায় পৌঁছেছে—তাদের শক্তিশালী প্রসেসর এবং পকেটে নেওয়ার মতো সেরা ক্যামেরা সিস্টেম রয়েছে—তথাপি কোম্পানিটি মূলত উন্নয়নশীল বাজারগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করেই এই সাফল্য পেয়েছে। আমেরিকার মতো একটি পরিপক্ব বা ম্যাচিউরড বাজারে প্রবেশ করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
অ্যান্ড্রয়েড সেন্ট্রালের তথ্যমতে, শাওমি সব সময় মাত্র ৫ শতাংশের মতো অত্যন্ত কম প্রফিট মার্জিন বা লভ্যাংশ রেখে ফোন বিক্রি করার জন্য গর্ববোধ করে, যাতে কম দামে সেরা হার্ডওয়্যার দেওয়া যায়। কিন্তু মার্কিন বাজারে ব্যবসা করতে গেলে দেশটির মোবাইল ক্যারিয়ার বা অপারেটরদের সাথে চুক্তি করা বাধ্যতামূলক, যা অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। শাওমির নেতৃত্বের কাছে এই বাজারে ঢোকার ঝক্কিটা লাভের চেয়ে অনেক বেশি মনে হয়েছে।
অবশ্য আমেরিকানরা চাইলে এখনও শাওমির পণ্য কিনতে পারেন, তবে ফোন কিনতে হলে তাদের অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক বা ইমপোর্ট কস্ট দিয়ে বাইরে থেকে আনিয়ে নিতে হবে। তবে আমেরিকার লোকাল স্টোরে বা আমাজনে শাওমির এয়ার পিউরিফায়ার, চার্জার, ডেস্ক অ্যাক্সেসরিজ কিংবা তাদের তৈরি চমৎকার কর্ডলেস স্ক্রু-ড্রাইভার সহজেই পাওয়া যায়।
এদিকে, শাওমি এখন তাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রযুক্তিগুলো নিয়ে কাজ করছে নিজেদের দেশের মাটিতে। চীনের দ্রুত বর্ধনশীল বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে শাওমি ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি হাই-টেক গাড়ি উন্মোচন করেছে। শাওমির ‘এসইউ৭’ সেডান গাড়িটি সরাসরি পোরশের সাথে প্রতিযোগিতা করার দাবি করে, যার ২০২৬ সালের মডেলটির দাম মাত্র ৩২,০০০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। তবে দুর্ভাগ্যবশত, শাওমির এই গাড়িগুলোর মার্কিন সড়কে চলার মতো প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেশন বা অনুমতি নেই। তাই শাওমির গাড়ি এবং ফ্ল্যাগশিপ ফোনের যুগলবন্দী উপভোগ করতে হলে কোনো মার্কিন নাগরিককে প্রবাসে পাড়ি জমানো ছাড়া উপায় নেই।
ডিবিটেক/বিএমটি । সূত্র: এনগ্যাজেট





