সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট নকল করে প্রতারণা করছে সাইবার অপরাধীরা

সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট নকল করে প্রতারণা করছে সাইবার অপরাধীরা
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১৯:৪১  

কোনো একটি খবরের সত্যতা নিশ্চিত করতে আমরা সাধারণত নির্ভরযোগ্য ও পরিচিত সংবাদমাধ্যমগুলোর ওয়েবসাইটের ওপর ভরসা করি। আর মানুষের এই বিশ্বাসের সুযোগটিই এখন নিচ্ছে সাইবার অপরাধীরা। পাঠকদের অজান্তেই তাদের টাকা হাতিয়ে নিতে নামিদামি সব সংবাদ প্রকাশনা সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে তারা। সম্প্রতি ব্রিটিশ ধনকুবের জিম র‍্যাটক্লিফকে জড়িয়ে বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর ওয়েবসাইট হুবহু ক্লোন বা নকল করে ভুয়া প্রতিবেদন তৈরির ঘটনা এর অন্যতম বড় উদাহরণ।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জালিয়াতি চক্রগুলো নামিদামি সংবাদপত্রের লে-আউট, টাইপোগ্রাফি (লেখার ফন্ট), নেভিগেশন মেনু, এমনকি আসল সাংবাদিকদের নাম ও প্রোফাইল ছবি হুবহু কপি করে নিখুঁত সব নকল ওয়েবসাইট বানাচ্ছে। সেখানে ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং বোগাস বা ভুয়া বিনিয়োগের লোভনীয় অফার সংবলিত বানোয়াট খবর প্রকাশ করা হচ্ছে। কোনো ভুক্তভোগীকে সরাসরি হ্যাক করার পরিবর্তে প্রতারকেরা প্রথমে তাদের বিশ্বাস করায় যে তারা কোনো প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের আসল সাংবাদিকতার প্রতিবেদন পড়ছে।

কীভাবে ফাঁদ পাতা হচ্ছে?
সম্প্রতি ছড়ানো একটি ভুয়া আর্টিকেলে দাবি করা হয় যে, ধনকুবের জিম র‍্যাটক্লিফ বিবিসি-র এক সাক্ষাৎকারে তাঁর ব্যক্তিগত অর্থায়নের গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর রেগে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে যান। এরপর সেই বানোয়াট প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ধনকুবের মূলত একটি গোপন অনলাইন ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। পাঠকদেরও একই সুযোগ নিতে প্রতিবেদনের নিচে দেওয়া একটি লিংকে ক্লিক করতে উৎসাহিত করা হয়।

বাস্তবে এর কোনো কিছুই সত্যি নয়। ওই লিংকে ক্লিক করলে কোনো আসল বিনিয়োগ সেবা আসে না, বরং একটি নামি ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মের হুবহু নকল সংস্করণ সামনে আসে। সেখানে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সাবমিট করতে বলা হয়। তথ্য দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রতারক চক্রের কাছ থেকে ভুক্তভোগীর ফোনে কল আসে এবং তাকে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা শেয়ার বাজারে টাকা খাটানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়। আসলে এই বিনিয়োগগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই- একমাত্র লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নগদ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।

এর আগে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক ক্যাম্পেইনার মার্টিন লুইসকে জড়িয়ে বিবিসির এআই-জেনারেটেড ভুয়া আর্টিকেল এবং প্রখ্যাত ব্রডকাস্টার স্যার ডেভিড অ্যাটেনবোরোকে জড়িয়ে গার্ডিয়ানের লোগো ব্যবহার করে একই ধরণের বিনিয়োগের ফাঁদ তৈরি করা হয়েছিল। ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা ‘ফুল ফ্যাক্ট’ জানিয়েছে, র‍্যাটক্লিফের একটি ভুয়া ছবিতে গুগলের ‘সিন্থআইডি’ ওয়াটারমার্কও পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে ছবিটি গুগলের এআই ইমেজ জেনারেশন টুল দিয়ে তৈরি।

প্রতারণাকে আরও নিখুঁত করছে এআই:
জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির উৎকর্ষতার কারণে এখন খুব সহজেই অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য স্ক্যাম বা প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করা যাচ্ছে। আগে ফিশিং পেজগুলোতে বানান ভুল বা নিম্নমানের ডিজাইন দেখে সহজে চেনা যেত। কিন্তু এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে মাত্র কয়েক মিনিটে আসল সংবাদপত্রের মতো হুবহু শিরোনাম, পেশাদার দেখতে ছবি এবং মার্জিত আর্টিকেল তৈরি করে ফেলছে অপরাধীরা।

চেনার উপায় ও সুরক্ষার কৌশল:
কঠিন হলেও এই ধরনের প্রতারণামূলক ওয়েবসাইট চেনার কিছু উপায় রয়েছে:

    অস্বাভাবিক শিরোনাম: ভুয়া আর্টিকেলগুলোতে সাধারণত অতিমাত্রায় দীর্ঘ, চাঞ্চল্যকর এবং চটকদার শিরোনাম ব্যবহার করা হয়, যা মূল ধারার সংবাদমাধ্যমগুলো সাধারণত করে না।

    বিনিয়োগের তাগিদ: এই প্রতিবেদনগুলোর ভেতরেই সরাসরি টাকা বিনিয়োগ করার জন্য প্রলুব্ধকর লিংক বা বাটন যুক্ত থাকে। আসল সাংবাদিকতার প্রতিবেদনে কখনো পাঠককে তড়িঘড়ি কোনো ইনভেস্টমেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য চাপ দেওয়া হয় না।

    ইউআরএল যাচাই: যেকোনো সংবাদের লিংকে ক্লিক করার আগে ব্রাউজারের অ্যাড্রেস বারে গিয়ে ওয়েবসাইটের মূল ইউআরএল বা ডোমেইন নেমটি ভালো করে পরীক্ষা করে নিন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার হওয়া লিংকের ওপর অন্ধবিশ্বাস না করাই শ্রেয়।

ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ‘ক্রাকেন’- যাদের ব্র্যান্ডিংও এই প্রতারণায় ব্যবহার করা হয়েছে, তারা সতর্ক করে বলেছে, যেকোনো ওয়েবসাইট যদি তাদের নাম ব্যবহার করে নিশ্চিত মুনাফার কথা বলে, তবে সেটিকে ভুয়া হিসেবে গণ্য করতে হবে। 

বর্তমানে দ্য গার্ডিয়ান ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যমগুলো ব্রিটিশ হোম অফিস এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে যৌথভাবে এই ধরনের ভুয়া বিজ্ঞাপন ও নকল ডোমেইন ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে ফেলার কাজ করছে। এআই-এর যুগে এখন কেবল পরিচিত লোগো দেখেই কোনো সাইটকে বিশ্বাস করা নিরাপদ নয়, সচেতনতাই আর্থিক জালিয়াতি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।

ডিবিটেক/বিএমটি    ।   সূত্র: ডিজিটাল ট্রেন্ডস