৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড এর ভবিষ্যত কি?

৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড এর ভবিষ্যত কি?
১০ নভেম্বর, ২০২৫ ০৫:২৯  

অলওয়েজ অন নেটওয়ার্ক নামে একটি আইএসপিকে বিনামূল্যে বরাদ্দ দেওয়া ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম নিলামের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এরই অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরেই মোবাইল অপারেটরদের জন্য ২৫ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বরাদ্দ দিতে প্রস্তুত থাকলেও এরইমধ্যে মোবাইল অপারেটররা এই নিলামের ভিত্তিমূল্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের জবাবে শর্তসাপেক্ষে ১০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলো সরকার। 

১৬ মার্চ গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের মূল বিনিয়োগকারীরা তরঙ্গমূল্য নিয়ে  প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে চিঠি লিখলে তিনি বিনিয়োগকারীদের কাছে পাঠানো চিঠিতে জানিয়েছিলেন, ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ডিভাইস প্রবৃদ্ধির নিম্নহার বিবেচনায় রেখে সরকার ৫ থেকে ১০ শতাংশ মূল্যছাড়ের বিষয়টি যৌক্তিকভাবে বিবেচনা করতে পারে, যা নির্ভর করবে অপারেটরদের অবকাঠামো উন্নয়ন, নাগরিকদের জন্য মানসম্মত সেবা ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণের প্রতিশ্রুতির ওপর।

তবে সেই চিঠি খুব একটা আশ্বস্ত করতে পারেনি অপারেটরদের। ফলে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম নিলামকে কেন্দ্র করে ফের উদ্বেগ জানিয়ে গত ২ নভেম্বর যৌথভাবে বিটিআরসি চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি দিয়েছে  দেশের তিনটি প্রধান মোবাইল অপারেটর- গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা এবং বাংলালিংক। চিঠিতে অপারেটরগুলো বর্তমান নিলাম কাঠামো ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং নীতিনির্ধারকদের পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ, রবির চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শহেদ আলম এবং বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড বিশ্বব্যাপী “কভারেজ স্পেকট্রাম” হিসেবে স্বীকৃত, যা গ্রামীণ ও অনুন্নত এলাকায় সংযোগ সম্প্রসারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় স্পেকট্রাম রোডম্যাপ (২০২৪)-এ এই ব্যান্ডে ২×৪৫ মেগাহার্টজ বরাদ্দ থাকলেও বর্তমান নিলাম পরিকল্পনায় মাত্র ২×২৫ মেগাহার্টজ বাজারে ছাড়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অপারেটরদের মতে, এটি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করবে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে স্পেকট্রামের দাম বাড়িয়ে তুলবে।

তারা আরও জানিয়েছে, ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের মূল্য বর্তমানে ৯০০ ও ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের সমপর্যায়ে ধরা হচ্ছে, যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ এই দুই ব্যান্ডের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বে কোথাও ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের মূল্য ৯০০ বা ১৮০০ মেগাহার্টজের সঙ্গে তুলনা করে নির্ধারণের নজির নেই। বর্তমানে বাজারে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের প্রায় ১০০ শতাংশ ৯০০ ও ১৮০০ ব্যান্ড সমর্থন করে, কিন্তু ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড সমর্থন করে মাত্র ৩৫ শতাংশ হ্যান্ডসেট। ফলে এই ব্যান্ডের বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।

অপারেটরদের হিসাবে, প্রস্তাবিত ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের প্রতি মেগাহার্টজের দাম ২৮৪ কোটি টাকা (ভ্যাটসহ) নির্ধারণ করা হয়েছে। এমনকি ১০ শতাংশ ছাড় দিলেও এটি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিকভাবে যৌক্তিক নয় বলে তারা মনে করছে। তারা উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক সংস্থা জিএসএমএ তাদের গবেষণায় বলেছে, নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সির স্পেকট্রাম (৭০০ মেগাহার্টজের মতো) মূলত সংযোগ বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত হয়, সরাসরি রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য নয়। গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী সাব-১ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের গড় মূল্য প্রায় ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ৭০০ মেগাহার্টজ একটি নতুন স্পেকট্রাম শ্রেণি হওয়ায় এটি ব্যবহার করতে হলে নতুন রেডিও সরঞ্জাম, অ্যান্টেনা, সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। প্রতিটি টাওয়ার সাইটে নতুন সরঞ্জাম স্থাপনের জন্য টাওয়ার কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হবে, যা অপারেটরদের পরিচালন ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলবে।

অপারেটরদের দাবি, দেশের টেলিকম খাতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কয়েক বছর ধরেই ক্রমাগত কমছে। নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সন্তুষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তারা বলছে, এই পরিস্থিতিতে বর্তমান মূল্য কাঠামোয় নিলামে অংশ নেওয়া ব্যবসায়িকভাবে অযৌক্তিক এবং আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে স্পেকট্রামের দাম যেন অপারেটরদের জন্য টেকসই বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং দেশব্যাপী মানসম্মত সংযোগ সম্প্রসারণে সহায়ক হয় সেজন্য সরকার ও বিটিআরসিকে অনুরোধ করেছে তারা। 

তিন অপারেটরের ভাষ্য মতে, বর্তমানে স্পেকট্রাম ব্যয়ের চাপ, বাজারে সীমিত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি আপগ্রেডের উচ্চ খরচ-সব মিলিয়ে টেলিকম খাতটি আর্থিকভাবে সংকটময় অবস্থায় আছে। এমতাবস্থায় সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির অব্যাহত লক্ষ্য বিনিয়োগ ও নীতি নির্ধারণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জের হয়ে উঠেছে।

সূত্রমতে, ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের সঠিক ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ না হলে, অপারেটররা নিলামে অংশ নেয়া থেকে একজোটে বিরত থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড ‘অপ্রয়োগযোগ্য ব্যান্ড’ হিসেবেই থেকে যেতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

প্রসঙ্গত, ২৪ মে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান অলওয়েজ অন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ লিমিটেডের অনুকূলে সাতশ মেগাহার্টজ বরাদ্দকৃত তরঙ্গ বাতিল করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

ডিবিটেক/আইএইচ/ওআর