বাজেট ২০২৬-২৭: ডিজিটাল কমার্সে বড় প্রাপ্তি ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার পাস্ট বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল কমার্স খাতের জন্য ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন, উৎস কর প্রত্যাহার এবং ল্যাপটপ-কম্পিউটারে শুল্কমুক্ত আমদানির মতো যুগান্তকারী সংস্কার আনা হয়েছে। নিবন্ধটিতে এই প্রাপ্তিগুলোর চুলচেরা আইনি বিশ্লেষণ এবং মাঠপর্যায়ে তা শতভাগ বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জসমূহ তুলে ধরা হয়েছে।

বাজেট ২০২৬-২৭: ডিজিটাল কমার্সে বড় প্রাপ্তি ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
৫ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৩৪  
৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৪৫  

গত ৩০ জুন, ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে চূড়ান্তভাবে পাস হওয়া ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক। একজন উদ্যোক্তা ও খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে আমার কাছে এই বাজেটের সবচেয়ে বড় গুরুত্বের জায়গাটি হলো দেশের আইটি, ডিজিটাল কমার্স এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম। এই খাতের জন্য বাজেটে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কারের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা এই খাতের পুরো চেহারাটাই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। প্রকৃতপক্ষে, এই বাজেটে বাংলাদেশ সরকারের "সবার আগে বাংলাদেশ" নীতির এক সুদূরপ্রসারী প্রতিফলন দেখা গেছে। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং একটি স্বনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক 'স্মার্ট ইকোনমি' বিনির্মাণ করাই যে বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি, তা স্পষ্ট।

আজকের দিনে ই-ক্যাব (e-CAB)-এর ৩ হাজারেরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক সদস্য এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৫ লাখের অধিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অনলাইন উদ্যোক্তাদের জন্য এই বাজেটটি অত্যন্ত জীবনমুখী। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স Research অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম (DCRAF) এবং খাতের অংশীজনদের পক্ষ থেকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণী মহলে যে ৩০ দফার একটি সুনির্দিষ্ট মাস্টার প্ল্যান ও সংস্কার দাবি তুলে ধরেছিলাম, এবারের বাজেটে তার প্রায় ৭০ শতাংশেরই সরাসরি প্রতিফলন ঘটেছে।

কর ও ভ্যাট নীতিমালায় কাঠামোগত স্বস্তি: ফাইন্যান্স অ্যাক্ট ২০২৬-এর বিশ্লেষণ

এবারের বাজেটে ভ্যাট আইন ও আয়কর আইনের বেশ কিছু ধারা, উপধারা ও তফসিলে (Schedules) যুগান্তকারী সংশোধন এনে আইটি ও অনলাইন সেক্টরের দীর্ঘদিনের কিছু জটিলতা দূর করা হয়েছে:

  • ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন সুবিধা: মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৪৫(১) এবং বিধি ৪৭-এর বিশেষ সংশোধনীর (অর্থ আইন, ২০২৬ দ্বারা পরিমার্জিত) মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (SME) অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার তীব্র ভোগান্তি থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে উদ্যোক্তারা প্রতি ৩ মাস পর পর, অর্থাৎ বছরে মাত্র ৪ বার ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।

  • স্টার্টআপ কর অব্যাহতি (Tax Holiday): আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২২ এবং দ্বিতীয় তফসিলের আওতায় নতুন এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপগুলোর প্রারম্ভিক মূলধনের সংকট দূর করতে প্রথম ৫ বছরের জন্য করের হার শূন্য শতাংশ ($0\%$) করা হয়েছে।

  • উৎস কর প্রত্যাহার: আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১২৪ ও ৫৩-এর বিশেষ সংশোধনী অনুসারে, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম (যেমন- YouTube, Facebook) এবং গ্লোবাল ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস থেকে উপার্জিত বৈদেশিক রেমিট্যান্সের ওপর বিদ্যমান ৭.৫% উৎস কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

ই-কমার্সের স্থায়ী শিল্প ও অবকাঠামোগত শুল্ক হ্রাস

এই বাজেটের অন্যতম ঐতিহাসিক দিক হলো, ই-commerce বা ডিজিটাল কমার্সকে জাতীয় শিল্প নীতিমালার অধীনে একটি স্বতন্ত্র 'সেবা শিল্প' (Service Industry) হিসেবে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে সরাসরি নির্দিষ্ট 'ডিজিটাল কমার্স ক্যাটাগরি'-তে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন করা হবে। শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কারণে ই-commerce লজিস্টিকস ও ওয়্যারহাউজগুলো এখন থেকে বাণিজ্যিক হারের পরিবর্তে সাশ্রয়ী শিল্প হারে বিদ্যুৎ ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের সুবিধা পাবে।

পাশাপাশি ডিজিটাল কমার্স ও আইটি খাতের ব্যাকএন্ড অবকাঠামো শক্তিশালী করতে কাস্টমস ট্যারিফ এবং অগ্রিম করে ব্যাপক ছাড় দেওয়া হয়েছে:

খাত/পণ্য পূর্ববর্তী শুল্ক/কর কাঠামো বর্তমান বাজেট ২০২৬-২৭-এর হার
ল্যাপটপ ও কম্পিউটার হার্ডওয়্যার (H.S. Code 84.71) উচ্চ শুল্ক ও ভ্যাট যুক্ত সম্পূর্ণ শুল্ক ও ভ্যাটমুক্ত ($0\%$)
পেরিফেরাল ডিভাইস (প্রিন্টার, ফ্ল্যাশ মেমোরি) ৫% অগ্রিম আয়কর (AIT) কমিয়ে ২% নির্ধারণ
পয়েন্ট অব সেলস (POS) মেশিন ১০% আমদানি শুল্ক ও ৭.৫% অগ্রিম কর ৫% আমদানি শুল্ক ও ০% অগ্রিম কর
মোবাইল সিম কার্ড ট্যাক্স ৩০০ টাকা স্থায়ী শুল্ক ও সম্পূরক কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ($0$ টাকা)

লজিস্টিকস আধুনিকায়ন ও মেগা প্রকল্প

তরুণদের এআই-নির্ভর প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরিতে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি খাতে ৩০০ কোটি টাকার বিশেষ প্রাথমিক বরাদ্দের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর (CSR) খাত থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ যৌথ-বিনিয়োগ তহবিল গঠন করা হবে। ই-কমার্স খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ডেলিভারি নেটওয়ার্ক উন্নত করতে ডাক বিভাগের দেশব্যাপী বিস্তৃত অবকাঠামোকে ডিজিটাল লজিস্টিকস হাবে রূপান্তর করার জন্য একটি বিশেষ প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিবেশবান্ধব 'গ্রিন লজিস্টিকস' ইকোসিস্টেমের অংশ হিসেবে কাস্টমস ট্যারিফ শিডিউল সংশোধন করে বৈদ্যুতিক যান (EV) আমদানির মোট করভার ৯৩% থেকে কমিয়ে ৬৪% করা হয়েছে। কমার্শিয়াল ইভি বাস ও চার্জিং স্টেশনের সব শুল্ক-কর মওকুফ করায় ই-কমার্স কোম্পানিগুলোর 'লাস্ট-মাইল' ডেলিভারি কস্ট অন্তত ১৫-২০% কমিয়ে আনবে। এই সংস্কারগুলোর ফলে আগামী ৩ বছরের মধ্যে দেশীয় ই-কমার্স বাজার বিলিয়ন ডলারের ল্যান্ডমার্কে পৌঁছাবে এবং ক্যাশলেস লেনদেন অন্তত ৩০% বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।

দ্বিমুখী বাস্তবতা: শতভাগ বাস্তবায়ন বনাম আংশিক বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

এই প্রস্তাবিত বাজেটের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর দেশের ৫ লাখ উদ্যোক্তার ভাগ্য নির্ভর করছে। সবগুলো প্রস্তাব যদি মাঠপর্যায়ে শতভাগ বাস্তবায়িত হয় এবং কাস্টমস ও ট্যাক্স পলিসি সঠিকভাবে কাজ করে, তবে এটি ই-কমার্সকে দেশের মূলধারার অর্থনীতির চালিকাশক্তি বানাবে।

কিন্তু এর উল্টো পিঠও আছে। এই নীতিমালা যদি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা এই খাতের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে। ৩ মাস পর পর ভ্যাট রিটার্নের সুবিধা দেওয়ার পর যদি এনবিআর (NBR)-এর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ছোট উদ্যোক্তাদের নথিপত্র নিয়ে হয়রানি অব্যাহত রাখেন, তবে উদ্যোক্তারা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। ল্যাপটপ বা পিওএস (POS) মেশিনের শুল্ক ছাড়ের সুবিধা যদি কাস্টমসের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে থাকে, তবে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে। আংশিক বাস্তবায়ন মূলত বড় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেবে, কিন্তু তৃণমূলের ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তাদের চরম বৈষম্যের মুখে ঠেলে দেবে।

চূড়ান্ত মূল্যায়ন

একজন ডিজিটাল কমার্স উদ্যোক্তা হিসেবে আমি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটকে "স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় একটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ব্যবসাবান্ধব রূপরেখা" হিসেবে স্বাগত জানাই। তবে মনে রাখতে হবে, "একটি চমৎকার नीतिও যদি মাঠপর্যায়ে ভুলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা কোনো নীতি না থাকার চেয়েও ক্ষতিকর।"

ট্যাক্স ও ভ্যাট ছাড়ের এই চমৎকার ঘোষণার পাশাপাশি, নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে জামানতবিহীন 'স্মার্ট ফাইন্যান্সিং' বা ঋণের কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন এই বাজেটে সরাসরি অনুপস্থিত, যা কিছুটা হতাশাজনক। ই-কমার্স এখন সেবা শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি (BRPD) সার্কুলারের মাধ্যমে অবিলম্বে কুটির ও ক্ষুদ্র (CMSME) খাতের ঋণের আওতা পুনর্নির্ধারণ করে অনলাইন ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বিশেষ ক্রেডিট লাইন ঘোষণা করা উচিত। পরিশেষে, এই ঘোষিত প্রণোদনা, শুল্ক ছাড় ও আইনি সংস্কারের সঠিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর এবং ই-ক্যাবের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি "বাজেট বাস্তবায়ন ও মনিটরিং সেল" গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।


  • লেখক: সোহেল মৃধা, ই-কমার্স বিশ্লেষক ও প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য, ই-ক্যাব (e-CAB)


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।