পানি ব্যবস্থাপনার প্রকৌশলগত বিষয় ও ঢালের বৈজ্ঞানিক হিসাব ধরে হোক খাল খনন

পানি ব্যবস্থাপনার প্রকৌশলগত বিষয় ও ঢালের বৈজ্ঞানিক হিসাব ধরে হোক খাল খনন
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১৮:২৬  
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১৯:৩০  

সুসংরক্ষণ, ব্যবহার এবং সেই পানি ধীরে ধীরে ভূগর্ভে ফিল্টার হয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা- এই তিনটি লক্ষ্য একসাথে পূরণ করতে পারলে দেশের স্বাদু পানি ব্যবস্থাপনায় বড়ো পরিবর্তন আসবে। তাই খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। যেহেতু ভূমির উপরিভাগের স্বাদু পানির বেজলাইন পরিমাণ একেবারেই কমে গেছে, এবং খাল-নালার প্রাকৃতিক নেটওয়ার্ক পলিতে ভরাট ও দখল হয়ে গেছে, তাই পুরানা পদ্ধতিতে সাধারণভাবে শুধু খাল কাটলেই ভালো ফল আসবে না। দরকারি জায়গায় পানি ব্যবস্থাপনার প্রকৌশলগত বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। 

বর্ষা ও বন্যা মৌসুমের পরে, বাংলাদেশে সাধারণত নভেম্বর–ডিসেম্বর–জানুয়ারিতে সেচের পানির প্রাকৃতিক পর্যাপ্ততা থাকে। কিন্তু ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিলে যখন ইরি ও বোরো ফসলের জন্য পানির চাহিদা সবচেয়ে বেশি, তখনই বেশিরভাগ খাল শুকিয়ে যায়। ফলে খাল খননের পরিকল্পনায় শুষ্ক মৌসুমের এই তিন মাসে পানি ধরে রাখার ক্ষমতাকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রথমত, সমুদ্র সমতল থেকে উচ্চতা ও ঢালের বৈজ্ঞানিক হিসাব ধরে খাল খনন করলে তবেই প্রকৃত অর্থে পানি ধারণক্ষমতা বাড়বে, বিচ্ছিন্নভাবে খাল কাটলে সেই সুবিধা পাওয়া যাবে না। এটা আমাদের স্থানীয় সরকার ও আঞ্চলিক কৃষি অফিসের প্রকৌশলী ও অফিসাররা মিলে সহজেই বের করতে সক্ষম। পাউবো সহ সেনা ও নৌ বাহিনীর এক্সপার্ট রিসোর্সও থাকতে পারে এই ডোমেনে। ডিজাইন, ম্যাপিং ও প্ল্যানিং এ উনাদের কাজে লাগানো যেতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, শুকনো মৌসুমে পানি ধরে রাখতে খালের মুখে স্লুইস গেট বা রাবার ড্যামের মতো নিয়ন্ত্রণ কাঠামো দরকার। রাবার ড্যাম হলে বাতাস পাম্প করে শুকনো মৌসুমে পানির স্তর বাড়িয়ে পানি সংরক্ষণ করা যায়, আবার প্রয়োজন হলে বাতাস ছেড়ে দিয়ে পানি ছেড়ে দেওয়া যায়। বর্ষাকালে পুরোপুরি খুলে দিলে খালগুলো নৌ চলাচলের জন্যও ব্যবহারযোগ্য থাকে।

তৃতীয়ত, খালগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ এবং গভীরতার সমন্বয় জরুরি। একটি খালকে আলাদা করে না দেখে পুরো খাল নেটওয়ার্ক ও তার আশপাশের ফসলি জমিকে একটি 'ফ্লো জোন' হিসেবে পরিকল্পনা করতে হবে। যেখানে ফসলের মৌসুম অনুযায়ী মাসভিত্তিক পানি সংরক্ষণের লক্ষ্য থাকবে। 

ক্যানেল নেটওয়ার্কে কোথাও গভীর, কোথাও অগভীর খাল থাকতে পারে। পানিপ্রবাহ বজায় রাখতে দরকারে পাম্প দিয়ে প্রবাহও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, রাবার ড্যাম বা আরও খরুচে স্লুইস গেইট দিয়ে রিজার্ভ বাড়ানো কমানো বা জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। 

যেহেতু মেশিনে খাল কাটা হচ্ছে না, তাই খেয়াল রাখতে হবে যাতে ধান কাটার সময়ের সাথে কর্মসূচির ডূপ্লিকেশন না হয়। আগে পরে করলে অলস শ্রমের ব্যবহার ভালো হবে। অন্যদিকে কর্মসূচির আগে-পরে ছদ্ম বেকারত্ব পরিমাপের একটা পরিকল্পনা রাখা যেতে পারে। ১৯৭১ সালের পরে যখন পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি মালিক-ম্যানেজমেন্ট খেদিয়ে পাটকল গুলো বেহাল ও বেহাত হতে শুরু করে, এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ- এ দুয়ের প্রেক্ষিতে ১৯৭৬-৭৭ এ কৃষিতে অলস শ্রমের সাংঘাতিক ঘনীভবন ছিল। ফলে সেসময় খাল কাটা, তৈরি পোশক শিল্পের সূচনা এবং বিদেশে শ্রম রপ্তানির- এই তিন মাহাযাত্রার নেতৃত্ব দিয়ে শ্রম বিপ্লবে চরম সফল হয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বাংলাদেশ অর্থনীতির ৫০ বছর, প্রথম অধ্যায়)। বিভিন্ন পেশায় ছদ্ম বেকারত্ব নির্ণয় সহ শ্রম বিন্যাস ও বন্টনের বর্তমান পরিস্থিতির উপর নতুন একাডেমিক স্ট্যাডির দরকার আছে।   

১৯৭৭ এবং ২০২৬ এ নদী খাল নালার যে প্রাকৃতিক জালিকা বিন্যাস ছিল, তা একই রয়ে যায়নি। বিস্তর পরিবর্তন হয়ে গেছে মানুষের দখল ও ভরাটে, প্রাকৃতিক পলি পতনে এবং প্রবাহ কমে যাওয়ায়। তাই শহীদ জিয়ার 'খাল কাটা কর্মসূচির পুনরাবৃতির জন্য খাল কাটা' নয়, বরং শুকনো মৌসুমে কৃষির পানি রিজার্ভ তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। 

সার্ফেস ওয়াটার সংরক্ষণ করে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়ানোই ছিল শহীদ জিয়ার প্রধানতম উদ্দেশ্য। তবেই এই উদ্যোগ সত্যিকার অর্থে দেশের পানি নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনে বড়ো ভূমিকা রাখবে।


লেখকঃ প্রযুক্তিবিদ, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।