প্রতিশ্রুতির আড়ালে বিশাল ঘাটতি ‘দক্ষতা’
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সত্যিই খরচ কমাতে পারবে?
তৈরি পোশাক শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কি সত্যিই বড় আকারে খরচ কমাতে সক্ষম? নাকি অর্থনৈতিক চাপের কারণে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে আড়াল করতে ’প্রযুক্তি’র দোহাই দেওয়া হচ্ছে?
সম্প্রতি হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ তার প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭৫ হাজার কর্মীর মধ্য থেকে ১০ হাজার কর্মী কমানোর ঘোষণা দেওয়ার পর এই প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, দেশে প্রায় ৯ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির কারণে ব্যবসায়ীদের মজুরি ও অন্যান্য সুবিধা বাড়াতে হচ্ছে। অথচ বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পণ্যের দাম বাড়াতে রাজি নন।
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক ক্রেতারা এখন উৎপাদন খরচ কমাতে এবং জনবলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কারখানায় এআই ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য গার্মেন্টস লিকদের চাপ দিচ্ছেন।
এই ব্যাখ্যাটির গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এআই উৎপাদনের নির্দিষ্ট কিছু ধাপে খরচ কমাতে পারে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশে এটি দ্রুত ও সফলভাবে কার্যকর করার পথে দুটি বড় বাধা রয়েছে: দক্ষ জনবলের অভাব এবং উচ্চ প্রযুক্তি খরচ।
হ্যাঁ, এআই খরচ কমাতে পারে, তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে
এআই কোনো একটি একক যন্ত্র নয়। পোশাক তৈরির বিভিন্ন ধাপে এটি ভিন্ন ভিন্নভাবে কাজ করে।
-
মান নিয়ন্ত্রণ (Quality Control): বাংলাদেশে অনেক কারখানায় এআই-ভিত্তিক ত্রুটি শনাক্তকরণ পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে। মানুষের চোখের চেয়ে ক্যামেরা দ্রুত সেলাই বা কাপড়ের ত্রুটি ধরতে পারে।
-
রক্ষণাবেক্ষণ (Maintenance): এআই সিস্টেম রিয়েল-টাইমে মেশিনের কার্যক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। মেশিন কখন নষ্ট হতে পারে তা এটি আগেভাগেই বলে দিতে পারে। এতে কাজ বন্ধ থাকার সময় কমে এবং সার্বক্ষণিক মেশিন পাহারা দেওয়ার জন্য বাড়তি কর্মীর প্রয়োজন হয় না।
-
পরিকল্পনা (Planning): চাহিদা পূর্বাভাস এবং রিপোর্ট তৈরির কাজগুলো এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারে। এতে দাপ্তরিক কাজের জন্য বাড়তি লোকের প্রয়োজন কমে।
তবে সেলাইয়ের কাজ এখনও মানুষের হাতের স্পর্শ এবং বিচার-বুদ্ধির ওপর নির্ভরশীল হলেও কাটিং এবং ডিজাইনের ক্ষেত্রে এআই-এর উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থাৎ, উত্তরটি হলো - হ্যাঁ, ‘এআই খরচ কমাতে পারে’। কিন্তু এটি তখনই সম্ভব যখন কারখানাগুলো এটি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারবে। আর এখানেই আসল প্রতিবন্ধকতাগুলো দেখা দেয়।
প্রথম বাধা: ইঞ্জিনিয়ারের অভাব নয়, অভাব ‘সমন্বিত দক্ষতার’
অনেকেই মনে করেন বাংলাদেশে এআই প্রতিভার অভাব আছে। এটি সঠিক নয়। বাংলাদেশে প্রচুর দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার রয়েছেন। আসল সমস্যা হলো দুটি ভিন্ন খাতের সমন্বয় ঘটানো।
একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এআই মডেল তৈরি করতে পারেন। কিন্তু সেই মডেলটি তখনই কার্যকর হবে যখন এটি জানবে কারখানার ফ্লোরে সেলাই বা কাটিংয়ের কাজগুলো আসলে কীভাবে হয়। এই জ্ঞান কোডারদের নেই, বরং এটি আছে কারখানা ব্যবস্থাপক বা টেকনিশিয়ানদের কাছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম যাদের পোশাক উৎপাদন এবং এআই - উভয় বিষয়েই গভীর জ্ঞান আছে। আর এটিই এই খাতের সবথেকে বড় বাধা বা ‘বটলনেক’।
এক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়: প্রশিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেবে কে?
কারখানায় এআই ব্যবহারের আগে ইঞ্জিনিয়ারদের বুঝতে হবে পোশাক শিল্প কীভাবে চলে। এই সমন্বিত জ্ঞান দেওয়ার মতো প্রতিষ্ঠান বা প্রশিক্ষক বাংলাদেশে বর্তমানে নেই বললেই চলে।
সাবেক বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান এক সামিটে বলেছিলেন, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে। বর্তমান সভাপতি মাহমুদ হাসান খানও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে বিজিএমইএ-র প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামগুলো মূলত সাধারণ কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য তৈরি। এআই-এর জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত জনবল তৈরির কাঠামো সেখানে এখনো গড়ে ওঠেনি।
দ্বিতীয় বাধা: প্রযুক্তি গ্রহণের উচ্চ ব্যয়
দক্ষ জনবল থাকলেও খরচ একটি বিশাল বাধা। এআই সিস্টেম মোটেও সহজলভ্য নয়। সরঞ্জাম কেনা, সফটওয়্যার লাইসেন্স এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য বড় অঙ্কের প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। হা-মীম গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য এই খরচ বহন করা সম্ভব হলেও, মাঝারি ও ছোট কারখানাগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত কঠিন।
এর ফলে শিল্পে একটি বৈষম্য তৈরি হতে পারে। বড় গ্রুপগুলো আধুনিকায়নের সুযোগ পাবে, আর ছোট কারখানাগুলো শুধু টিকে থাকার লড়াইয়ে কর্মী ছাঁটাই করবে।
আরও একটি বড় সমস্যা হলো বৈদেশিক মুদ্রা। বেশিরভাগ এআই সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার বিদেশি কোম্পানি থেকে কিনতে হয়। এর মানে হলো, স্থানীয় মুদ্রায় মজুরি দেওয়ার বদলে ডলার বা ইউরোতে লাইসেন্স ফি দিতে হবে। এ কে আজাদ যখন মুদ্রাস্ফীতির কথা বলছেন, তখন বিদেশি প্রযুক্তি আমদানি করা মানে হলো খরচ কমানো নয়, বরং খরচের খাত পরিবর্তন করা।
অমিমাংসিত প্রশ্ন
এ কে আজাদ হা-মীম গ্রুপের কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে ক্রেতাদের চাপের কথা বলেছেন। প্রমাণ বলছে যে, এআই নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে খরচ কমাতে পারে। কিন্তু তার আগে দুটি শর্ত পূরণ হওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, বাংলাদেশে এমন বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন যারা পোশাক উৎপাদন এবং এআই - উভয়টিই বোঝেন। দ্বিতীয়ত, কারখানাগুলোর জন্য এই প্রযুক্তি সহজে পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।
বর্তমানে এই দুটি শর্তের কোনোটিই পুরোপুরি পূরণ হয়নি। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়: কর্মী ছাঁটাইয়ের পেছনে কি সত্যিই এআই-এর ভূমিকা রয়েছে, নাকি এটি স্রেফ একটি অজুহাত?
লেখক: টেক ইন্ডাস্ট্রি প্রফেশনাল ও সাবেক সাংবাদিক





