বাংলাদেশে প্রকৃত ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কত? ডেটার দাম কেন কমছে না?
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা নিয়ে বড় বড় পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়—এই সংখ্যাটি কি প্রকৃত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর, নাকি শুধু নিবন্ধিত সংযোগের?
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে মোট ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় ১৩ কোটি। এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় ১১.৬ কোটি এবং ব্রডব্যান্ড (আইএসপি) সংযোগ প্রায় ১.৫ কোটি। কিন্তু এই পরিসংখ্যান প্রকৃত ব্যবহারকারীর সংখ্যা নির্দেশ করে না। কারণ একজন ব্যক্তি একাধিক সিম ব্যবহার করতে পারেন, আবার একটি সিমে ৯০ দিনের মধ্যে একবার ডেটা ব্যবহার করলেও সেটি সক্রিয় ইন্টারনেট সংযোগ হিসেবে গণনা করা হয়। ফলে সংযোগের সংখ্যা আর প্রকৃত স্বতন্ত্র ব্যবহারকারীর সংখ্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থেকে যায়।
এ কারণেই বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রগতির প্রকৃত চিত্র জানতে শুধু সংযোগের সংখ্যা নয়, স্বতন্ত্র ব্যবহারকারী, নিয়মিত ডেটা ব্যবহারকারী এবং মাথাপিছু ডেটা ব্যবহারের পরিসংখ্যান প্রকাশ করা জরুরি। সঠিক তথ্য ছাড়া সঠিক নীতিনির্ধারণ সম্ভব নয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমেছে। মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, স্মার্টফোনের উচ্চ মূল্য, মোবাইল সেবায় করের চাপ এবং ডেটা প্যাকেজের মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে অনেক মানুষ নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছেন। ডিজিটাল বৈষম্যও নতুন করে দৃশ্যমান হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রযুক্তিগত বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের পাইকারি মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশে গুগল, মেটা, ইউটিউবসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনটেন্ট সরবরাহকারীর ক্যাশ সার্ভার স্থাপিত হয়েছে। ফলে অধিকাংশ জনপ্রিয় কনটেন্ট দেশের ভেতর থেকেই সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার কমে, অপারেটরদের খরচ হ্রাস পায় এবং নেটওয়ার্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
তাহলে প্রশ্ন হলো—আন্তর্জাতিক ব্যয় কমলেও সাধারণ গ্রাহকের জন্য মোবাইল ডেটার দাম কেন কমছে না?
এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। মোবাইল অপারেটরদের স্পেকট্রাম লাইসেন্স, টাওয়ার নির্মাণ, বিদ্যুৎ, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণে উল্লেখযোগ্য ব্যয় হয়। পাশাপাশি ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, রাজস্ব ভাগাভাগি এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ফি গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে আন্তর্জাতিক ব্যয় কমার সুফল কতটা গ্রাহকের কাছে পৌঁছেছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই।
এই বাস্তবতায় সরকার ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, ইন্টারনেট সেবার ওপর বিদ্যমান কর ও শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা উচিত। ইন্টারনেটকে রাজস্ব আহরণের একটি মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের মৌলিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিটিআরসির উচিত মোবাইল ডেটার মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অধিকতর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ, দেশীয় ট্রান্সমিশন, ক্যাশ সার্ভারের সুবিধা এবং অপারেটরদের প্রকৃত ব্যয়ের বিশ্লেষণ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে গ্রাহকদের আস্থা বাড়বে।
তৃতীয়ত, প্রকৃত স্বতন্ত্র ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা, গড় ডেটা ব্যবহার, সেবার মান এবং মূল্য কাঠামো সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন। তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণই ডিজিটাল খাতকে আরও কার্যকর করতে পারে।
চতুর্থত, বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকের স্বার্থ সংরক্ষণে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে সেবার মান, ইন্টারনেটের গতি এবং গ্রাহক অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়ে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ কিংবা স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল ইন্টারনেট সংযোগের সংখ্যা বাড়িয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন দেশের প্রতিটি মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে, মানসম্মত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন। ইন্টারনেট আজ বিলাসিতা নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, উদ্ভাবন এবং নাগরিক অধিকারের অন্যতম ভিত্তি।
অতএব, এখন সময় এসেছে শুধু পরিসংখ্যানের সাফল্য নয়, বরং গ্রাহকের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার। সরকার, বিটিআরসি, মোবাইল অপারেটর, আইএসপি এবং ভোক্তা সংগঠন—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগেই একটি স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং গ্রাহকবান্ধব ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখকঃ সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন





