দলীয় কোন্দলে গ্রেফতার-চাপের অভিযোগ
বিএনপি নেতার পোস্ট ঘিরে বিতর্ক
- মোস্তাকের পোস্টে দলীয় রাজনীতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ
- গ্রেপ্তারে চাপের অভিযোগ সাইদুরের, পুলিশের অস্বীকৃতি
- পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথোপকথন নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা বিএনপির নেতা মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাকের ফেসবুক পোস্টে দলীয় রাজনীতি নিয়ে হতাশা প্রকাশের পর তাকে গ্রেফতারে পুলিশের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার সাইদুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ অভিযোগ তুলে ধরেছেন। তবে অভিযোগটি অসত্য বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ। মোস্তাকের বক্তব্যও অস্বীকার করেছেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম।
সোমবার দুপুরে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক লেখেন, ‘পূর্বজন্মে বিরাট পাপ করলে এই জনমে মানুষ বিএনপি করে।’ তার এই পোস্ট ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর পোস্টটি শেয়ার করে সাইদুর রহমান দাবি করেন, মোস্তাককে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের ওপর চাপ রয়েছে। বিএনপিরই আরেক নেতা এ চাপ দিচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গ্রেফতারে চাপের অভিযোগ সাইদুরের
সাইদুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, মোস্তাকের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন, তাকে গ্রেফতারের জন্য বিএনপির একজন নেতার পক্ষ থেকে বিশেষ মহলের মাধ্যমে খুলনা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শককে (ডিআইজি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ কারণে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারও চাপে রয়েছেন বলে মোস্তাক তাকে জানিয়েছেন।
সাইদুরের পোস্টে বলা হয়, মোস্তাক সারের ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেও তা পাননি। পরে ক্ষুব্ধ হয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় ঘেরাও করেন। এরপর তার বিরুদ্ধে চরমপন্থীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। এ পরিস্থিতিতে তাকে পালিয়ে থাকতে হচ্ছে বলে দাবি করেন মোস্তাক।
দল ক্ষমতায় আসার পরও কেন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না, তা নিয়ে মোস্তাক হতাশা প্রকাশ করেছেন বলেও লেখেন সাইদুর।
নিজের পোস্টে সাইদুর রহমান আরও লেখেন, ‘মোস্তাক ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে যেটি বুঝলাম, বিগত সময়ে কুষ্টিয়ার রাজনীতি ছেড়ে যারা সুখে-শান্তিতে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিলেন, সেই তথাকথিত রাজনীতিকরা বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তারাই সরকারের বদনাম করছেন। অথচ এই মোস্তাক ভাইয়েরাই ছিলেন রাজপথের লড়াকু সৈনিক। কতবার যে আওয়ামী লীগের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, লোকটির তার কোনো হিসাব নেই।’
অভিযোগ অস্বীকার পুলিশের
সাইদুর রহমানের অভিযোগের প্রতিবাদ জানিয়ে সোমবার রাতে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের ফেসবুক পেজে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, সাইদুর রহমানের ফেসবুক আইডি থেকে পুলিশের ওপর চাপ প্রয়োগের যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা অসত্য।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি ও কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এ বিষয়ে অবগত নন। তাদের নিয়ে এমন অসত্য তথ্য প্রচারের প্রতিবাদ জানায় জেলা পুলিশ।
পুলিশের বিবৃতির স্ক্রিনশট শেয়ার করে পরে আরেকটি পোস্ট দেন সাইদুর রহমান। সেখানে তিনি দাবি করেন, আগের পোস্টে তিনি নিজের বক্তব্য তুলে ধরেননি; বরং মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য প্রকাশ করেছেন। পুলিশকে হেয় করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। সঠিক তথ্য প্রকাশ করাই ছিল তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজির এ ঘটনায় সম্পৃক্ততা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এসপির কার্যালয়ে যাওয়া নিয়ে নতুন দাবি
পুলিশের বিবৃতি দেখার পর মোস্তাকের সঙ্গে আবারও কথা বলেছেন বলে জানান সাইদুর রহমান। তার দাবি, ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার আগে মোস্তাক কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে পুলিশ সুপার তাকে একজন বিএনপি নেতার সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
সাইদুরের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নেতার সঙ্গে বিরোধ না মেটালে মোস্তাককে গ্রেফতারের জন্য চাপ রয়েছে বলেও পুলিশ সুপার তাকে জানিয়েছেন। সাইদুর আরও দাবি করেন, শুক্রবার পুলিশ সুপারের বাসায় বিএনপির একজন নেতা গিয়ে মোস্তাককে গ্রেফতারের জন্য চাপ দেন। কৌশলগত কারণে ওই নেতার নাম প্রকাশ করেননি তিনি।
মোস্তাক পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন কি না, তা সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্তের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব বলেও দাবি করেন সাইদুর। তার পোস্টে বলা হয়, মোস্তাকের মোবাইল ফোনের অবস্থান ওই সময় পুলিশ সুপারের কার্যালয় শনাক্ত করেছিল এবং কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজেও তার উপস্থিতির প্রমাণ থাকার কথা।
নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন মোস্তাক
এদিকে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক। তার দাবি, স্থানীয় বিএনপির একজন নেতা, যিনি সাবেক সংসদ সদস্য, তাকে গ্রেফতারে পুলিশের ওপর চাপ দিচ্ছেন।
মোস্তাকের ভাষ্য, সোমবার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম তাকে নিজের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘বিষয়টি তার (সেই বিএনপি নেতা) সঙ্গে ঠিকঠাক করে নেন। না হলে আপনাকে গ্রেফতার করার বিষয়ে আমার ওপর চাপ আছে।’
এর জবাবে পুলিশ সুপারকে তিনি বলেন, ‘দেখুন, আমি কোনো অন্যায় করিনি। সে কারণে কারও কাছে নত হয়ে সব অন্যায়কে মেনে নিতে পারব না। আপনি যেটা ভালো মনে করেন করুন। আমি আমার সবকিছু বিসর্জন দিয়েছি দলের জন্য। এখন যেহেতু এখানে অবস্থান থেকে সার্বক্ষণিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছি, সে কারণে একটা সারের লাইসেন্স পাওয়ার আবেদন করেছিলাম। এটা যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তাহলে আমি সেটা করেছি।’
তবে মোস্তাকের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মোস্তাকের সঙ্গে এ ধরনের কোনো কথা বা বাক্য বিনিময় হয়নি।
ফলে মোস্তাকের ফেসবুক পোস্ট থেকে শুরু হওয়া ঘটনাটি এখন গ্রেফতারে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ, পুলিশি প্রতিবাদ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে নতুন মাত্রা পেয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ থাকলেও, সেগুলো যাচাইয়ে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
//ডিবিটেক/এসসিডিআর/ডিএসই/এফওই//





