জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন; আমনের পাশাপাশি বোরো মৌসুমেও চাষের সুপারিশ
উপকূলীয় লবণাক্ত জমিতে বিপ্লব আনবে ‘ব্রি ধান১১৯’: স্বল্প জীবনকালে হেক্টরে মিলবে ৭.৬ টন পর্যন্ত ফলন
- আধুনিক জিনোম প্রযুক্তির ব্যবহারে মাত্র সাড়ে সাত বছরে উদ্ভাবিত হলো নতুন লবণসহিষ্ণু জাত
- ব্রি ধান৭৩-এর চেয়ে হেক্টরে ১ টন বেশি ফলন; প্রতি শীষে মিলবে গড়ে ২১৫টি পুষ্ট দানা
- সরু ও মাঝারি দানার চাল; একই জাত আমন ও বোরো উভয় মৌসুমে চাষের অপার সম্ভাবনা
দেশের উপকূলীয় লবণাক্ত এবং প্রতিকূল অলবণাক্ত অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও ধানের উৎপাদন বহুগুণ বাড়াতে নতুন জাত ‘ব্রি ধান১১৯’ উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) বিজ্ঞানীরা। রোপা আমন মৌসুমের উপযোগী স্বল্প জীবনকালের এই উচ্চ ফলনশীল জাতটি লবণাক্ততার মাত্রাভেদে হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ৮ থেকে ৭ দশমিক ৬ টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম।
জাতীয় বীজ বোর্ডের (এনএসবি) ১১৬তম সভায় জাতটি রোপা আমন মৌসুমে চাষাবাদের জন্য চূড়ান্তভাবে অনুমোদন লাভ করেছে। একই সাথে বোরো মৌসুমেও এর চাষের উপযোগিতা প্রমাণিত হওয়ায় জাতীয় কারিগরি কমিটির সুপারিশ মিলেছে, যা বর্তমানে এনএসবির চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ২৮ অক্টোবর সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
আধুনিক প্রজনন কৌশলে রেকর্ড সময়ে উদ্ভাবন
ব্রি ধান১১৯ উদ্ভাবনে প্রয়োগ করা হয়েছে সর্বাধুনিক কৃষি-প্রযুক্তিগত কৌশল। টার্গেটেড ক্রসিং ডিজাইন (Targeted Crossing Design), মডিফায়েড ফিল্ড আরজিএ মেথড (Modified Field RGA Method), ট্রেইট প্যানেল এসএনপি ডিটেকশন (Trait Panel SNP Detection) এবং হটস্পটভিত্তিক স্ট্র্যাটেজিক ফরোয়ার্ড ব্রিডিংয়ের সমন্বিত প্রয়োগে মাত্র সাড়ে সাত বছরে জাতটি মাঠপর্যায়ে সফল করা হয়েছে; যা প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে প্রায় চার বছর দ্রুত। ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ এখলাছুর রহমানের নেতৃত্বে এবং সিনিয়র প্ল্যান্ট ব্রিডার কৃষিবিদ নূসরাত জাহান জ্যোতির যৌথ গবেষণায় এটি সম্ভব হয়।
উচ্চ ফলন ও দানার বৈশিষ্ট্য
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত ব্রি ধান৭৩-এর তুলনায় নতুন এই জাতে হেক্টরপ্রতি প্রায় এক টন বেশি ফলন পাওয়া যায়। গাছের গড় উচ্চতা ১১৩ সেন্টিমিটার এবং কাণ্ড বেশ মজবুত হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাতাসে হেলে পড়ার ঝুঁকি নেই। জাতটিতে উপস্থিত ‘Gn1a’ জিনের সক্রিয়তার কারণে প্রতি শীষে গড়ে ২১৫টি পুষ্ট দানা তৈরি হয়, যা ব্রি ধান৭৩-এর তুলনায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি বেশি।
চাল সরু ও মাঝারি আকৃতির হওয়ায় দেশের অধিকাংশ অঞ্চলের ভোক্তাদের পছন্দের সাথে এটি অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ১ হাজার দানার ওজন ১৬ দশমিক ৮ গ্রাম, দানার দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৯ মিলিমিটার, প্রস্থ ১ দশমিক ৮ মিলিমিটার, দৈর্ঘ্য-প্রস্থের অনুপাত ৩ দশমিক ২ এবং অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
দ্বৈত মৌসুমের সম্ভাবনা ও উপকূলীয় রূপান্তর
জাতটি মাত্র ১১৫ দিনে (পৌনে চার মাস) পেকে যাওয়ায় ফসল কাটার পর পরবর্তী ফসলের জন্য জমি দ্রুত প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে দেশের ২০টি লবণাক্ত ও অলবণাক্ত ব্লকে এর প্রস্তাবিত জাত পরীক্ষা (PVT) সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
গবেষক কৃষিবিদ নূসরাত জাহান জ্যোতি জানান, এনএসবির বোরো অনুমোদন সম্পন্ন হলে একই জাতের বীজ দিয়ে কৃষকেরা আমন ও বোরো- উভয় মৌসুমে চাষ করতে পারবেন। এতে কৃষকের জন্য বীজ সংরক্ষণ ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। উপকূলীয় শুষ্ক মৌসুমে মাটির ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার মুখেও এই জাতটি টেকসই উৎপাদন ধরে রেখে দেশের সামগ্রিক খাদ্য সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
//ডিবিটেক/করেসপন্ডেন্ট/সম্পাদিত/আউটপুট//





