এআই অর্থনীতির সুফল পৌঁছাতে হবে ঢাকার বাইরেও
টেকসই অন্তর্ভুক্তি ও আস্থার রূপরেখা
[হাইলাইটস]
|
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের কথা ভাবছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট একটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রাথমিক প্রশ্নটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সরাসরি: এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে কি ত্রুটি কমে ক্রয়াদেশ বাতিলের ঘটনা এতটা হ্রাস পাবে, যাতে প্রযুক্তি স্থাপনের খরচ উঠে আসে? পাশাপাশি যেসব কর্মী এই ব্যবস্থা পরিচালনা করবেন, তাঁদেরও সুস্পষ্টভাবে বুঝতে হবে—এতে তাঁদের প্রাত্যহিক কাজের ধরন কীভাবে বদলাবে। এই দুই মৌলিক প্রশ্নের কতটা বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়েই পরিমাপ করতে হবে বাংলাদেশের এআই সংক্রান্ত জাতীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে।
আগামী ৫ নভেম্বর ঢাকার বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’ সেই বাস্তবমুখী মানদণ্ড নির্ধারণের একটি মোক্ষম সুযোগ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করছে। ব্যবসায় এআইয়ের ব্যবহারিক প্রয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ফলপ্রসূ অংশীদারত্ব এবং স্থানীয় প্রয়োজনের উপযোগী সমাধানকে একই আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসছে এই জাতীয় আয়োজন।
এই প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এআইয়ের বাস্তব প্রয়োগ ও মূল্যায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট অর্থায়নের নিশ্চয়তাসহ একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় পৌঁছানো জরুরি। সম্মেলন তখনই সার্থক হবে, যখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি গ্রহণের পথ খুঁজে পাবেন এবং একই সঙ্গে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তায় চালু করা কোনো সিস্টেম ব্যর্থ হলে তার দায় কার ওপর বর্তাবে, সেটিও সুস্পষ্ট হবে।
২০২৬ সালের ৬ ও ৭ জুলাই জেনেভায় অনুষ্ঠিত এআই গভর্ন্যান্স বিষয়ে জাতিসংঘের প্রথম বৈশ্বিক সংলাপ এক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও আন্তর্জাতিক ভিত্তি প্রদান করে। সেই সংলাপের চারটি প্রধান বিষয়ভিত্তিক ধারায় আলোকপাত করা হয়েছে—সামাজিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে এআইয়ের সুযোগ ও প্রভাব; ডিজিটাল রূপান্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এআই-বৈষম্য দূরীকরণ; আন্তঃকার্যক্ষমতা (Interoperability) নিশ্চিত করে নিরাপদ, সুরক্ষিত ও বিশ্বস্ত এআইয়ের বিস্তার; এবং সর্বোপরি স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও মানুষের সক্রিয় তদারকির মাধ্যমে মৌলিক মানবাধিকারের সংরক্ষণ।
বাংলাদেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে এই বৈশ্বিক নীতিগুলোকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। যেকোনো এআই প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে তার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা, স্থানীয় কর্মসংস্থানে তার প্রভাব, বাংলা ভাষায় মডেলটির নির্ভরযোগ্যতা এবং যাদের ডেটা ব্যবহৃত হবে তাঁদের গোপনীয়তার সুরক্ষা যাচাই করা আবশ্যক। কেবল ব্যয়বহুল সার্ভার বা হার্ডওয়্যার কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তির প্রবেশগম্যতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্যও সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ রাখা চাই।
নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এই রূপান্তর অনেক বেশি ফলপ্রসূ হবে। সরকারের তথ্য বাতায়নে ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি ২০২৬–২০৩০’ এখনো ‘খসড়া সংস্করণ ২.০’ হিসেবে পর্যালোচনায় রয়েছে। অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে এই খসড়া চূড়ান্ত করার একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী রোডম্যাপ, সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থার দায়িত্ব এবং প্রয়োজনীয় জাতীয় বাজেটের ঘোষণা সামিট থেকেই আসা উচিত। একই সাথে অক্টোবরে প্রকাশিত ইউনেস্কোর বাংলাদেশবিষয়ক এআই প্রস্তুতি মূল্যায়নের ১৫টি সুপারিশকে অগ্রাধিকার দিয়ে কোন খাতে আগে সম্পদ ব্যয় করতে হবে এবং নিয়ন্ত্রণকারী কাঠামোর সক্ষমতা কীভাবে বাড়াতে হবে, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রথম কাজ হলো নিজেদের কাঠামোগত দুর্বলতা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নথি ও হিসাবরক্ষণই যদি অগোছালো থাকে, তবে কোটি টাকা ব্যয়ে প্রিডিক্টিভ এআই সফটওয়্যার কেনার চেয়ে প্রাথমিক স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্টিং স্থাপন করা অনেক বেশি কার্যকর। সরকারি পরামর্শসেবায় অপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তির মোহ দূর করে সহজ ও টেকসই সমাধানের সুপারিশ থাকতে হবে। অন্যথায় ভুল খাতে ভর্তুকি দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ঘটবে। ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোর জন্য নিরপেক্ষ প্রযুক্তি পরামর্শ নিশ্চিতে ডিসিসিআই আঞ্চলিক চেম্বারগুলোর সাথে কাজ করতে পারে, যেখানে পরামর্শকেরা কোনো নির্দিষ্ট ভেন্ডরের বিক্রয় কমিশনের বাইরে এসে প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের পথ দেখাবেন।
প্রতিযোগিতামূলক বাছাইয়ের ভিত্তিতে ভাউচার স্কিমের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তি রূপান্তরের প্রাথমিক ব্যয়ের একটি অংশ বহন করা যেতে পারে। তবে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকেও নিজস্ব তহবিল যুক্ত করতে হবে এবং ফলাফল নিরীক্ষায় সম্মত থাকতে হবে। মূল্যায়নে কর্মীদের সময়, ডেটা প্রসেসিং, নিয়মিত লাইসেন্স ফি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ আমলে নিতে হবে; কারণ প্রদর্শনীতে যে প্রযুক্তি আকর্ষণীয় দেখায়, তিন বছরের পরিচালন ব্যয়ে তা লোকসানি বোঝায় পরিণত হতে পারে। সরকারি কেনাকাটাতেও একই ধরনের কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে—যেখানে টেন্ডার আহ্বানের পূর্বেই প্রজেক্টের গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড, ডেটার বৌদ্ধিক মালিকানা এবং চুক্তি বাতিলের সহজ শর্ত নির্ধারিত থাকবে।
অবকাঠামো ব্যয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাও স্পষ্ট করা দরকার। এআই অবকাঠামো সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে স্থিতিশীল ইন্টারনেট, গণনাসক্ষমতা (Compute), স্থানীয় প্রাসঙ্গিক ডেটাসেট এবং দক্ষ মানবসম্পদকে মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বড় ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার আগে তার সেবার অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদা এবং বিদ্যুৎ, শীতলীকরণ ও রক্ষণাবেক্ষণের সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গণনাসুবিধা ভাগাভাগি কিংবা প্রতিযোগিতামূলক ক্লাউড সেবার মাধ্যমে খরচ কমিয়ে আনা সম্ভব।
এসডিজি ট্র্যাকারের তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিপর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার শহরে ৭৫.৭ শতাংশ হলেও গ্রামে তা মাত্র ৪৩.৬ শতাংশ। এই ডিজিটাল বিভাজন মাথায় রেখেই এআই কর্মসূচির নকশা করতে হবে। ঢাকার বাইরের প্রান্তিক উদ্যোক্তা, নারী ব্যবসায়ী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নাগরিকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা রাখতে হবে। গ্রামীণ কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী করে স্থানীয় উচ্চারণ ও সাশ্রয়ী হ্যান্ডসেটে বাংলা ইন্টারফেস পরীক্ষা করা জরুরি। এছাড়া স্থানীয় ডেটাসেট তৈরির ক্ষেত্রে গোপনীয়তা ও পুনর্ব্যবহারের আইনি শর্ত কঠোরভাবে মানতে হবে।
এআই রূপান্তরে শ্রমশক্তির ভবিষ্যৎ সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) নির্দেশ করেছে যে, জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার চেয়ে কাজের ধরনে বড় রূপান্তর আসার সম্ভাবনা বেশি। বাংলাদেশকে তাই খাতভিত্তিক প্রভাব নিরূপণ করে কর্মীদের জন্য কাজের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো শিল্পে এআই বাস্তবায়নে সরকারি প্রণোদনা পেতে হলে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের স্বার্থরক্ষা ও বেতনসহ প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়ার শর্ত রাখা উচিত।
মানবাধিকার ও বিশ্বস্ততার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। ঋণ বিতরণ বা চাকরি বরাদ্দের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকের আপিল করার সুযোগ ও মানুষের তদারকি থাকতে হবে। একই সাথে কণ্ঠস্বর বা পরিচয় নকল করে ভুয়া আর্থিক লেনদেনের ঝুঁকি রুখতে কার্যকর সাইবার সুরক্ষা প্রোটোকল প্রয়োজন।
২০২৪ সালে জাতিসংঘে গৃহীত ‘গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট’-এর পাঁচটি লক্ষ্য এবং তথ্যসমাজবিষয়ক বিশ্ব সম্মেলনের (WSIS) সি১ থেকে সি১১ কর্মধারা—উভয় আন্তর্জাতিক কাঠামোই প্রযুক্তি রূপান্তরে স্বচ্ছতা, তথ্য প্রবেশাধিকার, নৈতিকতা ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের ওপর জোর দেয়। 'প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার'-এর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত ধারাগুলোতেও উন্নয়নশীল দেশের টেকসই সক্ষমতা বৃদ্ধির সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে।
সামিট শেষ হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ডিসিসিআই যৌথভাবে একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করতে পারে—যার অগ্রগতি এক বছর পর উন্মুক্ত জনশুনানির মাধ্যমে স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা হবে। একজন প্রান্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যখন এআই প্রযুক্তিকে নিজের ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার করতে পারবেন এবং তাঁর কর্মীও সেই রূপান্তরের সুফল পাবেন, তখনই কেবল এআই অর্থনীতির প্রকৃত জাতীয় রূপান্তর সার্থক হবে।
লেখক | সদস্য, মাল্টিস্টেকহোল্ডার কনসালটেশন গ্রুপ অব দ্য ইউনাইটেড নেশনস গ্রুপ অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি (UNGIS); প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি); বাংলাদেশে দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Responsible AI) ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)-বিষয়ক আন্তর্জাতিক অ্যাম্বাসেডর। |
[সম্পাদকীয়নোট]
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক আলোচনা যখন প্রায়শই বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রীয় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন আলোচ্য নিবন্ধে লেখক অত্যন্ত সময়োপযোগীভাবে এআই অর্থনীতির সুফলকে তৃণমূল পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণের অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন। জাতিসংঘ, ইউনেস্কো এবং ডব্লিউএসআইএসের আন্তর্জাতিক নীতি কাঠামোর আলোকে তিনি দেখিয়েছেন যে, উৎপাদনশীলতা কেবল ঢাকাভিত্তিক গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়ানো নয়; বরং প্রযুক্তিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও গ্রামীণ শ্রমিকের জীবনমান পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে স্বাধীন পরামর্শ সেবা, ভাউচারভিত্তিক অর্থায়ন এবং শ্রমিকদের সুরক্ষায় সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের যে প্রস্তাবনা এখানে দেওয়া হয়েছে, তা প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের জন্য এক কার্যকর দিকনির্দেশনা। জাতীয় প্রযুক্তি সাম্য ও টেকসই অন্তর্ভুক্তির স্বার্থে নিবন্ধটি সম্পাদকীয় প্রমিতকরণসহ প্রকাশ করা হলো।





