টেককানেক্টে ডিজিটাল সাফল্যের মাপকাঠি সেবার মান

এআইয়ে নিজস্ব সক্ষমতা ও জবাবদিহি জরুরি

  • টাওয়ার বা ফাইবারের সংখ্যা নয়, নাগরিকের সেবার অভিজ্ঞতাই সাফল্যের মাপকাঠি
  • ৫জি–৬জি গ্রহণে বাস্তব চাহিদা ও যৌক্তিক ব্যয়ের ওপর গুরুত্বারোপ
  • জনসেবায় এআই ব্যবহারে চূড়ান্ত জবাবদিহি মানুষের হাতে রাখার আহ্বান

এআইয়ে নিজস্ব সক্ষমতা ও জবাবদিহি জরুরি
২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:১৭  

ডিজিটাল রূপান্তরের সাফল্য কতটি টাওয়ার স্থাপন করা হলো কিংবা কত কিলোমিটার ফাইবার অপটিক ক্যাবল টানা হলো, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন কতটা সহজে, নিরাপদে ও সাশ্রয়ী খরচে ডিজিটাল সেবা পাচ্ছেন, সেটিই সাফল্যের মূল মাপকাঠি। রাজধানীতে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬’ সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে এ অভিমত তুলে ধরেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব ড. মুহাম্মদ কামরুজ্জামান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।

স্বাগত বক্তব্যে ড. কামরুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল রূপান্তরের কয়েকটি সূচকে বাংলাদেশ এখনো বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে প্রায় ১০ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে। শুধু ইন্টারনেটের সংকেত পৌঁছে দিলেই হবে না; সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী ডিভাইস, ব্যবহারযোগ্য ডেটা প্যাকেজ এবং বাংলা ভাষায় ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিতে হবে। একজন শিক্ষার্থী নির্বিঘ্নে অনলাইন ক্লাস করতে পারছেন কি না, কোনো রোগী প্রয়োজনীয় রেফারেল পাচ্ছেন কি না কিংবা গ্রামের একজন উদ্যোক্তা বারবার ভোগান্তিতে না পড়ে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারছেন কি না—এসব অভিজ্ঞতার ওপরই সংযোগের প্রকৃত উপযোগিতা নির্ভর করে।

ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের বাস্তবতায় দুর্যোগসহনশীল রাউটার, নিরবচ্ছিন্ন ব্যাকআপ বিদ্যুৎ এবং দ্রুত নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধারে প্রশিক্ষিত জরুরি দল গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডঅ্যালোন পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ৫জি এবং ভবিষ্যতের ষষ্ঠ প্রজন্মের ৬জি প্রযুক্তি বাস্তবায়নে অপ্রয়োজনীয় তাড়াহুড়া না করার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, যৌক্তিক ব্যয় ও বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে সুশৃঙ্খলভাবে প্রযুক্তি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সংযোগব্যবস্থা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আয়োজিত তিনটি সেমিনারের শুরুতে এআই প্রসঙ্গে ড. কামরুজ্জামান বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। বাংলাদেশের শুধু এআইয়ের ভোক্তা হয়ে থাকলে চলবে না; নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করে এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে।

তিনি বলেন, জনসেবায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত জবাবদিহি মানুষের হাতেই থাকতে হবে। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়।

ডিজিটাল রূপান্তর এককভাবে সরকারের পক্ষে সম্ভব নয় উল্লেখ করে সচিব বলেন, সরকারের দায়িত্ব হলো পূর্বাভাসযোগ্য নীতিমালা, স্বচ্ছ অনুমোদনব্যবস্থা এবং সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে মানসম্মত সেবা পৌঁছে দেওয়া শিল্প খাতের দায়িত্ব। সম্মেলন থেকে উঠে আসা সুপারিশগুলো ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।

ড. কামরুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ টেককানেক্ট এখন একটি জাতীয় পর্যায়ের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সরকার, শিল্প খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এই সম্মেলন নীতিনির্ধারক ও শিল্প খাতের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

তিনি আরও বলেন, “ডিজিটাল অবকাঠামো এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সমৃদ্ধ, বিনিয়োগনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।”

ডিজিটাল অবকাঠামো ও প্রযুক্তির রোডম্যাপ

সম্মেলনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্ম সচিব সাইদা আফরোজ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন হুয়াওয়ে সাউথ এশিয়া অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ও হুয়াওয়ে বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উ জি জেসন। 

চীনভিত্তিক বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের অংশীদারত্বে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উদ্যোগে দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে ‘বাংলাদেশ ডিজিটাল অবকাঠামো ও প্রযুক্তি রোডম্যাপ’ উপস্থাপনের পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মের সংযোগ, শিল্প খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক এআই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে তিনটি পৃথক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনায় নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, টেলিযোগাযোগ অপারেটর, গবেষক এবং শিল্প খাতের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনের মূল আলোচনায় উঠে আসে—ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রগতি শুধু অবকাঠামোর বিস্তারে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নাগরিকের জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ সেবা, দুর্যোগের মধ্যেও সচল সংযোগ, এআই ব্যবহারে জবাবদিহি এবং সরকার ও শিল্প খাতের কার্যকর অংশীদারত্ব নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমই/এমভিএনও//