নেটওয়ার্ক সেন্সিংয়ে সতর্ক কৌশলের পরামর্শ

৫জি সম্প্রসারণে জোর, নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনায় এআই

  • ৫জি-অ্যাডভান্সডে যাওয়ার আগে দেশজুড়ে ৫জি কভারেজ ও সাশ্রয়ী ডিভাইস নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব
  • বিদ্যমান নেটওয়ার্কে এআই ব্যবহারে জ্বালানি খরচ ও পরিচালনগত চাপ কমানোর সুযোগ
  • নেটওয়ার্ক সেন্সিংয়ের বাণিজ্যিক প্রয়োগে মান, নীতিমালা ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির অপেক্ষা প্রয়োজন

৫জি সম্প্রসারণে জোর, নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনায় এআই
২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:২০  
২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:৩৫  

বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে শুধু নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ নয়, বরং দেশের বর্তমান নেটওয়ার্ক সক্ষমতা, ব্যয়, ব্যবহারকারীর চাহিদা ও প্রস্তুতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রযুক্তি বেছে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ৫জি কভারেজ সম্প্রসারণ, বিদ্যমান নেটওয়ার্ক পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার এবং নেটওয়ার্ক সেন্সিংয়ের মতো উদীয়মান প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক কৌশলের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬-এর এক প্যানেল আলোচনায়।

আলোচনায় প্রযুক্তিগত অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে তিনটি দিক গুরুত্ব পেয়েছে। প্রথমত, ৫জি-অ্যাডভান্সডের মতো উন্নত পর্যায়ে যাওয়ার আগে দেশজুড়ে ৫জি নেটওয়ার্কের বিস্তার, ডিভাইসের দাম কমানো এবং শিল্প ও কৃষিতে ব্যবহারযোগ্য সেবা তৈরি করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, এআই-চালিত নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা, ত্রুটি দেখা দেওয়ার আগেই রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন শনাক্ত করা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী অ্যালগরিদমের মতো প্রযুক্তি বিদ্যমান অবকাঠামোতেই কাজে লাগানো সম্ভব। তৃতীয়ত, নেটওয়ার্ক সেন্সিংয়ের মতো প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রয়োগের আগে আন্তর্জাতিক মান, নিয়ন্ত্রক কাঠামো, গোপনীয়তা ও বাস্তব ব্যবহারের প্রস্তুতি বিবেচনা করা দরকার।

বাংলাদেশে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রথম ৫জি কল করা হয়। এরপর কিছু এলাকায় ৫জি সেবা চালু হলেও এর বিস্তার সীমিত। মোবাইল ব্যবহারকারীদের বড় অংশ এখনো ৪জি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। এ অবস্থায় ৫জি-অ্যাডভান্সডে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে আগে ৫জি কভারেজ সম্প্রসারণ, সাশ্রয়ী ডিভাইসের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এবং তৈরি পোশাকশিল্পে শিল্পভিত্তিক ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ও কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তির মতো বাস্তব প্রয়োগ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, সীমিত স্পেকট্রাম, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, বর্ষাকালে অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ এবং দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যবহারকারীর চাহিদার মধ্যে নেটওয়ার্ক পরিচালনা টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এআই-ভিত্তিক রেডিও অ্যাকসেস নেটওয়ার্ক (আরএএন) অপ্টিমাইজেশন, আগাম রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে বিদ্যমান অবকাঠামোর কার্যকারিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বেস স্টেশনের জ্বালানি ব্যবহার কমানো গেলে অপারেটরদের পরিচালন ব্যয় ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ—দুই-ই কমতে পারে।

নেটওয়ার্ক সেন্সিং বা ইন্টিগ্রেটেড সেন্সিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন (আইএসসি) প্রযুক্তিতে একই বেস স্টেশন যোগাযোগের পাশাপাশি ড্রোন শনাক্ত করা, যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ কিংবা আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের মতো কাজ করতে পারে। তবে এ প্রযুক্তির মান, গোপনীয়তা রক্ষার সীমা, নিয়ন্ত্রক বিধান ও স্পেকট্রাম ব্যবহারের বিষয়গুলো এখনো বিকাশমান। তাই তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক প্রয়োগের পরিবর্তে মান উন্নয়নের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, গবেষণায় অংশগ্রহণ এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের মতো পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ধারণা তুলে ধরা হয়েছে।

ভবিষ্যৎ সংযোগ অবকাঠামোয় সমন্বিত উদ্যোগ

‘Future Technologies and Connectivity – Harnessing Opportunities for Bangladesh’s Next-Generation Digital Infrastructure’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কমিশনার (ইঅ্যান্ডও বিভাগ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইকবাল আহমেদ।

আলোচনায় প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নেন টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান, গ্রামীণফোনের প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিআইও) ড. নিরঞ্জন শ্রীনিবাসন, রবি আজিয়াটা পিএলসির প্রধান করপোরেট ও নিয়ন্ত্রকবিষয়ক কর্মকর্তা (সিসিআরও) মোহাম্মদ শাহেদুল আলম এবং হুয়াওয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট উ জি (জেসন)।

উ জি (জেসন) বলেন, পরবর্তী প্রজন্মের ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক সরকারি নীতিমালা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দক্ষ জনবল প্রয়োজন। তিনি স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে বেস স্টেশনের ব্যাটারি উৎপাদনের উদ্যোগ এবং শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে এআই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের কথা তুলে ধরেন। তবে আলোচনার সামগ্রিক প্রযুক্তিগত বার্তা হলো, নতুন প্রযুক্তির দিকে এগোনোর সময় দেশের বাস্তব চাহিদা ও প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

অবকাঠামো শেয়ারিং বাধ্যতামূলক করার আহ্বান

প্যানেল আলোচনায় রবি আজিয়াটা পিএলসির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার মোহাম্মদ সাহেদুল আলম বলেন, গত ১৫ বছর ধরে অবকাঠামো শেয়ারিংয়ের নির্দেশিকা ও নীতিমালা থাকলেও সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা এবং কার্যকর প্রয়োগের অভাবে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি।

তিনি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে অ্যাক্টিভ ও প্যাসিভ—উভয় ধরনের নেটওয়ার্ক অবকাঠামো শেয়ারিং বাধ্যতামূলক করার আহ্বান জানান। এতে কোনো অপারেটর অন্য অপারেটরের শেয়ারিং প্রস্তাব অযৌক্তিকভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না বলে তিনি মনে করেন।

বাজারে অপ্রতিযোগিতামূলক আচরণ রোধ এবং গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রতিযোগিতা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দেন সাহেদুল আলম। এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কমিশনকে কার্যকরভাবে যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।

প্রত্যন্ত এলাকায় স্থল ও স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সমন্বয়

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান বলেন, যেসব প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় বিকল্প নেটওয়ার্ক পৌঁছায়নি, সেখানে স্থলভিত্তিক বা টেরেস্ট্রিয়াল নেটওয়ার্কের সঙ্গে স্যাটেলাইটভিত্তিক বা নন-টেরেস্ট্রিয়াল নেটওয়ার্কের সমন্বয় ও শেয়ারিং অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, অদূর ভবিষ্যতে এ দুই ধরনের নেটওয়ার্কের মধ্যে আরও সমন্বিত সংযোগ তৈরি হবে। ভবিষ্যতের ৬জি প্রযুক্তির জটিলতা মোকাবিলায় নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা, ইন্টারফেরেন্স নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বিষয়ে বিটিআরসি, মোবাইল অপারেটর ও স্যাটেলাইট অপারেটরদের এখন থেকেই যৌথভাবে সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ শুরু করা প্রয়োজন।

সমন্বিত নীতির ওপর গুরুত্ব

আলোচনায় বক্তারা একমত হন যে, শুধু প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উপস্থিতি দিয়ে ডিজিটাল সংযোগের পূর্ণ সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সমন্বিত নীতি, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অবকাঠামো ভাগাভাগি এবং স্থানীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সংযোগকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য সৃষ্টির কার্যকর উপকরণে রূপ দিতে হবে।

//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমই/এমভিএনও//