ইতিহাসের বৃহত্তম ক্রিপ্টো চুরির অভিযোগ; উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের সন্দেহ
বাইনান্সে ৬৩০ কোটি ডলারের সাইবার চুরি
- প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
- হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকিং ইউনিটকে দায়ী করছে বিশ্লেষকেরা
- প্রায় ২৭০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান
বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইনান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলায় প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইন্যালাইসিসের মূল্যায়নে এ হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের সংশ্লিষ্টতার জোরালো ইঙ্গিত রয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাসে এটিকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
২৯ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার রাতে শুরু হওয়া হামলার মূল অংশটি প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে সংঘটিত হয়। তবে বিভিন্ন ব্লকচেইনে বাইনান্সের ওয়ালেট থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্রিপ্টো বাজারে দরপতন শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাইনান্স কয়েকটি নেটওয়ার্কে অর্থ জমা ও উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের আর্থিক ক্ষতি তারা নিজেরাই বহন করবে।
বিটকয়েন-ইথারের দামে বড় পতন
হামলার খবরের পর বিটকয়েনের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে দাঁড়ায়। ইথারের দামও ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে নেমে আসে। বাইনান্সের নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা বিএনবির দামও গত ২৪ ঘণ্টায় ৫ শতাংশ কমে ৭০৯ দশমিক ৭০ ডলারে দাঁড়ায়।
ক্রিপ্টো বাজারের অস্থিরতার প্রভাব পড়ে তালিকাভুক্ত এক্সচেঞ্জ কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও। ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস গ্লোবালের শেয়ারের দাম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এ হামলায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। অন্যদিকে, বিটকয়েন কেনার জন্য পরিচিত প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজির শেয়ারের দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে লেনদেন-পরবর্তী সময়ে প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়।
বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জিএসআরের অরবিন্দ শ্রীনিবাসন এ ঘটনাকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন।
২০ মিনিটে কীভাবে সরানো হলো অর্থ
টিআরএম ল্যাবসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামলাকারীরা বাইনান্সের ব্যবহৃত ডিজিটাল ওয়ালেটগুলোকে এমনভাবে নির্দেশ দিতে সক্ষম হয়, যাতে সেখানকার অর্থ হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণাধীন ওয়ালেটে চলে যায়। ১০টি ব্লকচেইনে বাইনান্সের ওয়ালেট থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হয়। টিআরএমের মূল্যায়নে, হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার অভিজাত হ্যাকিং ইউনিট ‘ট্রেডারট্রেইটর’ জড়িত। প্রতিষ্ঠানটি এ সিদ্ধান্তে উচ্চমাত্রার আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়েছে।
টিআরএমের মতে, হামলার কৌশলের সঙ্গে ২০২৫ সালে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিটে চালানো বড় ধরনের সাইবার হামলার মিল রয়েছে। ওই ঘটনায় প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি হয়েছিল। হামলাটির জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই।
চেইন্যালাইসিসও হামলায় উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে উচ্চমাত্রার আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছে। তবে বাইনান্স এখন পর্যন্ত হামলার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী করেনি।
উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়া বহু বছর ধরে গোয়েন্দাগিরি, আর্থিক চুরি ও রাজস্ব সংগ্রহের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাইবার ইউনিট ব্যবহার করে আসছে।
তবে পিয়ংইয়ং নিয়মিতভাবেই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে জেনেভায় জাতিসংঘে উত্তর কোরিয়ার মিশন এবং চীনে দেশটির দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
টিআরএম তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলেছে, ‘আমাদের মূল্যায়নে এ হামলার জন্য উত্তর কোরিয়ার অভিজাত হ্যাকিং ইউনিট দায়ী।’ প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের আগের কার্যক্রমের মিলও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রকৌশলীর ল্যাপটপ থেকে হামলার সূত্রপাত?
বাইনান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক করার মাধ্যমে হামলার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। ওই কম্পিউটারের মাধ্যমে হ্যাকাররা বাইনান্সের একটি সিস্টেমে প্রবেশ করে অননুমোদিতভাবে অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ দিতে সক্ষম হয়।
বাইনান্স জানিয়েছে, ‘হ্যাক হওয়া কম্পিউটারটি এ ঘটনার প্রবেশপথ হয়ে থাকতে পারে। আমাদের নিরাপত্তা দল ওই কম্পিউটারের মাধ্যমে পুরো হামলার গতিপথ শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।’
টোকিওভিত্তিক বন্ধ হয়ে যাওয়া বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ মাউন্ট গক্সের সাবেক প্রধান মার্ক কারপেলেসের মতে, হ্যাকাররা সম্ভবত বাইনান্সের অন্তত দুটি ওয়ালেটের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চাবি বা প্রাইভেট কি হাতিয়ে নিতে পেরেছিল।
তবে বাইনান্সের প্রাথমিক বক্তব্যে ওয়ালেটের প্রাইভেট কি ফাঁস হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে। ফলে প্রকৌশলীর কম্পিউটার কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ওয়ালেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঠিক কোথায় দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল, তা তদন্তের বিষয় হিসেবে রয়েছে।
প্রায় ২৭০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ
বাইনান্স জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের একটি অংশ জব্দ করতে অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক হিসাবে, প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ শনাক্ত বা জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। তবে জব্দ করা সম্পদ এবং প্রকৃত অর্থে উদ্ধার হওয়া সম্পদ এক বিষয় নয়। বাকি অর্থের অবস্থান ও পুনরুদ্ধারের বিষয়ে তদন্ত চলছে।
স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার জানিয়েছে, এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে তারা। সার্কেল জব্দ করেছে ৮০ কোটি ডলারের বেশি। টিআরএমের হিসাবেও টেথার, সার্কেল, রিপল ও ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদক্ষেপে প্রায় ২৭০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ হয়েছে। এ ছাড়া আরবিট্রামের নিরাপত্তা পরিষদও তাদের নেটওয়ার্কে থাকা কিছু সম্পদ আটকে দিয়েছে।
ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল জানিয়েছে, সম্পদ জব্দ করতে তারা কাস্টোডিয়ান প্রতিষ্ঠান বিটগোর সঙ্গে কাজ করেছে। বাইনান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হে জানিয়েছেন, ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের স্টেবলকয়েন এবং প্রায় ২০ লাখ ডলারের ওয়ার্ল্ড লিবার্টি টোকেন জব্দ করা হয়েছে। ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান রিপলও প্রায় ২০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
বাইনান্সের সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আপনাদের অর্থ নিরাপদ এবং সব ধরনের ক্ষতির দায় আমরা নিচ্ছি। আমাদের তদন্তে এখনো কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়নি।’
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, অর্থ উত্তোলন কার্যক্রম পুনরায় চালুর জন্য নিরাপত্তা যাচাই ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কার্যক্রম স্বাভাবিক করার আশা প্রকাশ করা হয়েছিল।
বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নতুন চাপ
ক্রিপ্টো বাজারে এ হামলার প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধি এবং এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কমে যাওয়ায় আগে থেকেই চাপের মধ্যে ছিল ক্রিপ্টো বাজার।
হংকংভিত্তিক হ্যাশকি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ গবেষক টিম সান বলেন, ‘এ ঘটনা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা আরও কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এক্সচেঞ্জগুলোতে রাখা সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।’
বাইনান্স ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল সম্পদ কেনাবেচা ও লেনদেনের সুযোগ দেয়। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে তাদের নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৩ কোটি ৫০ লাখ। গ্রাহকদের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির হেফাজতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ হাজার ২৮০ কোটি ডলার।
নিরাপত্তা তহবিলের চেয়েও বড় চুরি
সাইবার হামলা বা নিরাপত্তাজনিত ঘটনায় ব্যবহারকারীদের সম্পদ সুরক্ষায় বাইনান্সের একটি বিশেষ তহবিল রয়েছে। ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজারস’ বা ‘সাফু’ নামে পরিচিত এ তহবিলে সম্পূর্ণ বিটকয়েন আকারে ১০০ কোটি ডলার সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, ব্যবহারকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে ওই তহবিলের পাশাপাশি কোম্পানির নিজস্ব অর্থও ব্যবহার করা হবে। ফলে চুরির পরিমাণ সাফু তহবিলের ঘোষিত মূল্যের কয়েক গুণ হলেও বাইনান্সের দাবি, গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতি বহন করবে প্রতিষ্ঠানটি।
ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতে ধারাবাহিক সাইবার চুরির সর্বশেষ ঘটনা এটি। টিআরএম ল্যাবসের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ১৫০টি পৃথক সাইবার হামলায় ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল।
এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বরে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিটগেট জানিয়েছিল, তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি হয়েছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনা ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় এক্সচেঞ্জের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহারকারীদের সম্পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
//ডিবিটেক/জেএনওআর/এসএমই/এমভিএনও//





