১২ মাসের মধ্যে চালুর পরিকল্পনা

নিজস্ব সার্বভৌম এআই অবকাঠামো গড়বে বাংলাদেশ

  • আগামী বছরের মধ্যে সার্বভৌম এআই অবকাঠামো চালুর পরিকল্পনা সরকারের
  • বাংলা ভাষার নিজস্ব লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল তৈরির সুযোগ বাড়বে
  • এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখছে বিডা

নিজস্ব সার্বভৌম এআই অবকাঠামো গড়বে বাংলাদেশ
২ নভেম্বর, ২০২৬ ১১:৫৫  

বিদেশি প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে আগামী ১২ মাসের মধ্যে বাংলাদেশে সার্বভৌম এআই অবকাঠামো চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ অবকাঠামো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং চিপ ও মেমোরি মডিউল সংগ্রহের ব্যবস্থাও নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নিজস্ব এআই অবকাঠামো তৈরি হলে বাংলা ভাষাভিত্তিক লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) উন্নয়ন, স্থানীয় সমস্যার উপযোগী এআই সেবা তৈরি এবং প্রযুক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে।

১২ মাসে সার্বভৌম এআই অবকাঠামোর লক্ষ্য

উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, আগামী বছরের মধ্যে বাংলাদেশে সার্বভৌম এআই অবকাঠামো চালু করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং চিপ ও মেমোরি মডিউল সংগ্রহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। অবকাঠামোটি শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীরাও এটি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।

এর মাধ্যমে দেশের প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকেরা বাংলা ভাষার নিজস্ব লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল তৈরি এবং নতুন এআইভিত্তিক সেবা উদ্ভাবনের সুযোগ পাবেন। বর্তমানে এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও উন্নত মডেল তৈরি ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চক্ষমতার জিপিইউ, কম্পিউটিং সুবিধা, তথ্যভান্ডার ও গবেষণার সুযোগ সীমিত। এ কারণে বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তৈরি মডেল ও ক্লাউড সেবার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতেই বিশাল কোনো এআই কেন্দ্র নির্মাণের পরিবর্তে ছোট ও মডিউলার অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বেসরকারি খাতের চাহিদা বাড়লে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও সেখানে নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যুক্ত করতে পারবে। উন্নতমানের জিপিইউ সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

এআই ও সেমিকন্ডাক্টরে বিনিয়োগের সম্ভাবনা

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী) এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, এ খাতে বিনিয়োগ প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উচ্চমূল্য সংযোজন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে তৈরি পোশাকশিল্পের মতো বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে এসব শিল্পে বিশেষায়িত দক্ষতার চাহিদা বেশি থাকবে।

এআই খাতে বিনিয়োগের সুযোগ ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং, চিপ ডিজাইন, সাইবার নিরাপত্তা ও সফটওয়্যার উন্নয়নেও বিস্তৃত হতে পারে।

স্থানীয় বাস্তবতার উপযোগী এআই তৈরির প্রয়োজন

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীমের মতে, বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি নিজস্ব গবেষণা, তথ্যভান্ডার ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। বাংলাদেশের কৃষি, জলবায়ু, ভাষা ও শিল্পের বাস্তবতা বিবেচনায় স্থানীয় উপযোগী এআই তৈরি করতে হবে।

তার মতে, বাংলা ভাষার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে সক্ষম এআই মডেল তৈরিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো এবং এআই, ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং, রোবোটিকস ও সাইবার নিরাপত্তায় ব্যবহারিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে।

প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত প্রস্তুতি

নিজস্ব এআই অবকাঠামো চালু করা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে গবেষণা, দক্ষ জনবল, মানসম্মত তথ্যভান্ডার, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, উচ্চগতির ইন্টারনেট ও তথ্যনিরাপত্তার ওপর। বিশেষ করে বাংলা ভাষার মানসম্মত ডিজিটাল তথ্যভান্ডার এবং স্থানীয় সমস্যাভিত্তিক এআই মডেল তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

কৃষিতে আবহাওয়াভিত্তিক পরামর্শ, আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস, নগর পরিবহনে যানজট ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবায় তথ্য বিশ্লেষণ এবং তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মতো ক্ষেত্রে স্থানীয় এআই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সমাধান তৈরির জন্য দেশীয় তথ্য, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।

বাংলাদেশের এআই অগ্রযাত্রার পরবর্তী ধাপ তাই শুধু বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার নয়; নিজস্ব মডেল, গবেষণা, অবকাঠামো ও উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। সরকারের পরিকল্পিত সার্বভৌম এআই অবকাঠামো এ লক্ষ্য অর্জনে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, উন্মুক্ত ব্যবহারের সুযোগ এবং দেশীয় গবেষক ও উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের ওপর।

//ডিবিটেক/এমজেআর/এসএমই/এমআইএসটি//