ই-ক্যাব নির্বাচন:

মোট সদস্যের মাত্র ১৭% হলেন ভোটার, আবেদন করেও বাদ ৩৩%!

  • সাবেক সভাপতিসহ ৭৪ শতাংশ সদস্য আবেদনই করেননি
  • প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সহ বাদ পড়েছেন সংস্কারপন্থিরাও
  • প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির রিটার্ন নিয়ে দ্বৈত নীতির অভিযোগ
  • আপিলের সুযোগ শনিবার পর্যন্ত

মোট সদস্যের মাত্র ১৭% হলেন ভোটার, আবেদন করেও বাদ ৩৩%!
৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:২৪  
৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:৫৪  

দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং দফায় দফায় প্রশাসকের মেয়াদ ফুরোনোর পর অবশেষে নির্বাচনের পথে হেঁটেছে দেশের ই-কমার্স খাতের জাতীয় বাণিজ্য সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)। তবে ২০২৬–২০২৮ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক এই কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচনের প্রাথমিক ভোটার তালিকাকে কেন্দ্র করে উৎসবের চেয়ে ক্ষোভ ও হতাশা বেশি দানা বেঁধেছে সদস্যদের মধ্যে। সংগঠনটির ৩ হাজারের বেশি সদস্যের মধ্যে প্রাথমিক ভোটার তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন মাত্র ১৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ সদস্য। অন্যদিকে শত বাধা পেরিয়ে নির্ধারিত সময়ে ভোটার হতে আবেদন করেও নথিপত্রের কঠোর বেড়াজালে এক ঝটকায় বাদ পড়েছেন প্রায় ৩৩ শতাংশ উদ্যোক্তা।

​নির্বাচন বোর্ডের ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, সদস্য নম্বর ৩০০৮ পর্যন্ত বিস্তৃত ই-ক্যাবের মোট সদস্য সংখ্যার মধ্যে সদস্যপদ নবায়ন ও ভোটার হওয়ার আবেদন জমা পড়েছিল মাত্র ৭৭৭টি। অর্থাৎ সাবেক সভাপতি শমী কায়সারসহ প্রায় ২ হাজার ২৩১ জন (৭৪ শতাংশের বেশি) সাধারণ সদস্য ভোটার হতেই কোনো আবেদন করেননি। আর যে ৭৭৭ জন আবেদন করেছিলেন, তাদের মধ্যে প্রাথমিক তালিকায় ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন ৫২৩ জন। বাকি ২৫৪ জনের (৩২ দশমিক ৬৯ শতাংশ) আবেদনই বিভিন্ন নথির ঘাটতি দেখিয়ে বাতিল করেছে নির্বাচন বোর্ড।

​এই প্রাথমিক তালিকা প্রকাশের পর থেকেই ই-কমার্স পাড়ায় বইছে তীব্র সমালোচনার ঝড়। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক শীর্ষ নেতৃত্বের বাদ পড়ায়। ই-ক্যাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং একাধিক মেয়াদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বাদ পড়েছেন ওয়েবসাইটের হোমপেজ বা ফেসবুক পেজের স্ক্রিনশট দাখিল না করার অভিযোগে। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল হক অনু বাদ পড়েছেন হালনাগাদ আয়কর সনদ না থাকায়। অন্যদিকে সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ও ডায়াবেটিসস্টোর লিমিটেড ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন,  ফুডপ্যান্ডা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সাবেক সহ-সভাপতি সৈয়দা আম্বারীন রেজা, ওমান এন্ড ই কমার্স স্বত্বাধিকারী নাসিমা আক্তার নিশার আবেদন বাতিল হয়েছে পরিচালনা পর্ষদের মনোনয়ন রেজুলেশন না থাকার কারণে। এমনকি পাঠাও লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম আহমেদ কিংবা সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের চেয়ারম্যান এ এইচ এম সাইফুল আলমের মতো শীর্ষ উদ্যোক্তারাও বাদ পড়ার তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। বাতিল হয়েছে স্টার কম্পিউটার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজওয়ান খান, জেনেক্স ইনফোসিস পিএলসির প্রতিনিধি চৌধুরী ফজলে আলম, বাটারফ্লাই ম্যাটেরিমনিয়াল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফুরায়রা শিশির, সংস্কার পন্থী বিডিজবস সিইও ফাহিম মাশরুর, এক্সপ্রেস ইন টাউন পরিচালক সৈয়দ উছওয়াত ইমাম, মাস্টার ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজির মোহাম্মদ আনোয়ার সাদাৎ এর মত পরিচিত উদ্যোক্তাদের ভোটার আবেদন।

​ভোটার তালিকায় বাদ পড়ার ধরন নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে উদ্যোক্তারা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিগুলোর ওপর আরোপিত নীতিকে সরাসরি 'দ্বৈত নীতি' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ক্ষুব্ধ সদস্যদের বক্তব্য, প্রোপাইটরশিপ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মালিকের ব্যক্তিগত আয়কর রিটার্ন দাখিল করলেই যদি তাকে বৈধ ভোটার করা যায়, তবে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে কেন কোম্পানির আলাদা কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হলো? যেখানে কোম্পানির মালিক বা পরিচালকের ব্যক্তিগত কর পরিশোধ ও প্রত্যয়নপত্র রয়েছে, সেখানে কোম্পানির রিটার্ন না থাকার অজুহাতে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এই দ্বৈত নীতি অবিলম্বে পরিহার করা উচিত।

​সংগঠনের এক ক্ষুব্ধ সদস্য পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এই প্রথম দেখলাম, কোনো অ্যাসোসিয়েশনে ভোটের উৎসবের পরিবর্তে ভোটার বাদ দেওয়ার উৎসব চলছে! নির্বাচন তো হওয়ার কথা সদস্যদের অংশগ্রহণ, মতামত ও গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার একটি উৎসব। অথচ সেখানে যদি ভোটার তালিকা থেকে সদস্যদের বাদ পড়া নিয়েই বেশি আলোচনা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে এই নির্বাচন আসলে কতটা অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে? একটি সংগঠনের শক্তি তার সদস্যদের অংশগ্রহণে, সদস্যসংখ্যা কমিয়ে দেওয়ায় নয়। আমরা চাই, যোগ্য প্রত্যেক সদস্য যেন স্বচ্ছ ও ন্যায্য প্রক্রিয়ায় ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান। নির্বাচন হোক সবাইকে নিয়ে, কাউকে বাদ দিয়ে নয়।"

​তবে অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও যেসব সদস্য প্রাথমিক ভোটার তালিকায় জায়গা পেয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছে স্বস্তি ও প্রত্যাশার সুর। বৈধ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া এক সদস্য নিজের অনুভূতি জানিয়ে বলেন, "e-CAB-এর একজন সদস্য হিসেবে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া আমার জন্য আনন্দের ও উৎসাহব্যঞ্জক। আমি আশা করি, আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে এবং ই-ক্যাবের সদস্যদের অধিকার, মর্যাদা ও ই-কমার্স খাতের উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় e-CAB আরও শক্তিশালী, গতিশীল ও সদস্যবান্ধব সংগঠন হিসেবে এগিয়ে যাক—এই প্রত্যাশা করি।"

​ই-ক্যাবের এই নির্বাচনী অচলাবস্থার শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কার্যনির্বাহী কমিটির গণপদত্যাগের মধ্য দিয়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তখন কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কমার্স সেলের তৎকালীন উপসচিব মুহাম্মদ সাঈদ আলীকে ১২০ দিনের জন্য প্রশাসক নিয়োগ দিলেও তা কার্যকর রূপ নেয়নি। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. সাইফ উদ্দিন আহম্মদকে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু উচ্চ আদালতের রিট মামলা (রিট নং ১১৬০০/২০২৫) ও আইনি মারপ্যাঁচে প্রশাসকের নির্দিষ্ট মেয়াদ বারবার পার হয়ে যায়। সম্প্রতি সেই রিট নিষ্পত্তি হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্বাচন সম্পন্ন করার চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে গত ২৩ সেপ্টেম্বর নতুন নির্বাচন বোর্ড ও নির্বাচনী আপল বোর্ড পুনর্গঠন করে।

​বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত এই নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (ডব্লিউটিও শাখা-৫) শরীফ মোস্তাফিজুর রহমান। বোর্ডের অন্য দুই সদস্য হলেন উপসচিব (পরিকল্পনা-১) ফিরোজ আল মামুন এবং উপনিয়ন্ত্রক (এফটিএ-৪) মো: সিরাজুল ইসলাম। অন্যদিকে আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (টিএসএম অধিশাখা) সুফিয়া আক্তার রুমী এবং সদস্য হিসেবে রয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মাহবুবুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

​নির্বাচন বোর্ডের ঘোষিত নোটিশ অনুযায়ী, বাদ পড়া ২৫৪ জন সদস্যের জন্য নিজেদের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সুযোগ এখনও রয়েছে। সংক্ষুব্ধ ও বাতিল হওয়া সদস্যরা প্রয়োজনীয় প্রমাণক ও হালনাগাদ নথিপত্রসহ নির্বাচনী আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন করতে পারবেন। এই আপত্তি ও সংশোধনের আবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর ২০২৬, প্রতিদিন অফিস চলাকালীন এবং শেষ দিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত। আপিল শুনানি শেষে আগামী ৫ ও ৬ নভেম্বর নির্বাচন বোর্ড প্রকাশ করবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা।

​তফসিল অনুযায়ী, ই-ক্যাবের ১১টি কার্যনির্বাহী পদের (সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক, অর্থ সম্পাদক এবং ৫টি পরিচালক পদ) জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিল চলবে ৬ থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত। যাচাই-বাছাই শেষে ২৫ নভেম্বর বৈধ প্রার্থী তালিকা এবং প্রত্যাহারের সময় পেরিয়ে ২৮ নভেম্বর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। আগামী ১৯ ডিসেম্বর ২০২৬ (শনিবার) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে এবং সেদিনই প্রাথমিক ফলাফল ও ২৩ ডিসেম্বর চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে।

​উদ্যোক্তারা মনে করছেন, নির্বাচন বোর্ড ও আপিল বোর্ড যদি কঠোর টেকনিক্যাল অজুহাতের বাইরে এসে বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নথিপত্র পুনঃপরীক্ষা করে, তবে চূড়ান্ত তালিকায় ভোটারের সংখ্যা বাড়বে এবং দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত এই নির্বাচন সত্যিকার অর্থেই একটি অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক উৎসবে রূপ নেবে।

​//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমপি/এমআইএসটি//