রোদের শরীরে তামার কারুকাজ: আগামীর সৌরপ্রযুক্তি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সমীকরণ

আলোর সুতোয় শক্তির বুনন: সৌরকোষের অন্দরমহল ও আগামীর স্বয়ম্ভরতা

রোদের শরীরে তামার কারুকাজ: আগামীর সৌরপ্রযুক্তি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সমীকরণ
২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:৫৪  
  • এআই ও ডেটা সেন্টারের উল্লম্ফন বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ চাহিদা দ্বিগুণ করার মুখে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুৎকে করেছে  অপরিহার্য
  • সৌরকোষের ধাতব সংযোগরেখা (মেটালাইজেশন) নিখুঁত করার মাধ্যমে আলোক ছায়া ও বিদ্যুৎ পরিবহণ প্রতিরোধের ভারসাম্য রক্ষাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ
  • মহার্ঘ্য রুপার বিকল্প হিসেবে কপার বা তামার পেস্টের সফল প্রয়োগ সৌরকোষ উৎপাদনের ওয়াট-প্রতি খরচ বহুলাংশে কমিয়ে আনতে পারে
  • জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মডিউল জোড়াতালির বাইরে বিশুদ্ধ সিলিকন, ওয়েফার ও বিশেষায়িত কেমিক্যালের স্থানীয় সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলা  জরুরি
  • উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রিন্টিং ও মেটেরিয়াল সায়েন্সের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রিন্টেড ইলেকট্রনিক্স ও সেন্সর প্রযুক্তিতেও বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম

চারদিকে বিদ্যুৎ-ক্ষুধা কেবল বাড়ছে। আধুনিক শিল্পকারখানা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ও পরিবহন সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি যেখানে মূল চালিকাশক্তি, সেখানে বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর তাগিদও এখন চরম বাস্তব। এর সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডেটা সেন্টারগুলোর বিপুল বিদ্যুতের ক্ষুধা। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যেই ডেটা সেন্টারগুলোর সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছাবে। জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যের তীব্র ওঠানামা এবং জ্বালানি সংকটের এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় সৌরবিদ্যুৎ কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং জ্বালানি স্বয়ম্ভরতার প্রধান ভিত্তি। তবে এর জন্য প্রয়োজন আরও দক্ষ সৌরকোষ, সাশ্রয়ী কাঁচামাল এবং সুদৃঢ় উৎপাদন ব্যবস্থা।

একজন ফটোভোলটাইক (পিভি) প্রসেস ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমার কাজের মূল জায়গাটি হলো ল্যাবরেটরির সেমিকন্ডাক্টর বিজ্ঞান এবং কারখানার বাস্তব উৎপাদন ব্যবস্থার সেতুবন্ধন রচনা করা। টু-ডাইমেনশনাল সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে গ্যাস সেন্সিং গবেষণার যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ার অতিসূক্ষ্ম রাসায়নিক পরিবর্তনগুলো চূড়ান্ত ডিভাইসের তড়িৎ আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে।

সৌরকোষ প্রযুক্তির অন্যতম সূক্ষ্ম অথচ গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো এর ধাতব সংযোগরেখা বা ‘মেটালাইজেশন জিওমেট্রি’। সিলিকন চিপের ওপর স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে এই অতিসূক্ষ্ম পরিবাহী ধাতব দাগগুলো টানতে হয়। এখানে কাজ করে একটি দ্বিবিধ দ্বন্দ্ব—রেখাগুলো যত সরু হবে, সূর্যরশ্মির জন্য সৌরকোষের উপরিভাগ তত বেশি উন্মুক্ত থাকবে এবং ছায়াজনিত ক্ষতি কমবে; আবার অন্যদিকে, রেখাগুলো অতিরিক্ত সরু বা পাতলা হলে বিদ্যুতের অভ্যন্তরীণ পরিবহন প্রতিরোধ (রেজিস্ট্যান্স) বেড়ে গিয়ে কোষের কার্যক্ষমতা নষ্ট হবে। ফলে স্ক্রিনের জালির ঘনত্ব, পরিবাহী পেস্টের ঘনত্ব, প্রিন্টিংয়ের চাপ কিংবা স্ন্যাপ-অফ দূরত্বের মতো প্রতিটি চলক নিয়ে নিখুঁত পরিসংখ্যানিক নিরীক্ষা করতে হয়। পেস্টের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলেই সংযোগ ভালো হয় না; বরং অতিরিক্ত ধাতু সৌরকোষের কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে।

সৌর প্রযুক্তির অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দেয় মূল্যবান ‘রুপা’ (Silver)। প্রথাগত সোলার সেলে কন্টাক্ট তৈরির জন্য সিলভার পেস্ট ব্যবহৃত হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এর বিকল্প হিসেবে তামা (Copper) ব্যবহারের পথ খুঁজছি আমরা। তামা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হলেও এর ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ বিপুল। তামা দ্রুত বাতাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে অক্সাইড তৈরি করে, সেমিকন্ডাক্টরের ভেতরে প্রবেশ করে সংযোগ নষ্ট করার প্রবণতা দেখায় এবং সিলিকনের সঙ্গে সহজে শক্ত বন্ধন তৈরি করতে চায় না। হাইব্রিড স্ট্রাকচার কিংবা রূপার প্রলেপযুক্ত তামার কণা ব্যবহার করে কীভাবে এই জারণ ও পরিবাহী সমস্যা সমাধান করা যায়, সেটাই বর্তমান গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। তবে দিনশেষে সাফল্য নির্ভর করবে চূড়ান্ত হিসেবে—প্রতি ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সামগ্রিক খরচ কতটা কমল।

শুধু প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেই চলবে না, স্বয়ম্ভরতার প্রশ্নটি এখানে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। বর্তমানে সৌরকোষ উৎপাদনের সিংহভাগ শিল্প এশিয়াকেন্দ্রিক। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের নির্মাতারা এখনও পরিবাহী পেস্ট, প্রিন্টিং স্ক্রিন কিংবা বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির জন্য নির্দিষ্ট কিছু উৎসের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল। প্রকৃত জ্বালানি নিরাপত্তা পেতে হলে কেবল সৌর প্যানেল বা মডিউল জোড়া লাগালে (অ্যাসেম্বল) চলবে না; এর পেছনের খনিজ প্রক্রিয়াকরণ, অতি-বিশুদ্ধ সিলিকন পরিশোধন, ওয়েফার তৈরি এবং সেল ফ্যাব্রিকেশনের মতো মৌলিক ধাপে বিনিয়োগ প্রয়োজন।

এই ফলিত গবেষণার সুফল কেবল সৌরকোষেই সীমাবদ্ধ নয়। তামার পরিবাহী পেস্টের মুদ্রণযোগ্যতা, স্থায়িত্ব এবং তড়িৎ আচরণের এই বিজ্ঞান ভবিষ্যতে স্বল্পব্যয়ী প্রিন্টেড ইলেকট্রনিক্স, পরিধানযোগ্য সেন্সর এবং বৈচিত্র্যময় সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে নতুন দুয়ার উন্মোচন করবে। বিজ্ঞানাগারের জ্ঞান যখন বৃহৎ শিল্পের রূপরেখা পাল্টে দেয়, তখনই প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের নাগালে আসে এবং গড়ে ওঠে টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের হানওয়া কিউসেলস জর্জিয়া ইনকর্পোরেটেডের প্রসেস ইঞ্জিনিয়ার। তিনি ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাস থেকে মেটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে যন্ত্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

সম্পাদকীয় নোট:
বিশ্বজুড়ে যখন পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে রূপান্তর ঘটছে, তখন সোলার প্যানেলের অভ্যন্তরীণ মাইক্রো-ইঞ্জিনিয়ারিং ও ভূ-রাজনৈতিক সাপ্লাই চেইনের জটিলতাগুলো প্রায়শই আলোচনায় আড়ালে পড়ে থাকে। আশিক জামানের এই নিবন্ধটিতে সেমিকন্ডাক্টর ল্যাবরেটরির ন্যানো-স্কেল রসায়ন থেকে শুরু করে বৈশ্বিক উৎপাদন সক্ষমতার রাজনীতি—উভয় দিকই চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। রূপার পরিবর্তে তামার মতো সাশ্রয়ী ধাতুর সফল মেটালাইজেশন সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় যে যুগান্তকারীভাবে কমিয়ে আনতে পারে, সেই বাস্তবমুখী কারিগরি অন্তর্দৃষ্টি নীতি-নির্ধারক ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।