উপাচার্য নিয়োগে সংকট গভীর
চুয়েটে অচলাবস্থা, অনড় শিক্ষার্থীরা
- ক্যাম্পাসে ফেরার শর্ত নিয়ে শিক্ষার্থী ও উপাচার্যের বক্তব্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে
- অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শাটডাউন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা শিক্ষার্থীদের
- রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগের পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের দাবি উঠেছে
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে ফেরা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অনড় অবস্থান, আগের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ- সব মিলিয়ে সংকটের সমাধান এখনো অনিশ্চিত। শিক্ষার্থীদের দাবি, ক্যাম্পাস ছাড়ার সময় উপাচার্যকে আর ফিরে আসতে না দেওয়ার শর্ত জানানো হয়েছিল এবং তিনি তাতে সম্মত হয়েছিলেন। তবে এ দাবি ও সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের মধ্যে বিরোধ থাকায় ঘটনাটির স্বাধীন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব দাবি করেন, উপাচার্য ক্যাম্পাস ছাড়ার আগে তাকে আর ফিরে আসতে না দেওয়ার শর্ত জানানো হয়েছিল। তার ভাষ্য, জেলা প্রশাসক, গণমাধ্যমকর্মী, উপাচার্য ও তাঁর সহযোগীদের সামনে মাইকে তিনবার বিষয়টি ঘোষণা করা হয়। অন্যান্য শর্তের পাশাপাশি এই শর্তও তারা শুনেছিলেন এবং মাথা নেড়ে মৌন সম্মতি জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। এরপর জেলা প্রশাসকের সঙ্গে উপাচার্য ও তাঁর সহযোগীরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন বলে জানান আহনাফ।
তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে চুয়েটের উপাচার্য পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশিত ঘটনাক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সমকালের ১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। আন্দোলনের কারণে নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে যেতে না পেরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস থেকে দাপ্তরিক কাজ করছিলেন। ফলে ক্যাম্পাস ছাড়ার সময় কার সঙ্গে কোন শর্তে সমঝোতা হয়েছিল, তা নির্দিষ্ট করে যাচাই করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের বক্তব্যকে এ বিষয়ে তাঁদের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
‘সবার আস্থা নিয়ে ফেরার প্রশ্ন নেই’
নতুন উপাচার্য সবার আস্থা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসার কথা বলেছেন- এ প্রসঙ্গে আহনাফ অর্ণব বলেন, তার ক্যাম্পাসে ফেরার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সম্মতির কোনো সুযোগ নেই। পূজার ছুটিতে অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি চলে গেলেও ক্যাম্পাসে থাকা শিক্ষার্থীরা তাকে প্রতিহত করছেন বলে দাবি করেন তিনি। ছুটি শেষে শিক্ষার্থীরা ফিরে এলে তাঁদের অবস্থান আরও স্পষ্ট হবে বলেও মন্তব্য করেন আহনাফ।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের অবস্থান পরিষ্কার- নতুন উপাচার্য কোনোভাবেই ক্যাম্পাসে ফিরতে পারবেন না। এ অবস্থানকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু করতে প্রশাসনিক সমাধান এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
ছুটিতেও শাটডাউন, ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা
টানা ২৩ দিনের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানান আহনাফ। তবে পূজার ছুটিতেও পূর্ণাঙ্গ শাটডাউন কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কথা বলেন তিনি। ছুটিতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাড়ি চলে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে পাহারা সীমিত হতে পারে বলেও জানান।
একাডেমিক কার্যক্রম পিছিয়ে পড়ার বিষয়ে আহনাফ বলেন, পূজার ছুটির মধ্যেই সরকার তাদের দাবির পক্ষে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করবে বলে তাঁরা আশা করছেন। প্রজ্ঞাপন জারি না হলেও ছুটি শেষে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তবে সে ক্ষেত্রে নতুন উপাচার্যকে ছাড়াই শিক্ষা কার্যক্রম চালুর কথা জানান তিনি।
আহনাফ আরও বলেন, দাবি পূরণ না করে নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে ফিরতে চাইলে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর সমর্থন নিয়ে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁকে প্রবেশে বাধা দেওয়া হবে। এ বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়া এবং প্রশাসনিক নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
‘নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ, সমঝোতা নয়’
চুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম জনি বলেন, শিক্ষার্থীরা কাউকে অসম্মান করতে চাননি; তাঁদের লক্ষ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা। তার দাবি, উপাচার্যকে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল মানবিকতার জায়গা থেকে, কোনো সমঝোতার অংশ হিসেবে নয়।
জনি বলেন, “ক্যাম্পাসে আর ফিরবেন না- এই শর্তেই তাকে যেতে দেওয়া হয়েছিল। এখন সেই শর্ত উপেক্ষা করে ফিরে আসার চেষ্টা করা হলে তার দায় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো যাবে না।”
তিনি আরও বলেন, অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত শাটডাউন ও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি চলবে। ফলে আন্দোলনকারীদের মূল দাবি এখনো আগের উপাচার্যের পুনর্বহাল এবং নতুন উপাচার্যের নিয়োগের বিরুদ্ধে অবস্থানেই কেন্দ্রীভূত।
নিয়োগের ৫৬ দিনের মাথায় পরিবর্তন, শুরু অচলাবস্থা
সমকালের ১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। ৫৬ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শাটডাউন ও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি চলতে থাকে। পরে শিক্ষক সমিতি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশও কর্মসূচিতে যুক্ত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য
সমকালের ওই প্রতিবেদনে চুয়েটের উপাচার্য নিয়োগ ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তির অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সাবেক উপাচার্য সায়েমের যোগাযোগ ছিল। অন্যদিকে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে কিছু শিক্ষকের যোগাযোগের প্রসঙ্গও প্রতিবেদনে আসে। তবে এসব যোগাযোগের অর্থ রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এক নয়।
দৈনিক সমকালকে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, চুয়েট নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনেকে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। তিনি তাঁদের বিষয়টি নিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলতে বলেছেন বলেও জানান। চুয়েট তাঁর পরিবারের ঐতিহাসিক সম্পর্কের জায়গা উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ঠিকমতো চলছে কি না, তা দেখার দায়িত্বের কথাও বলেন তিনি।
অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জানান, উপাচার্য নিয়োগে তিনি কোনো পক্ষের প্রতি সমর্থন দেননি। তাঁর বক্তব্য, সরকার নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছে এবং সেটি সবার মেনে নেওয়া উচিত। সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিমত থাকলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার কথাও বলেন তিনি। ফলে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্যে ভিন্ন অবস্থান উঠে এসেছে।
সমকালের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শিক্ষক সমিতির একটি অনলাইন সভার খণ্ডিত অডিও কথোপকথন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অডিওতে কয়েকজন শিক্ষক উপাচার্য নিয়োগ ও আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে চুয়েট শিক্ষক সমিতি ওই অডিওকে আড়াই ঘণ্টার জরুরি সাধারণ সভার ‘খণ্ডিত ও ভিত্তিহীন অংশ’ বলে দাবি করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। তাই অডিওর বক্তব্য ও তার ব্যাখ্যা—দুই দিকই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
সমাধানের কেন্দ্রে আস্থা ও জবাবদিহি
চুয়েটের সংকট এখন কেবল উপাচার্যের পদে কে থাকবেন, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়োগের গ্রহণযোগ্যতা, শিক্ষার্থীদের আস্থা, শিক্ষকসমাজের অবস্থান, প্রশাসনিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ। শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত শাটডাউন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে নতুন উপাচার্যকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্বাভাবিক করার প্রশ্নও সামনে রয়েছে।
দীর্ঘ অচলাবস্থার ফলে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই, স্বচ্ছ আলোচনা এবং গ্রহণযোগ্য প্রশাসনিক সমাধান ছাড়া সংকট নিরসন কঠিন হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নিয়োগসংক্রান্ত বিরোধের পাশাপাশি আস্থা ও জবাবদিহির প্রশ্নেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদেরা।
//ডিবিটেক/মো: রাকিব হাসান/এসভিপি/এমআইএসটি//





