সুশাসন ও পুনর্ব্যবহারে ঘাটতি

দেড় লাখ ইভিএমে ই-বর্জ্য ঝুঁকি

  • ৪১ জেলায় পড়ে আছে দেড় লাখ পরিত্যক্ত ইভিএম
  • ই-বর্জ্যের ৯০ শতাংশের বেশি সংগ্রহ করেন অনানুষ্ঠানিক কর্মীরা
  • ই-বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ার উদ্যোগ সরকারের

দেড় লাখ ইভিএমে ই-বর্জ্য ঝুঁকি
১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:২৯  

দেশের ৪১ জেলায় পড়ে থাকা দেড় লাখ পরিত্যক্ত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব যন্ত্র সংরক্ষণে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও এগুলোর মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহারের দায়িত্ব নির্ধারণে কার্যকর নির্দেশনা নেই। একই সঙ্গে দেশের ই-বর্জ্যের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের মাধ্যমে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত হওয়ায় কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণেও ঘাটতি রয়েছে।

১৪ অক্টোবর, বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুশাসন: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব উদ্বেগ তুলে ধরেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ।

ইভিএম সংরক্ষণে ব্যয়, নেই ব্যবস্থাপনা নির্দেশনা

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪১ জেলায় প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার ইভিএম অব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এসব যন্ত্রের মালিকানা এবং কে কীভাবে এগুলো ব্যবস্থাপনা বা নিষ্পত্তি করবে, তা স্পষ্ট নয়। যন্ত্রগুলো যেখানে রাখা হয়েছে, সেসব স্থানের ভাড়াও নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নীতিগত দুর্বলতা, আইন প্রয়োগে ঘাটতি, নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে।

২০২১ সালে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা প্রণয়ন করা হলেও দক্ষতা ও সচেতনতার ঘাটতিতে এর বাধ্যবাধকতাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অনানুষ্ঠানিক খাতে স্বাস্থ্যঝুঁকি

টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের মতে, দেশের ই-বর্জ্যের ৯০ শতাংশের বেশি সংগ্রহের কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা। অথচ তাঁদের কাজের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা অপর্যাপ্ত।

ই-বর্জ্যে থাকা ক্ষতিকর উপাদান যথাযথভাবে পৃথক ও প্রক্রিয়াজাত না করলে পরিবেশদূষণ এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, বৈধ ও নিরাপদ পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা না থাকায় ইলেকট্রনিক যন্ত্রে থাকা মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার এবং অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগও হারাচ্ছে দেশ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গ তুলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সোলার প্যানেল ব্যবহারের পর সেগুলো যখন বর্জ্যে পরিণত হবে, তখন কীভাবে সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও পুনর্ব্যবহার করা হবে, তা আগেভাগেই নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। একইভাবে ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও পরিকল্পনার আওতায় আনার তাগিদ দেন তিনি।

ই-বর্জ্য থেকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

প্রধান অতিথি ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, ই-বর্জ্য সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত না করায় বাংলাদেশ মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার এবং সম্ভাব্য রাজস্ব অর্জনের সুযোগ হারাচ্ছে।

তিনি জানান, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য দেশি উদ্যোক্তা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। গৃহস্থালি ই-বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে মধ্যবর্তী পণ্য হিসেবে বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ক্ষতিকর ই-বর্জ্য আমদানির পরিবর্তে দেশের অভ্যন্তরে উৎপন্ন বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাসেল কনভেনশনের নিয়ম অনুসরণের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘থ্রি-আর’—বর্জ্য কমানো, পুনর্ব্যবহার এবং পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ—নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে সাইমুম পারভেজ বলেন, স্মার্টফোন, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। এ কাজ শুধু সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়; সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।

বৃক্ষরোপণে অ্যাপ ও স্যাটেলাইট নজরদারি

পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসঙ্গে সাইমুম পারভেজ জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলোর টিকে থাকার হার পর্যবেক্ষণে একটি ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ’ এবং স্যাটেলাইট ইমেজিং ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে কোথায় কত গাছ লাগানো হয়েছে এবং সবুজ আচ্ছাদন কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তিনি জানান।

সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কমিশনার (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইকবাল আহমেদ, কমিশনের মহাপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউর রহমান, টিআইবির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আব্দুল্লাহ জাহিদ ওসমানী এবং ডব্লিউইইই সোসাইটি বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সুমন আহমেদ সাবির।

//ডিবিটেক/ডিএডিএনবি/এসএমপি/ওইএম//