ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটির অপেক্ষায় প্রথম ইউনিট

রূপপুরে বিদ্যুতের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ

  • বায়রার অনুমতি মিললেই শুরু হবে রূপপুরের ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি।
  • ডিসেম্বরের শেষে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
  • ইউরেনিয়াম পরিবহন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগও সামনে এসেছে।

রূপপুরে বিদ্যুতের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ
৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:৫৮  

রিঅ্যাক্টরে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরুর ঠিক আগের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট। চাপ, তাপমাত্রা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর এখন পরবর্তী বড় ধাপ ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) অনুমতি মিললে এই ধাপ শুরু হবে। সব পরীক্ষা ও অনুমোদন পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ডিসেম্বরের শেষ দিকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে থেকে ৭ অক্টোবর, বুধবার রাতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটের স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভের পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম ধাপে ১৬ দশমিক ১ মেগাপ্যাসকেল পরিচালন চাপ এবং ২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রেখে ১২টি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফলভাবে শেষ করা হয়।

পরবর্তী ধাপে ১৮ দশমিক ৬৫ মেগাপ্যাসকেল চাপে পরীক্ষা করতে গিয়ে প্রথমে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। নির্ধারিত চাপে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভালভ একসঙ্গে খুলে অতিরিক্ত চাপ বের করে দেওয়ার কথা থাকলেও শুরুতে তা হয়নি। পরে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

এর আগে ভালভে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর বাংলাদেশ রাশিয়ার সহযোগিতা চায়। মস্কো থেকে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ দল রূপপুরে এসে একে একে ৯টি ভালভ মেরামত করে। এরপর বিভিন্ন ধাপে সেগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।

চাপ নিয়ন্ত্রণ ও অতিরিক্ত চাপ কমানোর পরীক্ষাগুলো কেন্দ্রের প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ বা এমসিআর এবং জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ বা ইসিআর—দুই জায়গা থেকেই পরিচালনা করা হয়। পরীক্ষার সময় ভালভ খোলা ও বন্ধ হওয়ার সময়, সাড়া দেওয়ার গতি, সতর্কসংকেত এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় চাপ ও তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

রূপপুরের প্রথম ইউনিটের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরে একটি স্থিতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হবে। এর মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর স্থির বা পরীক্ষামূলক অবস্থান থেকে সক্রিয় অপারেশনাল পর্যায়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করবে।

ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরকে তার পূর্ণ নির্ধারিত তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে পরিচালনা করে প্রাথমিক ক্রিটিক্যালিটিতে নেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে প্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন।

এই পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ পরামিতি, বিভিন্ন সিস্টেম, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করা হবে। ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটিসহ পুরো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে।

পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে। এরপর শুরু হবে ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়। তখন রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ানোর পাশাপাশি টারবাইনকে রিঅ্যাক্টরের সঙ্গে সমন্বয় এবং শেষ পর্যন্ত জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ হবে।

এ জন্য পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে বায়রার কাছ থেকে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স নিতে হবে।

গ্রিডে সংযোগের প্রযুক্তিগত ধাপ

পাওয়ার স্টার্ট-আপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টর, টারবাইন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে তাৎক্ষণিক ও অত্যন্ত সমন্বিত যোগাযোগ প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তিগত ও নিয়ন্ত্রক সমন্বয়ও নিশ্চিত করতে হবে।

এর মধ্যে থাকবে বায়রা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড-সংশ্লিষ্ট সংস্থা, সামরিক বাহিনী, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, নিউক্লিয়ার ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি সংস্থা ও মন্ত্রণালয়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে নিরাপদভাবে সংযুক্ত করার আগে শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩ শতাংশে নেওয়া হবে। এরপর ধাপে ধাপে তা ২০ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ পর্যায় পার হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে।

বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর পর পরীক্ষামূলক উৎপাদন টানা ৭ থেকে ৮ মাস চলতে পারে। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে একটি ইউনিট থেকে পূর্ণ ক্ষমতায় বাণিজ্যিক উৎপাদনের দিকে যাওয়ার প্রক্রিয়া এগোবে।

গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে যুক্ত হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায় তৈরি হবে।

ইউরেনিয়াম পরিবহনেও নিরাপত্তা প্রশ্ন

রূপপুরের উৎপাদন প্রস্তুতির পাশাপাশি পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহন নিয়েও নিরাপত্তা প্রশ্ন সামনে এসেছে। ৩ অক্টোবর রাশিয়া থেকে আসা নতুন ইউরেনিয়াম জ্বালানি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তিনটি বিশেষায়িত গাড়িতে করে রূপপুরে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিশেষায়িত নিরাপত্তা ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত নিরাপত্তায় প্রায় ২১৬ কিলোমিটার সড়কপথে চালানটি পরিবহন করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা জানান, এমন পরিবহনের সময় নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং পথে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে পারমাণবিক বিজ্ঞানীরা সড়কপথে পরিবহনের সম্ভাব্য দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহনের সময়সূচি ও রুট আগাম প্রকাশের কারণে নাশকতার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক জ্বালানি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পরিবহন করা হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের পরিবহন নিয়ে আগাম প্রচার ও সরাসরি সম্প্রচার নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি ভবিষ্যতে জ্বালানি পরিবহনের জন্য বিমানপথকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, ঈশ্বরদী বিমানবন্দর উন্নত করা গেলে রূপপুরের কাছাকাছি সরাসরি বিমান থেকে জ্বালানি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সরকারের একজন পারমাণবিক বিজ্ঞানী, যিনি ঢাকার সঙ্গে রূপপুরের ওই পরিবহনে ছিলেন, জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রতিবছর জ্বালানি আনতে হবে। কয়েক বছর পর ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি পরিবহনের জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।

রূপপুর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে অব্যবহৃত ঈশ্বরদী বিমানবন্দর রয়েছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিমানবন্দরটি উন্নত করা যেতে পারে। তবে বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য রানওয়ে ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, দেশের কোনো অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়। বিমানবন্দরটি পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য পুনরায় চালু করা হবে কি না, সেটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়।

এ বিষয়ে বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়

রূপপুর প্রকল্পের মূল মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। পরে দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের মূল চুক্তিমূল্য বাড়ানোর সুযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় টাকার হিসাবে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বর্তমানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

রূপপুরের প্রথম ইউনিট এখন তাই শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরীক্ষামূলক চালুর অপেক্ষায় নেই; একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের পারমাণবিক নিরাপত্তা, জ্বালানি পরিবহন, নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা, গ্রিড ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের একটি বড় পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডিসেম্বরের সম্ভাব্য গ্রিড সংযোগ সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এর আগে ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি, ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ, পাওয়ার স্টার্ট-আপ এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন সফলভাবে সম্পন্ন করাই মূল শর্ত।

//ডিবিটেক/ডিএফআর/এসভিপি/এমএসআই//