স্পেকট্রাম মূল্যে ‘সুইট পয়েন্ট’ চান বিটিআরসি চেয়ারম্যান
- গবেষণাভিত্তিক স্পেকট্রাম মূল্য নির্ধারণের তাগিদ
- গ্রাহক, ব্যবসা ও অর্থনীতির ভারসাম্য চান
- ২০৩৫ সালে প্রয়োজন ১,৫০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ
টেলিযোগাযোগ খাতে স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণে এককালীন রাজস্ব আয়ের বদলে গ্রাহকসেবা, অপারেটরদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ‘সুইট পয়েন্ট’ খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারী। তিনি বলেছেন, টেলিকম নীতি ও স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত নয়, গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হবে।
১৫ অক্টোবর, শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এমদাদ উল বারী বলেন, আগামী নভেম্বরের বড় পরিসরের স্পেকট্রাম নবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে না নিয়ে সংবেদনশীল ও জাতীয় পর্যায়ে অংশীদারিত্বমূলক প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করা উচিত।
বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক কাঠামোর বৈষম্য ও স্পেকট্রাম ঘাটতির কথা তুলে ধরে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্বমান অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখ গ্রাহকের জন্য ২ থেকে ৬ মেগাহার্টজ তরঙ্গ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে এ হার মাত্র ২ দশমিক ২৯ মেগাহার্টজ। দেশে ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ব্যবহারের হার ৩৬ শতাংশ হওয়ায় মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
তিনি জানান, ২০৩৫ সাল পর্যন্ত দেশে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ৪৬০ থেকে ৪৬২ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আগামী বছর আরও ৪০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নিলামের পরিকল্পনা রয়েছে।
২০১৮ সালের উচ্চমূল্যের স্পেকট্রাম দর পরবর্তী সময়ে স্থায়ী বেঞ্চমার্কে পরিণত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় দাম কমানোর উদ্যোগ নিলে অডিট আপত্তি এবং সরকারের রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগের মুখে পড়তে হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি রবির ইজিএসএম বা ৮৫০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড তিন বছরের জন্য বরাদ্দে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ মূল্যছাড় দেওয়ার বিটিআরসির যৌক্তিক প্রস্তাবও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইনি জটিলতায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, স্পেকট্রাম অব্যবহৃত পড়ে থাকলে সরকারের যে আরও বড় রাজস্ব ক্ষতি হয়, সেই বিষয়টি যথেষ্টভাবে বিবেচনায় আসছে না।
গ্রাহক, ব্যবসা ও সরকারের স্বার্থের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এমদাদ উল বারী বলেন, বিশ্বমানের তুলনায় বাংলাদেশে ডেটার দাম প্রায় এক-দশমাংশ হলেও আঞ্চলিক ক্রয়ক্ষমতার বিবেচনায় এটি এখনো গ্রাহকের জন্য চাপ তৈরি করে। গ্রাহকের মূল চাহিদা নিরবচ্ছিন্ন সেবা ও কলড্রপমুক্ত নেটওয়ার্ক।
অন্যদিকে অপারেটরদের গড় আয়প্রতি গ্রাহক বা এআরপিইউ কম এবং স্পেকট্রাম ব্যয় বেশি—এই যুক্তিতে তরঙ্গের দাম কমিয়ে দিলেই সেবার মান নিশ্চিত হবে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে সিম ট্যাক্স কমানোর সুবিধা কতটা গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, টেলিকম নীতিমালা প্রণয়ন ও স্পেকট্রামের মূল্যের প্রভাব নির্ধারণে গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে বিটিআরসি ইতোমধ্যে একটি নিরপেক্ষ গবেষণা দল গঠন করেছে।
তিনি আরও জানান, প্রত্যন্ত ও অনগ্রসর অঞ্চলে স্পেকট্রামের কার্যকর ব্যবহার বাড়াতে অপারেটরদের জন্য নতুন ধরনের ইনসেন্টিভ বা আর্থিক ছাড়ের নীতিও যুক্ত করা হচ্ছে।
নীতিনির্ধারক, অপারেটর ও গণমাধ্যমকে ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে এমদাদ উল বারী বলেন, শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষকে উন্নত সেবা দেওয়া এবং দেশের সার্বিক ডিজিটালাইজেশন ত্বরান্বিত করা। এ ধরনের গবেষণা অব্যাহত রেখে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলেও তিনি জানান।
স্বাগত বক্তব্যে টিআরএনবি সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন বলেন, সব অপারেটরের মধ্যে স্পেকট্রামের ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন এবং ইজিএসএমের মতো বাস্তব সমস্যাগুলো তুলে ধরে সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়ার লক্ষ্যেই এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।
টিআরএনবি সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি অ্যান্ড টেলিকম উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন এমটব সভাপতি ও রবির সিইও জিয়াদ সাতারা, গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান, বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জোহান বুসে, টেলিকম বিশেষজ্ঞ টিআইএম নুরুল কবির, গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ, বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অফিসার তাইমুর রহমান, রবির কোম্পানি সচিব সাহেদ আলম, এমটব মহাসচিব মোঃ জুলফিকার এবং ফিকির নির্বাহী পরিচালক নুরুল কবিরসহ সংশ্লিষ্টরা।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এমআইএস//





