বিজ্ঞান এগিয়ে, ভোকেশনালে বড় ধাক্কা

পাঁচ বছরে কারিগরি পাসের হার কমেছে ৩১ শতাংশ

  • ২০২২-২৫ সময়ে ভোকেশনালের হার ৮৯.৫৫ থেকে ৭৩.৬৩%-এ নামে
  • ২০২৬-এ আরও কমে ৫৮.২০%, প্রযুক্তি দক্ষতায় নতুন উদ্বেগ

পাঁচ বছরে কারিগরি পাসের হার কমেছে ৩১ শতাংশ
১০ আগষ্ট, ২০২৬ ১১:১৩  

ঢাকা, ১০ আগস্ট: মাধ্যমিকের ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগ এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী ধারাগুলোর একটি। কিন্তু প্রযুক্তি ও কর্মমুখী দক্ষতা তৈরির অন্যতম প্রধান পথ কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষায় চলতি বছরের ফলাফল বড় ধাক্কা দিয়েছে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফলে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ হলেও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি ও দাখিল ভোকেশনালে তা নেমে এসেছে ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশে।

ফল বিশ্লেষণে আরও বড় একটি প্রবণতা সামনে আসে। গত পাঁচ বছরের প্রকাশিত ফলাফলে কারিগরি শিক্ষায় পাসের হার ধারাবাহিকভাবে উচ্চ অবস্থানে থাকলেও ২০২৬ সালে তা হঠাৎ বড় ব্যবধানে কমেছে। ২০২২ সালে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা ৮৬ দশমিক ৩৫ শতাংশে এবং ২০২৪ সালে ৮১ দশমিক ৩৮ শতাংশে নামে। ২০২৫ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এবার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশে নেমে এসেছে।

অর্থাৎ ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে কারিগরি শিক্ষায় পাসের হার কমেছে প্রায় ৩১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের তুলনায় এক বছরেই কমেছে ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ পয়েন্ট।

বিজ্ঞানেও কমেছে পাসের হার

বিজ্ঞান বিভাগের চিত্রও পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২২ সালে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগের পাসের হার ছিল ৯৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা ছিল প্রায় ৯৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৮৫ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমে আসে। চলতি বছর আরও কমে হয়েছে ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

অর্থাৎ ২০২২ থেকে ২০২৬—এই চার বছরের ব্যবধানে বিজ্ঞান বিভাগেও পাসের হার প্রায় ১৪ দশমিক ২৪ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।

তবে বিজ্ঞান এখনো কারিগরি শিক্ষার তুলনায় অনেক এগিয়ে। চলতি বছর বিজ্ঞান বিভাগে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫৮ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪ লাখ ৫৭ হাজার ১৮৮ জন পাস করেছে। পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

বিজ্ঞান বিভাগে সবচেয়ে ভালো ফল করেছে যশোর শিক্ষা বোর্ড। সেখানে পাসের হার ৮৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। ঢাকা বোর্ডে এই হার ৮৫ দশমিক ৯০ শতাংশ।

কারিগরিতে পতন সবচেয়ে তীব্র

কারিগরি শিক্ষার সাম্প্রতিক ফলাফলের ধারাটি দেখলে পরিবর্তনটি আরও স্পষ্ট হয়।

বছর কারিগরি শিক্ষায় পাসের হার
২০২২ ৮৯.৫৫%
২০২৩ ৮৬.৩৫%
২০২৪ ৮১.৩৮%
২০২৫ ৭৩.৬৩%
২০২৬ ৫৮.২০%

তথ্যগুলো দেখাচ্ছে, ২০২২ সালের পর থেকেই কারিগরি শিক্ষায় পাসের হার কমছিল। তবে ২০২৬ সালে পতনের গতি হঠাৎ বেড়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৫—তিন বছরে হার কমেছিল প্রায় ১৫ দশমিক ৯২ শতাংশ পয়েন্ট। আর শুধু ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালেই কমেছে ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ পয়েন্ট।

এবার কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৯৫১ জন। এর বিপরীতে ২০২৫ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৪ হাজার ৯৪৮ জন। অর্থাৎ জিপিএ-৫-এর সংখ্যাও কমেছে।

প্রযুক্তি দক্ষতার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

কারিগরি শিক্ষা সাধারণ শিক্ষার বিকল্প কোনো দুর্বল ধারা নয়। বরং শিল্প, উৎপাদন, নির্মাণ, বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমেশনসহ নানা খাতে সরাসরি কর্মদক্ষতা তৈরির ভিত্তি এই শিক্ষা।

তাই ভোকেশনাল পরীক্ষার ফলাফলে বড় পতন শুধু পরীক্ষার ফলের হিসাব নয়। এটি মাধ্যমিক পর্যায়ে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার মান, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, শিক্ষক সক্ষমতা, ল্যাব ও ওয়ার্কশপ সুবিধা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

বিশেষ করে প্রযুক্তি-নির্ভর অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের চাহিদা যখন দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন কারিগরি শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় পাস করানো নয়—তাদের বাস্তব কাজের উপযোগী করে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞান থেকে প্রযুক্তি দক্ষতায় সেতু কোথায়

চলতি বছরের ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগে ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষায় ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ পাসের হার—দুই ধারার মধ্যে ব্যবধান ২২ দশমিক ৪৪ শতাংশ পয়েন্ট।

এই ব্যবধানকে শুধু ‘বিজ্ঞান ভালো, কারিগরি খারাপ’ হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গাটি ধরা পড়বে না। বিজ্ঞান শিক্ষা মূলত তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষণী ভিত্তি তৈরি করে। কারিগরি শিক্ষা সেই জ্ঞানকে ব্যবহারিক দক্ষতায় রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য প্রয়োজন এই দুই ধারার মধ্যে কার্যকর সংযোগ। বিদ্যালয় পর্যায়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষার সঙ্গে কারিগরি প্রশিক্ষণের সমন্বয় করা গেলে শিক্ষার্থীরা একই সঙ্গে তাত্ত্বিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেতে পারে।

ফলাফল থেকে নীতির প্রশ্ন

চলতি বছরের ফলাফলে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগের পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ হলেও মানবিক বিভাগের হার ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষায় পাস করেছে ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ তিন সাধারণ ধারার মধ্যেও বিজ্ঞান এগিয়ে রয়েছে।

কিন্তু প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতির জন্য শুধু বিজ্ঞান বিভাগের ভালো ফল যথেষ্ট নয়। বিজ্ঞান শিক্ষায় ভালো করা শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে উচ্চশিক্ষায় প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান বা অন্যান্য প্রযুক্তি বিষয়ে যেতে হয়। একই সঙ্গে মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ জনবল তৈরির পথ শক্তিশালী করতে হয়।

সেই জায়গায় কারিগরি শিক্ষার পাসের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশে নেমে আসা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২০২২ সালের ৮৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশে নেমে আসা তাই কেবল একটি পরীক্ষার ফল নয়; এটি দক্ষতা উন্নয়নভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার সামনে থাকা বড় প্রশ্নেরও ইঙ্গিত।

এখন প্রয়োজন শুধু কতজন পাস করল, সেই হিসাব নয়। কতজন শিক্ষার্থী প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, কতজন হাতে-কলমে কাজ জানে, কতজন শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ এবং শিক্ষা শেষে কতজন কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছে—এসব সূচকেও কারিগরি শিক্ষার সাফল্য মাপা।

//ডিবিটেক/আইএইইচ/এমআইএস//