শিক্ষাব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশনের সব জায়গায় ফাঁকি!
প্রতিটি বিদ্যালয়ে ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ ও একক ডিজিটাল পোর্টালের মাধ্যমে সব দাপ্তরিক কাজ সমন্বয়ের তাগিদ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর নন-প্রফেশনাল কাজের অতিরিক্ত চাপ শিক্ষার মান, শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার্থীদের শিখনফল—সবকিছুকেই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। এ প্রেক্ষিতে ক্লাস চলাকালীন কোনো ধরনের তথ্য সংগ্রহ বা প্রশাসনিক কাজ শিক্ষকদের ওপর প্রতিটি বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী বা ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ ও একক ডিজিটাল পোর্টালের মাধ্যমে সব দাপ্তরিক কাজ সমন্বয় এবং শিক্ষার গুণগত মান ও ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ দিতে দীর্ঘমেয়াদে একটি ‘Teaching Hour Protection Policy’ প্রণয়ণের সুপারিশ করা হয়েছে।
জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশা-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার শিক্ষণ ও শিখনগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার প্রতিবেদনে এই সুপারিশ করা হয়।
৩ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের হলরুমে এই গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অটোনোমাস বডি হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ডা. বিধান রঞ্জন রায়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ফরিদ আহমদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. বিধান রঞ্জন রায় বলেন, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ও শিক্ষাব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশনের সব জায়গায় ফাঁকির কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন,“আমাদের আরেকটি সমস্যা ম্যানেজমেন্টে। আমরা বড় বড় কথা বলি, ডিজিটালাইজেশনের কথা বলি, কিন্তু সব জায়গায় ফাঁকি। কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, কিন্তু সব জায়গায় ফাঁকি বিদ্যমান। ডিপিইতে বিশাল একটি সিস্টেম আছে, কিন্তু বাস্তবে সেখানে আপডেটেড কোনো ডাটা পাওয়া যায় না। আমরা আধুনিক প্রযুক্তিটাও ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারছি না। আমাদের প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার হলে মানুষের জীবন সহজ ও স্মার্ট করা সম্ভব। কিন্তু প্রয়োগে আমাদের সমস্যা। কাজেই শিক্ষকদের যে সময় নষ্ট হয়, সেটি কমিয়ে কীভাবে প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানো যায়, সে চিন্তা আমাদের আছে।”
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে প্রত্যেকটি স্কুলকে একটি অটোনোমাস বডির মতো গড়ে তুলতে হবে। কারণ আমরা দেখেছি, এতগুলো সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও আমাদের অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় খুব ভালোভাবে শিক্ষাদান করছে। আমি নিজেই বিভিন্ন জায়গায় পরিদর্শনে যাওয়ার আগে এটা বিশ্বাস করতাম না যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এত ভালো শিক্ষা দেওয়া হয়। আমাদের শিক্ষকরা অর্থমূল্যে খুব বেশি কিছু পান না, হয়তোবা তাঁদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ে। কারণ যেসব স্কুলে ভালো শিক্ষা দেওয়া হয়, সেসব স্কুলের কমিউনিটির মানুষ শিক্ষকদের সম্মান করেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, স্কুলে আমি দেখেছি, একজন যোগ্য প্রধান শিক্ষক টিমওয়ার্কের মাধ্যমে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে কাজ করেন। তাই স্কুলগুলো অটোনোমাস বডির মতো কাজ করলে শিক্ষার মান আরও ভালো হবে। সরকার স্কুলে বাজেট দেবে, ইনপুট দেবে এবং একটি তৃতীয় পক্ষ—যেটি আমরা ডিজাইন করেছি এবং বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি—আরেকটি পরিবীক্ষণ ইউনিট হিসেবে একাডেমিক অ্যাসেসমেন্ট করবে। তারা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও অর্জন কেমন হচ্ছে, সে বিষয়ে গবেষণা করবে এবং মমন্ত্রণালয়কে সুপারিশ দেবে। আমরা দেখতে চাই, আমাদের পঞ্চম শ্রেণি পাস করা শিশুরা কী কী যোগ্যতা অর্জন করেছে। এ ছাড়া আমাদের পরিকল্পনায় আছে, মন্ত্রণালয় নয় বরং জেলা পর্যায়ে নিয়োগ, বদলি সহ সবকিছু করা। এতে শিক্ষকদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।
ডা. বিধান রঞ্জন রায় বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে জনবল। সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে এবং দক্ষ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ মানবসম্পদ তৈরি না হলে রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়নে কন্ট্যাক্ট আওয়ার বৃদ্ধি, একাধিক শিফটের পরিবর্তে এক শিফটে বিদ্যালয় পরিচালনা, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি—এসব বিষয়ে সরকার কাজ করছে।
তিনি বলেন, এই গবেষণার তথ্য হয়তো নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলবে, তবে এর উদ্দেশ্য আরও বৃহৎ—এনজিও, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা, যাতে সরকারের ওপর একটি ইতিবাচক চাপ তৈরি হয় এবং শিক্ষকদের শিক্ষার বাইরে নানান কাজে ব্যবহার না করা হয়।
ডা. বিধান রঞ্জন রায় বলেন, “শিক্ষা খাতে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো একটি বড় বাস্তবতা। এটি এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়; জাতীয় পর্যায়ে সম্মিলিতভাবে সমাধান করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ফরিদ আহমদ।
গবেষণায় মোট ৩৭ প্রকারের নন-প্রফেশনাল কাজ শনাক্ত করা হয়েছে, যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের করতে হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জরিপে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয়, তবে বিদ্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও হোম ভিজিটে সর্বনিম্ন সময় ব্যয় হয়। নন-প্রফেশনাল কাজে মাসিক গড়ে শিক্ষকপ্রতি প্রায় ২৪ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা ব্যয় হচ্ছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নন-প্রফেশনাল কাজে শিক্ষকরা বেশি সময় ব্যয় করলে সার্বিকভাবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার কমে যায়। অতিরিক্ত দাপ্তরিক কাজ শেষে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করার পর ৯০ শতাংশ শিক্ষক পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। ৮৭ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, এর ফলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে বুঝতে পারে না এবং পরীক্ষার ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পিছিয়ে পড়া বা সুবিধাবঞ্চিত। এসব শিক্ষার্থীর জন্য ‘রেমিডিয়াল’ বা বিশেষ ক্লাস অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও ৮৫ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন, নন-প্রফেশনাল কাজের চাপের কারণে তারা এসব বিশেষ ক্লাস নিতে পারছেন না।
অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখা গেছে, বছরে প্রায় ১৯.৬৬ বিলিয়ন টাকা সমমূল্যের শিক্ষক শ্রম প্রশাসনিক কাজে ব্যয়িত হচ্ছে। একজন সহকারী শিক্ষক গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪,১১৬.১১ টাকার সমপরিমাণ সময় অ-পেশাদার কাজে ব্যয় করেন, যা বার্ষিক হিসেবে জনপ্রতি ৪৯,৩৯৪.৫৫ টাকা। সারা দেশে ৩,৪৬,৩৪১ জন সহকারী শিক্ষকের নন-প্রফেশনাল কাজের পেছনে বছরে মোট ১৭,১০,৭৩,৬০,৭৫১ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এটি সরাসরি শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ হলেও এর সুফল শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না।
গবেষণার উপাত্ত অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকরা সহকারী শিক্ষকদের তুলনায় বেশি সময় (গড়ে ২৭.৭৪ ঘণ্টা) নন-প্রফেশনাল কাজে ব্যয় করেন। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারী যেসব শিক্ষকের ক্ষেত্রে কর্মক্লান্তি বা বার্নআউট নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে (২১৯ জন), তাদের মধ্যে ৯২.৬৯ শতাংশ ‘লেট-স্টেজ বার্নআউট’-এ ভুগছেন।
ডিবিটেক/এমএসএইচ/এমইউএম



