পেপাল কিনতে স্ট্রাইপ ও অ্যাডভেন্টের ৫৩ বিলিয়ন ডলারের যৌথ প্রস্তাব

পেপাল কিনতে স্ট্রাইপ ও অ্যাডভেন্টের ৫৩ বিলিয়ন ডলারের যৌথ প্রস্তাব
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৫৩  

বৈশ্বিক পেমেন্ট ও ফিনটেক খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় এক অধিগ্রহণের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। মার্কিন পেমেন্ট জায়ান্ট ‘স্ট্রাইপ’ এবং বিশ্বখ্যাত প্রাইভেট ইকুইটি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডভেন্ট ইন্টারন্যাশনাল’ যৌথভাবে ‘পেপাল হোল্ডিংস ইনক’ কিনে নেওয়ার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই চুক্তির আওতায় প্রতি শেয়ারের দাম ৬০.৫০ ডলার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা পেপালের মোট বাজার মূল্যকে ৫৩ বিলিয়ন ডলারের ওপরে নিয়ে যাবে। এই বিষয়ের সাথে জড়িত দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানা গেছে।

চলতি মাসের শুরুতে জমা দেওয়া এই প্রস্তাবের বিপরীতে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। প্রস্তাবিত এই মূল্য গত মঙ্গলবার লেনদেন বন্ধ হওয়ার সময় পেপালের শেয়ারের যে দাম ছিল, তার চেয়ে প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি।

অবশ্য এই আলোচনাটি অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ায় সূত্রগুলো নাম প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। এছাড়া পেপাল, স্ট্রাইপ এবং অ্যাডভেন্ট- কোনো পক্ষই এই বিষয়ে অফিশিয়ালি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, এর আগে এপ্রিলের শুরুর দিকেও পেপালের সাথে একটি প্রাথমিক যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে পেপালের কাছ থেকে এখনো কোনো সাড়া না পাওয়ায় স্ট্রাইপ ও অ্যাডভেন্ট আগামী সপ্তাহগুলোতে এই আলোচনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, পেপালকে ভেঙে আলাদা না করে স্ট্রাইপ এবং অ্যাডভেন্ট যৌথভাবে প্রতিষ্ঠানটির সমান অংশীদারিত্ব (৫০% করে শেয়ার) নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে। তবে এই প্রস্তাবের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবেই কোনো চুক্তি সম্পন্ন হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

তীব্র প্রতিযোগিতা ও পেপালের মন্দা ভাব
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে যাত্রা শুরু করা পেপাল ডিজিটাল পেমেন্ট বা অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রে অন্যতম পথপ্রদর্শক ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যাপল পে এবং গুগল পের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের উত্থানের ফলে পেপাল তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে এবং তাদের মার্কেট শেয়ার হারাতে হয়েছে।

করোনা মহামারির সময়ে পেপালের যে অভাবনীয় ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, গত কয়েক বছরে ধীরগতির প্রবৃদ্ধি এবং তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে তার সিংহভাগই হারিয়ে গেছে। ২০২১ সালে পেপালের সর্বোচ্চ বাজার মূলধন যেখানে প্রায় ৩৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল, চলতি বছরে তা কমে মাত্র ৩৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। গত ১২ মাসেই কোম্পানিটি তাদের বাজার মূল্যের ৪০ শতাংশের বেশি হারিয়েছে।

চলতি বছরের মার্চ মাসে পেপালের সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এনরিকে লোরেস প্রতিষ্ঠানটির জটিলতা দূর করতে এবং প্রবৃদ্ধির ওপর ফোকাস করতে বড় ধরণের সংস্কার কাজ শুরু করেন। এরই অংশ হিসেবে এপ্রিল মাসে পেপালের কার্যক্রমকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়—চেকআউট, কনজিউমার ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস 'ভেনমো' এবং পেমেন্ট ও ক্রিপ্টো। সেই সাথে শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় আনা হয় বেশ কিছু পরিবর্তন।

বিশ্বজুড়ে পেমেন্ট খাতের মার্জার ও অ্যাকুইজিশন
পেপালের এই সম্ভাব্য অধিগ্রহণের বিষয়টি মূলত বিশ্বব্যাপী পেমেন্ট খাতে সাম্প্রতিক মার্জার ও অধিগ্রহণের জোরালো প্রবণতাকেই নির্দেশ করছে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির প্রসারের কারণে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ছোট ও মাঝারি লক্ষ্যগুলোকে অধিগ্রহণ করছে। প্রথাগত পেমেন্ট প্রসেসিংয়ের প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে আসায় কোম্পানিগুলো এখন ক্রস-বর্ডার (আন্তঃসীমান্ত) এবং বিজনেস-টু-বিজনেস (বিটুবি) পেমেন্টের মতো দ্রুত বর্ধনশীল খাতে পা রাখতে বড় বড় অধিগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে চাইছে।

পেপালের আর্থিক অবস্থা ও এআই পরিকল্পনা
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে পেপালের রাজস্ব ৭% বৃদ্ধি পেয়ে ৮.৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্লেষকদের ৮.০৫ বিলিয়ন ডলারের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া কারেন্সি-নিউটরাল ভিত্তিতে সামগ্রিক পেমেন্ট ভলিউম ৮% বৃদ্ধি পেয়ে ৪৬৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

গত মে মাসে সিইও লোরেস জানিয়েছিলেন যে, তারা কোম্পানির বিভিন্ন স্তরের দ্বৈত কর্মীবাহিনী দূর করতে এবং পরিচালনা কার্যক্রমকে আরও সহজ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আগামী দুই থেকে তিন বছরে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে, যা পরবর্তীতে নতুন প্রবৃদ্ধি অর্জনের কাজে পুনরায় বিনিয়োগ করা হবে।

অন্যদিকে, সান ফ্রান্সিসকো এবং ডাবলিন-ভিত্তিক জনপ্রিয় পেমেন্ট স্টার্টআপ ‘স্ট্রাইপ’ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান প্রাইভেট কোম্পানি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে নিজস্ব কর্মচারী ও শেয়ারহোল্ডারদের জন্য আনা একটি টেন্ডার অফারে স্ট্রাইপের বাজার মূল্য ধরা হয়েছিল ১৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি। প্রতিষ্ঠানটি মূলত বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন কোম্পানির পেমেন্ট গ্রহণ, পেআউট এবং আর্থিক প্রক্রিয়াগুলোকে স্বয়ংক্রিয় করতে সহায়তা দেয়।

ডিবিটেক/বিএমটি    ।    সূত্র: রয়টার্স