চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আইসিসি টেলিসার্ভিসেসের অংশীদারিত্ব

বাংলাদেশে আসছে উন্নত বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি

বাংলাদেশে আসছে উন্নত বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি
১১ জুলাই, ২০২৬ ১৮:৫১  

বাংলাদেশে পরবর্তী প্রজন্মের বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ও ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে আইসিসি টেলিসার্ভিসেস লিমিটেড। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি চীনের একটি শীর্ষস্থানীয় বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি প্রস্তুতকারকের সঙ্গে প্রযুক্তি সহযোগিতা ও ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের সমঝোতায় পৌঁছেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি ব্যবস্থাপনা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ (অ্যাক্সেস কন্ট্রোল), কর্মঘণ্টা নিরূপণ এবং ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তার লাভ করবে।

সূত্রমতে, প্রাথমিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় চীনের ক্যান্টন ফেয়ার চলাকালে। সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল উন্নত বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি দেশে আনার আগ্রহ প্রকাশ করলে পরবর্তীতে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের কারখানা, গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) কেন্দ্র এবং শোরুম পরিদর্শন করে।

প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন আইসিসি টেলিসার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম সিদ্দিক। সফরকালে তিনি চীনা প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারে পরবর্তী প্রজন্মের বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি চালুর সম্ভাবনা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

আধুনিক বায়োমেট্রিক সমাধান প্রদর্শন

পরিদর্শনের সময় প্রতিনিধি দলের সামনে উপস্থিতি ব্যবস্থাপনা, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল, কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত ডিজিটাল নিরাপত্তা সমাধানের বিভিন্ন প্রযুক্তি উপস্থাপন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলীরা এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা, ব্যবহারের পদ্ধতি এবং বিভিন্ন শিল্পখাতে সম্ভাব্য প্রয়োগ তুলে ধরেন।

কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, সরকারি সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় প্রচলিত উপস্থিতি রেজিস্টার ও কার্ডভিত্তিক ব্যবস্থার পরিবর্তে বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে সমন্বিত নিরাপত্তা ও স্মার্ট কর্মী ব্যবস্থাপনা সমাধানের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তাদের মতে, কম ব্যয় ও নির্ভরযোগ্যতার কারণে ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি এখনও জনপ্রিয় থাকলেও অধিক নিরাপত্তা, দ্রুত পরিচয় শনাক্তকরণ এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনার সুবিধার কারণে ফেসিয়াল রিকগনিশন ও মাল্টিমোডাল বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

নিজস্ব অ্যালগরিদম ও ওপেন প্ল্যাটফর্ম

প্রযুক্তিগত উপস্থাপনায় কোম্পানিটি জানায়, বায়োমেট্রিক গবেষণা ও উৎপাদনে তাদের দুই দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব বায়োমেট্রিক রিকগনিশন অ্যালগরিদম, ওপেন সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কিট (SDK), অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (API), ওরিজিনাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং (OEM) এবং ওরিজিনাল ডিজাইন ম্যানুফ্যাকচারিং (ODM) সুবিধা প্রদান করে।

বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল দেশের দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল অবকাঠামো, বাংলা ও ইংরেজি ভাষা সমর্থিত সফটওয়্যারের প্রয়োজনীয়তা এবং বিদ্যমান সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রযুক্তির সামঞ্জস্যের বিষয়টি তুলে ধরেন। আলোচনায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী সফটওয়্যার স্থানীয়করণ, কাস্টমাইজেশন এবং সমন্বিত সমাধান উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

পাম ভেইন প্রযুক্তিতে বিশেষ আগ্রহ

সফরকালে প্রতিনিধি দল মাল্টিমোডাল বায়োমেট্রিক টার্মিনালের ব্যবহারিক পরীক্ষা চালায়। ফেসিয়াল রিকগনিশন ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি সমন্বিত এসব ডিভাইস দ্রুত সাড়া, উচ্চ নির্ভুলতা এবং বহুমুখী ব্যবহারের সক্ষমতা প্রদর্শন করে।

বিশেষভাবে প্রতিনিধি দলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল পাম ভেইন রিকগনিশন প্রযুক্তি। নিকট-ইনফ্রারেড প্রযুক্তির মাধ্যমে হাতের শিরার নকশা শনাক্ত করে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়, যা জাল করা প্রায় অসম্ভব। এছাড়া ভেজা, ময়লাযুক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত আঙুলের ক্ষেত্রেও এ প্রযুক্তি কার্যকর থাকে। বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার জন্য প্রযুক্তিটি বিশেষভাবে উপযোগী বলে জানায় উৎপাদক প্রতিষ্ঠান।

এছাড়া উন্নত লাইভনেস ডিটেকশন-সমৃদ্ধ ফেসিয়াল রিকগনিশন টার্মিনালও প্রদর্শন করা হয়, যা ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে পরিচয় জালিয়াতির চেষ্টা শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে সক্ষম। বায়োমেট্রিক টার্মিনালের সঙ্গে সমন্বিত অ্যাক্সেস কন্ট্রোল গেটের মাধ্যমে অনুমোদিত প্রবেশের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপস্থিতিও রেকর্ড করা যায়।

বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল দেশের আবহাওয়া, বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক বিভ্রাটের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে ডিভাইসগুলোর ধুলা ও পানিরোধী সক্ষমতা, অফলাইন মোডে কাজ করার সুবিধা এবং বিভিন্ন তাপমাত্রায় কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করেন।

স্মার্ট কর্মী ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার

প্রতিষ্ঠানটি তাদের সমন্বিত কর্মী ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারও প্রদর্শন করে, যেখানে উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, শিফট ব্যবস্থাপনা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন একই ড্যাশবোর্ড থেকে পরিচালনা করা যায়। সফটওয়্যারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেরিতে উপস্থিতি, আগাম প্রস্থান, অনুপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে এবং একাধিক শিফট, বিভাগ ও ব্ল্যাকলিস্ট ব্যবস্থাপনাও সমর্থন করে।

প্রযুক্তি স্থানান্তর ও স্থানীয় সহায়তার সমঝোতা

সফর শেষে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল স্থানীয় পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রদর্শনের জন্য প্রাথমিকভাবে কয়েকটি বায়োমেট্রিক পণ্যের অর্ডার দেয়। একই সঙ্গে আইসিসি টেলিসার্ভিসেস লিমিটেড ও চীনা উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রযুক্তি স্থানান্তর, পণ্য কাস্টমাইজেশন, স্থানীয় কারিগরি সহায়তা এবং ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে সহযোগিতার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

আইসিসি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম সিদ্দিক বলেন, এই অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে আরও গতিশীল করবে।

তিনি বলেন, "এই সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নত বায়োমেট্রিক পরিচয় ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি বাংলাদেশে আসবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, শিক্ষা এবং বিভিন্ন নাগরিকসেবায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"

তিনি আরও বলেন, চীনা প্রতিষ্ঠানের বায়োমেট্রিক সমাধানের গতি, নির্ভুলতা ও নমনীয়তা বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল অবকাঠামোর সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ।

চীনা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বাজার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দেশে আধুনিক বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা, ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থাপনা এবং স্মার্ট কর্মী ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির ব্যবহার আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হবে। তাদের মতে, এ সফর দুই প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক আস্থা আরও সুদৃঢ় করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করেছে।

//ডিবিটেক/এসএইচ/এমআই//