বৈশ্বিক এআই শাসনব্যবস্থার জরুরি আহ্বান জাতিসংঘ মহাসচিবের

এআই থেকে ঘাতক রোবট শঙ্কা

  • বেসামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি এআই চিপ এখন যুদ্ধক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে, ঘাতক রোবট প্রায় স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে
  • জেনেভায় জাতিসংঘের প্রথম গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্সে সুদূরপ্রসারী বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানান গুতেরেস
  • প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ৯৯

এআই থেকে ঘাতক রোবট শঙ্কা
৭ জুলাই, ২০২৬ ১৩:০১  
৮ জুলাই, ২০২৬ ১৩:১৩  

বেসামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি ক্রমশ শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চিপ এখন যুদ্ধক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে ‘ঘাতক রোবট’ ইতোমধ্যেই প্রায় স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ৬ জুলাই সোমবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর সুদূরপ্রসারী ও বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। জেনেভায় জাতিসংঘের প্রথম গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্সে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, মানুষ ও যন্ত্র কোন শর্তে সহাবস্থান করবে তা নির্ধারণের সুযোগ এই প্রজন্মেরই হয়তো শেষ সুযোগ। এআই শক্তিশালী হতে চাইলে তাকে শাসনব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে, আস্থা অর্জন করতে চাইলে নির্মাতাদের জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, বৈশ্বিক হতে চাইলে ন্যায্য হতে হবে—এমন আহ্বান জানান তিনি।

গুতেরেস বিপ্লবী এই প্রযুক্তির সুযোগ থেকে এখনো বঞ্চিত বিশ্বের শতকোটি মানুষের জন্য এআইকে আরও সহজলভ্য করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের যেকোনো বৈশ্বিক চুক্তি এমন হতে হবে যা বিশ্বের আস্থা অর্জনের যোগ্য এবং যেখানে সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, বিশেষ করে শিশুদের ডিজিটাল কারসাজি ও নির্যাতন থেকে রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে হবে। একই আহ্বানের প্রতিধ্বনি করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক এআইয়ের অশুভ ব্যবহার মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান এবং প্রকাশিত তথ্যের বরাতে ডিপফেকের নারী ও কিশোরীকেন্দ্রিক প্রবণতার কথা তুলে ধরেন।

এআইয়ের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণের আরেকটি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই প্রযুক্তিতে নিশ্চিত প্রবেশাধিকার, পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে সব এআই ডেটা সেন্টার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পরিচালিত হওয়া উচিত বলে জোর দেন মহাসচিব। তিনি বলেন, এআই আমাদের অভিন্ন ভবিষ্যতের কেন্দ্রে অবস্থান করছে, তবে সেই ভবিষ্যতে যন্ত্র শুধু তথ্য দেবে, সিদ্ধান্ত নেবে ও জবাবদিহি করবে মানুষই। ২০১৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তিনি প্রথম এআই নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছিলেন, জেনেভার সম্মেলনে সেই অবস্থানই আবার তুলে ধরেন তিনি।

এআই নিয়ন্ত্রণের সময়রেখা
২০১৭: এআই নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক এক আহ্বানে মহাসচিব গুতেরেস বিপ্লবী এই প্রযুক্তির ‘অসাধারণ’ সম্ভাবনার প্রশংসা করেন। তবে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে সতর্ক করে বলেন, কর্মসংস্থান, বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং ‘সমাজের মূল কাঠামোর’ ওপর এর প্রভাব নাটকীয় হতে পারে।

২০২৩: জাতিসংঘ মহাসচিবের এআইবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টা সংস্থা স্বশিক্ষণক্ষম এই প্রযুক্তির জন্য বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়।

২০২৪: প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার এবং গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট এআই শাসনব্যবস্থার একটি বৈশ্বিক মডেল তৈরির ম্যান্ডেট দেয়।
জুন ২০২৬: জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেল অন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সতর্ক করে বলে, এআই ‘নিজে থেকে অথবা ক্ষতিকর ব্যবহারকারীদের কারণে বিপর্যয়কর ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে’। একই সঙ্গে প্রযুক্তিটি ‘বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া এবং সরকারের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা উভয়কেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে’।

৬–৭ জুলাই ২০২৬: জেনেভায় প্রথম জাতিসংঘ গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স এবং এআই ফর গুড সামিট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গুতেরেস বলেন, এ আয়োজনগুলোকে এখন বিশ্বকে সামনে এগোনোর ‘দিকনির্দেশনা দিতে হবে’।
‘মহান সমতা সৃষ্টিকারী’

মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এআই মূলধারায় প্রবেশ করে অর্থনীতি ও সমাজে বিপ্লবী প্রভাব ফেলেছে, যার প্রভাব যেমন ইতিবাচক তেমনি নেতিবাচকও। এই বাস্তবতার আগেই জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এআই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ ও শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে, যার ধারাবাহিকতায় সোমবার জেনেভায় প্রথম গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে কোম্পানি, গবেষক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন, যেখানে রূপান্তরমূলক এই প্রযুক্তির কেন্দ্রে মানবতাকে কীভাবে রাখা যায় তা নিয়ে আলোচনা হয়। দ্বিতীয় গ্লোবাল ডায়ালগ আগামী মে মাসে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এআইবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেলের কো-চেয়ার ইয়োশুয়া বেঙ্গিও বলেন, প্রযুক্তিটির বিকাশের গতি শিগগিরই কমবে এমন কোনো লক্ষণ নেই, এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরীক্ষায় দেখা গেছে ফ্রন্টিয়ার এআই মডেলগুলো মানুষকে প্রতারণা করতে এবং কখন তাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে তা বুঝতে সক্ষম।

সঠিকভাবে ব্যবহার করা এবং সবার মধ্যে বিস্তৃতভাবে ভাগ করে নেওয়া গেলে এআই কয়েক দশকের উন্নয়নকে কয়েক বছরের মধ্যে সংকুচিত করতে পারে এবং একবিংশ শতাব্দীর মহান সমতা সৃষ্টিকারী হয়ে উঠতে পারে বলে প্রতিনিধিদের জানান গুতেরেস। তবে তার আগে প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা ও আইনি দায়িত্ব নির্ধারণ প্রয়োজন। তিনি বলেন, দেশগুলো যখন ব্যবস্থা পরীক্ষা, ঝুঁকি পরিমাপ ও দায় নির্ধারণে একমত হয়, তখন প্রযুক্তির সঙ্গে নিরাপত্তাও ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু একমত না হলে খণ্ডিত ব্যবস্থা ব্যয় বাড়ায় ও বিশ্বকে বিভক্ত করে।

শিশু সুরক্ষা অঙ্গীকারে কী থাকবে?
জাতিসংঘের শিশু সুরক্ষা অঙ্গীকার অনুযায়ী, এআই নির্মাতাদের প্রমাণ করতে হবে:
* প্রযুক্তিটি নিরাপদ: শিশুদের জন্য উন্মুক্ত কোনো এআই ব্যবস্থা শিশু-কেন্দ্রিক নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং স্বাধীন তদারকি ছাড়া কোনো কোম্পানি চালু করতে পারবে না।
* যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা: কোনো কোম্পানি তার এআইকে শিশুদের যৌন ছবি তৈরি করতে দিতে পারবে না। প্রতিটি কোম্পানিকে এ ধরনের উপাদান শনাক্ত, রিপোর্ট এবং সরিয়ে ফেলতে হবে।
* কোনো শিশু মানসিক কষ্ট বা সংকটের লক্ষণ দেখালে, ‘সিস্টেমটিকে থামতে হবে এবং তাকে প্রকৃত মানবিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে’, বলেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

গুতেরেস জানান, ভবিষ্যতের যেকোনো এআই শাসন চুক্তিতে শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং দেশগুলোর প্রতি একটি এআই চাইল্ড সেফটি প্লেজ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। এই অঙ্গীকার অনুযায়ী এআই নির্মাতাদের প্রমাণ করতে হবে যে শিশু-কেন্দ্রিক নিরাপত্তা পরীক্ষা ও স্বাধীন তদারকি ছাড়া কোনো ব্যবস্থা চালু করা হবে না, শিশুদের যৌন নির্যাতনমূলক উপাদান তৈরির ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা থাকবে এবং কোনো শিশু মানসিক কষ্ট বা সংকটের লক্ষণ দেখালে সিস্টেমকে থেমে গিয়ে তাকে প্রকৃত মানবিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। মানবাধিকারের প্রশ্নে কোনো আপস না করার কথাও জোর দিয়ে বলেন মহাসচিব, বিশেষত বিচারব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও পুলিশিংয়ের মতো উচ্চঝুঁকির সিদ্ধান্তে।

এআই খাতে আরও বেশি সরকারি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে গুতেরেস উল্লেখ করেন, এআই অবকাঠামোয় বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ আনুমানিক ৫০০ ট্রিলিয়ন ডলার, অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারি সহায়তা তুলনামূলকভাবে সামান্য। এই বৈষম্য কমাতে জাতিসংঘ-সমর্থিত একটি নতুন নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে ইতিমধ্যে ২০টির বেশি দেশ সমর্থন জানিয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি বড় এআই কোম্পানিগুলোর প্রতি তাদের প্রযুক্তির পরিবেশগত প্রভাব—কার্বন, পানি ও ভূমি ব্যবহারের হিসাব—পরিমাপ ও প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি, উল্লেখ করেন যে ডেটা সেন্টারগুলো বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের পানি ব্যবহার সাব-সাহারান আফ্রিকার ১৩০ কোটি মানুষের এক বছরের চাহিদা মেটানোর সমান হতে পারে।

//ডিবিটেক/বিআর/আইএইচ//