আইইবির সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের অভিমত— রিয়েল-টাইম তথ্য, সেন্সরভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কীকরণে কমবে জানমাল ও কৃষির ক্ষয়ক্ষতি

বন্যা মোকাবিলায় ‘ডিজিটাল টুইন’ প্রযুক্তি ও আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থার ওপর জোর

আকস্মিক ও অতি বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ‘ডিজিটাল টুইন’ প্রযুক্তি, সেন্সরভিত্তিক রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ এবং আধুনিক বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রকৌশলী ও গবেষকরা। আইইবির আয়োজিত এক সেমিনারে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বন্যা মোকাবিলায় ‘ডিজিটাল টুইন’ প্রযুক্তি ও আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থার ওপর জোর
৬ জুলাই, ২০২৬ ১৯:২৫  

আকস্মিক ও অতি বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং ‘ডিজিটাল টুইন’ (Digital Twin) প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রকৌশলী, গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা। তাদের মতে, নির্ভুল তথ্য, রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ এবং কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বন্যায় জানমাল, কৃষি ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

৬ জুলাই, সোমবার রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরের শহীদ প্রকৌশলী ভবনের কাউন্সিল হলে আইইবির পুরকৌশল বিভাগের উদ্যোগে ‘Flood Resilience Through a Digital Twin Framework’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইইবির সভাপতি ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু) বলেন, সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে প্রায়ই আকস্মিক বন্যার কারণে কৃষকেরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন। বিশেষ করে ফসল কাটার মৌসুমে এ ধরনের বন্যা কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং কৃষকদের আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত করে।

তিনি বলেন, সময়মতো নির্ভরযোগ্য বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা পাওয়া গেলে কৃষকেরা আগাম প্রস্তুতি নিতে পারবেন। ফলে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। এ জন্য তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বন্যা পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করা জরুরি। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার কৃষিকে আরও টেকসই ও দুর্যোগ-সহনশীল করে তুলতে পারে।

রিয়াজুল ইসলাম আরও বলেন, আইইবি প্রকৌশলীদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, কৃষির আধুনিকায়ন এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও সংগঠনটি ভবিষ্যতে ভূমিকা রাখবে।

সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. একরামুল হক বলেন, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় প্রতিবছরই বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আকস্মিক ও অতি বন্যার প্রকোপ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। এই বাস্তবতায় দুর্যোগ মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তি, কার্যকর পূর্বাভাস এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।

বিশেষ অতিথি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নদী-তীরবর্তী ও গ্রামীণ এলাকার মানুষ মৌসুমি বন্যার সঙ্গে অভ্যস্ত হলেও আকস্মিক অতি বন্যা তাদের জন্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এ ধরনের বন্যায় ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা মানুষের জীবন ও জীবিকাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।

সেমিনারে বুয়েটের পানি সম্পদ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এবং আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে নদীর পানির উচ্চতা পরিমাপে প্রচলিত ওয়াটার স্কেল ব্যবহার করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা ম্যানুয়াল হওয়ায় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে সময় লাগে।

তিনি জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে সেন্সরভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নদীর পানির উচ্চতা পরিমাপ করা হচ্ছে। এসব সেন্সর নিরবচ্ছিন্নভাবে তথ্য সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে পাঠাতে সক্ষম। ফলে পানির উচ্চতার পরিবর্তন, প্রবাহের ধারা এবং সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি দ্রুত বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডও বর্তমানে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে রিয়েল-টাইম পানি-স্তরের তথ্য সরবরাহ করছে। এসব তথ্য বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি গবেষক, প্রকৌশলী ও নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলাইনা-এর সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জসিম ইমরান। তিনি বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলায় ডিজিটাল টুইন প্রযুক্তি, রিয়েল-টাইম তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্ভাবনা তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আইইবির পুরকৌশল বিভাগের ভাইস-চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. আয়নুল কবির। সভাপতিত্ব করেন বিভাগের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম (খোকা) এবং সঞ্চালনা করেন বিভাগের সম্পাদক প্রকৌশলী নেসার উদ্দিন।

এ সময় আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী এ.টি.এম. তানবীর-উল হসান (তমাল), সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী মুহাম্মদ আহসানুল রাসেল, সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এসঅ্যান্ডডব্লিউ) প্রকৌশলী সাব্বির আহমেদ ওসমানী, ঢাকা কেন্দ্রের সম্মানী সম্পাদক প্রকৌশলী কে. এম. আসাদুজ্জামান, কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য, বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের নেতা, প্রকৌশল চ্যাপ্টারের প্রতিনিধি এবং দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন।

//ডিবিটেক/এসএফ/ইকে//