সোশ্যাল মিডিয়া ডে-তে বাংলাদেশের সামনে যত প্রশ্ন

জুলাইয়ের বিপ্লব থেকে ডিজিটাল অর্থনীতি—বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন বাস্তবতায় সোশ্যাল মিডিয়া দিবস

সোশ্যাল মিডিয়া ডে-তে বাংলাদেশের সামনে যত প্রশ্ন
৩০ জুন, ২০২৬ ০৮:৩৫  

জুলাই ২০২৪। রাজধানীর রাজপথ উত্তাল। সংঘর্ষ, কারফিউ, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা, অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। ঠিক সেই সময়ই ফেসবুক লাইভ, মেসেঞ্জার, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং এক্স (সাবেক টুইটার) হয়ে ওঠে তথ্য আদান-প্রদানের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। পরে যখন মোবাইল ইন্টারনেট এবং ব্রডব্যান্ড সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়, তখন অনেকেই উপলব্ধি করেন- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আর নিছক বিনোদনের প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি অর্থনীতি, ব্যবসা, নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

এমন বাস্তবতায় ২০১০ সালে প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ম্যাশএবল সোশ্যাল মিডিয়া দিবস উদযাপন সূচনা করে। উদ্দেশ্য ছিল, মানুষের জীবন, যোগাযোগ, ব্যবসা ও সমাজে সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক প্রভাবকে স্বীকৃতি দেওয়া। কিন্তু ১৬ বছর পর এসে প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে-সোশ্যাল মিডিয়া কি শুধু আমাদের কাছে এনেছে, নাকি অদৃশ্যভাবে কিছু দূরত্বও সৃষ্টি করছে!  সেই প্রেক্ষাপটে ৩০ জুনের সোশ্যাল মিডিয়া ডে বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়; বরং ডিজিটাল সমাজের অর্জন, সংকট ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ।

কোটি মানুষের ডিজিটাল ঠিকানা

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান DataReportal-এর ২০২৬ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ সক্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী পরিচয় রয়েছে। একই সময়ে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮ কোটি ২৮ লাখ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন এবং প্রতি তিনজনের একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যও বলছে, মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং তুলনামূলক কম দামের ডেটা প্যাকেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলেছে।

দেশে এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক। এর পরেই রয়েছে ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, লিংকডইন এবং এক্স। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ভিডিওভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর দাঁড়িয়ে নতুন অর্থনীতি

এক দশক আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল মূলত ছবি ভাগাভাগি বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম। এখন এটি হাজার কোটি টাকার ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি।

দেশের লাখো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ফেসবুক পেজকেই দোকান হিসেবে ব্যবহার করছেন। পোশাক, প্রসাধনী, হস্তশিল্প, বই, খাবার, কৃষিপণ্য—সবকিছুরই বড় বাজার এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

একই সঙ্গে ইউটিউব, ফেসবুক ভিডিও এবং টিকটক ঘিরে গড়ে উঠেছে ক্রিয়েটর ইকোনমি। হাজার হাজার তরুণ কনটেন্ট নির্মাণ, ডিজিটাল মার্কেটিং, লাইভ কমার্স, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ও ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে আয় করছেন। বহু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য একটি স্মার্টফোনই এখন ব্যবসার মূলধন।

তবে এই অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনও বিদেশি প্ল্যাটফর্মনির্ভর। ফলে আয়ের বড় অংশ দেশ থেকে বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে ব্যবসা, কিন্তু অফিস নেই

বাংলাদেশে কোটি কোটি ব্যবহারকারী থাকলেও মেটা (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম), গুগল, টিকটক কিংবা এক্সের কোনো পূর্ণাঙ্গ স্থানীয় কার্যালয় নেই।

এতে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অনুরোধে তথ্য সংগ্রহ বা অপরাধমূলক কনটেন্ট অপসারণে সময় লাগে।

দ্বিতীয়ত, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়।

তৃতীয়ত, ব্যবহারকারীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য দেশে কার্যকর কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন বাজার থেকে এসব প্রতিষ্ঠান বিপুল আয় করলেও স্থানীয় কর ব্যবস্থার আওতায় তাদের সরাসরি জবাবদিহি সীমিত। এ কারণেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একাধিকবার ডিজিটাল সেবার ওপর ভ্যাট ও কর আদায়ের উদ্যোগ নিয়েছে। উচ্চ আদালতও বিভিন্ন সময়ে সরকারের কাছে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশে ব্যবসা করে আয় করা বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে কীভাবে করের আওতায় আনা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মতো বাংলাদেশেও যদি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি লোকাল কমপ্লায়েন্স অফিস বা আইনগত প্রতিনিধি থাকত, তাহলে ব্যবহারকারী সুরক্ষা, কর আদায় এবং আইনি সহযোগিতা—সবই আরও কার্যকর হতো।

আইন বদলাচ্ছে, কিন্তু বিতর্কও বাড়ছে

ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশে এক সময় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর ছিল। পরে সেটির পরিবর্তে সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা হয়। তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গ্রেপ্তারের বিধান এবং আইন প্রয়োগ নিয়ে এখনও বিভিন্ন মহলে বিতর্ক রয়েছে।

একই সময়ে সরকার ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এর লক্ষ্য নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারে স্বচ্ছতা আনা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি বাড়ানো।

তবে ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, আইন প্রণয়নের পাশাপাশি স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং নাগরিকের গোপনীয়তার সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ব্ল্যাকআউটের অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় নিরাপত্তাজনিত কারণে ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে।

প্রথমে মোবাইল ইন্টারনেট, পরে ব্রডব্যান্ড সংযোগও বন্ধ হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক সংস্থা Cloudflare Radar-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় বাংলাদেশ থেকে ইন্টারনেট ট্রাফিক কার্যত শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছিল। অন্যদিকে ডিজিটাল অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন Access Now তাদের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ওই ইন্টারনেট বন্ধকে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট হিসেবে উল্লেখ করে।

এই ব্ল্যাকআউট শুধু সামাজিক যোগাযোগ নয়; ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, রপ্তানি, ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষাব্যবস্থায়ও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

জুলাই আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তি

জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন রাজনৈতিক যোগাযোগেরও অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম।

লাইভ ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, ছবি এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনেক প্রতিবেদনও প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের সূত্র ধরে তৈরি হয়।

তবে একই সময়ে গুজব, পুরোনো ভিডিও, ভুয়া ছবি এবং এআই-নির্ভর বিভ্রান্তিকর কনটেন্টও ব্যাপকভাবে ছড়ায়। ফলে সোশ্যাল মিডিয়া যেমন গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্বও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

নতুন চ্যালেঞ্জ: ডিপফেইক ও ডিজিটাল প্রতারণা

সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ছবি ও ভিডিও তৈরির প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ডিপফেইক ভিডিও, ভুয়া বিনিয়োগের বিজ্ঞাপন, পরিচয় চুরি, অনলাইন জুয়া, সাইবার বুলিং, নারীদের ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া এবং আর্থিক প্রতারণা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন দিয়ে এসব সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব নয়। ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো, তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

বিশ্বজুড়ে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দ্রুত এআইনির্ভর হয়ে উঠছে। ব্যক্তিগত কনটেন্ট, স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ, ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েন্সার এবং জেনারেটিভ এআই আগামী কয়েক বছরে ডিজিটাল যোগাযোগের ধরন আরও বদলে দেবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-  বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কি দেশে স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব গড়বে? কিংবা, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য কতটা নিরাপদ থাকবে? অথবা গুজব ও ডিপফেইক ঠেকাতে কী ধরনের নীতি কার্যকর হবে? সব মিলিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ।

সোশ্যাল মিডিয়া ডে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি স্মার্টফোন এখন কেবল যোগাযোগের যন্ত্র নয়; এটি ব্যবসার বাজার, নাগরিকের কণ্ঠ, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের হাতিয়ার, আবার একই সঙ্গে বিভ্রান্তি ও সাইবার অপরাধেরও মাধ্যম।

জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আর শুধু প্রযুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জাতীয় অর্থনীতি, নীতি, গণতন্ত্র এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। তাই আগামী দিনের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে- মুক্ত, নিরাপদ, জবাবদিহিমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, যেখানে নাগরিকের অধিকার, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি- তিনটির মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

//ডিবিটেক/আরএ/ইকে//