উদ্ভাবন, বিজ্ঞানচর্চা ও পরিবেশ সচেতনতায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে নতুন উদ্যোগের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করাই সরকারের লক্ষ্য

ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা, পাঠ্যক্রমে বিভিন্ন খেলাধুলা অন্তর্ভুক্তি এবং তৃতীয় ভাষা শেখানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন, বিজ্ঞানচর্চা, স্টার্টআপ ও পরিবেশ সংরক্ষণে আরও সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করাই সরকারের লক্ষ্য
২৯ জুন, ২০২৬ ২১:১৬  

ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা চালু, পাঠ্যক্রমে বিভিন্ন খেলাধুলা অন্তর্ভুক্তি এবং তৃতীয় ভাষা শিক্ষার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশের পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করাই সরকারের লক্ষ্য। 

২৯ জুন, সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং ‘স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী ধারণা প্রদর্শনী’র জাতীয় আয়োজন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় খেলাধুলা, সংস্কৃতি, উদ্ভাবন ও কারিগরি দক্ষতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজিসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সক্ষমতা বাড়াবে।

তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের ২৯ হাজার ৬০০-এর বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একযোগে তিনটি করে গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। এতে একদিনেই প্রায় ৯০ হাজার গাছ রোপিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের প্রতি বছরে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা এবং নাগরিক দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সবুজ বাংলাদেশ নতুন উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার জন্য সহায়ক। শিক্ষার্থীদের শুধু পড়াশোনা নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধও গড়ে তুলতে হবে।

অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চা, স্টার্টআপ উদ্যোগ ও উদ্ভাবনী প্রকল্প পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার প্রশংসা করে এসব উদ্যোগে সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বাস দেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মাইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল।

অনুষ্ঠানে শিক্ষা ও কারিগরি খাতের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কারিগরি শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছর কারিগরি শিক্ষায় ১৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কারণ তিনি জানেন, এই জাতিকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে হলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও কর্মক্ষম জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।’

শিক্ষা খাতের অতীতের নানা সংকটের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বিগত আমলে শিক্ষা খাতে যে স্থবিরতা, অব্যবস্থাপনা ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছিল, বর্তমান সরকারের দূরদর্শী পদক্ষেপে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় শিক্ষা খাতের প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। আমাদের এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা এর সুফল পাবে।

দেশের  প্রযুক্তিগত বিপ্লবের ধারা অব্যাহত রাখতে শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে শিক্ষামন্ত্রী ড. মিলন বলেন, ‘দেশের খুদে বিজ্ঞানীদের মেধা ও প্রজেক্টগুলো দেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেভাবে মুগ্ধ ও বুঁদ হয়েছিলেন, তা ছিল সত্যিই ‘বিয়ন্ড ইমাজিনেশন’ বা কল্পনাতীত। 

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চান, যেখানে শিক্ষাক্রমের ভেতরে সংস্কৃতি থাকবে, ক্রীড়া থাকবে, সুপ্ত প্রতিভার বিকাশের মত করে আমরা প্লাটফর্ম তৈরি করে দেবো। যেখানে যেই শিক্ষার্থীর যেই সাবজেক্টে পড়তে ভালো লাগে, যা করতে ভালো লাগে, সরকার তার সর্বোচ্চ সহযোগিতা ও আন্তরিকতা দিয়ে সেই শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াবে। এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রধানমন্ত্রী চান, যেখানে আমরা দক্ষতা এবং যোগ্যতা তৈরি করব। আমাদের শিক্ষার্থীদের ভেতর কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সেই গুণাবলি, মানবিক মূল্যবোধ এবং পারিবারিক শিক্ষা আমরা গড়ে তুলতে পারবো।

গত ১২ জুন শুরু হওয়া ‘স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী ধারণা প্রদর্শনী’ উপজেলা, জেলা ও জাতীয়—এই তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পর্যায়ের বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করা হয়।

চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে ঢাকার সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় পুরস্কার অর্জন করে। বিজয়ী শিক্ষার্থী দলের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকার চেক, পদক ও সনদ এবং বিজয়ী শিক্ষকদের ৩০ হাজার টাকার চেক ও সনদ প্রদান করা হয়।

পুরস্কার বিতরণের আগে জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী সেরা ১০টি দলের খুদে বিজ্ঞানীরা সরাসরি মঞ্চে এসে প্রধানমন্ত্রীর সামনে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন। 

খাগড়াছড়ির এক পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার্থী বলেন, ‘দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে এসে আজ এই জাতীয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারাটা আমাদের জন্য স্বপ্নের মতো। প্রান্তিক অঞ্চলেও যে অসংখ্য মেধা লুকিয়ে আছে, আজকের এই আয়োজন তা প্রমাণ করেছে।’

চট্টগ্রাম থেকে আসা অনুষ্ঠানের সর্বকনিষ্ঠ এক খুদে শিক্ষার্থী (সপ্তম শ্রেণি) প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলে, ‘এখানে এসে দেখতে পেলাম আমাদের দেশের খুদে বিজ্ঞানীরা কত বড় বড় উদ্ভাবন করতে পারে। আমরাই এই বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে এগিয়ে নিয়ে যাব।’

বরিশাল পটুয়াখালীর একটি মাদ্রাসা থেকে আসা এক শিক্ষার্থী মেধা বিকাশের সমান সুযোগ পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরাও সঠিক দিকনির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বিজ্ঞান গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে বড় অবদান রাখতে পারে।’

//ডিবিটেক/ডিএইচই/ইকে//