প্রথম আসরেই ১৮ দেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে শীর্ষ দশে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের তিন শিক্ষার্থী 

এশিয়া-প্যাসিফিক এআই অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সাফল্য, ৩ স্বর্ণপদক অর্জন

প্রথমবারের মতো আয়োজিত এশিয়া-প্যাসিফিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অলিম্পিয়াডে (এপিওএআই) অংশ নিয়ে বাংলাদেশ অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। মোট ১০টি স্বর্ণপদকের মধ্যে ৩টি জিতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থান নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ।

এশিয়া-প্যাসিফিক এআই অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সাফল্য, ৩ স্বর্ণপদক অর্জন
২৭ জুন, ২০২৬ ১২:৪২  
২৭ জুন, ২০২৬ ১৪:১৫  

প্রথমবারের মতো আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ এশিয়া-প্যাসিফিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অলিম্পিয়াড (এপিওএআই)-এ অংশ নিয়েই ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। চীন, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান ও ইরানের মতো প্রযুক্তিতে অগ্রসর দেশসহ মোট ১৮টি দেশের ১২৯ জন প্রতিযোগীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অর্জন করেছে ৩টি স্বর্ণপদক।

পুরো প্রতিযোগিতায় মোট ১০টি স্বর্ণপদকের মধ্যে বাংলাদেশের ঝুলিতে গেছে ৩টি—যা অংশগ্রহণকারী যেকোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ। এর মাধ্যমে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে বাংলাদেশের সক্ষমতা নতুনভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

বাংলাদেশের হয়ে স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন কুমিল্লার হোমনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী লাবিব শাহরিয়ার, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সাইদুজ্জামান আরাফ এবং নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী ত্রিদিব রায় আর্য। আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে তারা যথাক্রমে ৪র্থ, ৫ম ও ৯ম স্থান অর্জন করেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশের আরও চার শিক্ষার্থী সম্মানজনক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তারা হলেন— নাওফিল রহমান, নাঈরা নাওয়ার আহমেদ, অনন্য যারিফ আকন্দ এবং মোবতাসিম চৌধুরী প্রিয়ম। দলের আরেক সদস্য মুর্তজা আব্দুল্লাহও প্রতিযোগিতায় প্রশংসনীয় পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন।

স্বর্ণজয়ী শিক্ষার্থীরা এই অর্জনকে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দেশের অর্জন হিসেবে দেখেছেন। তারা বলেছেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

স্বর্ণজয়ের অনুভূতি জানাতে গিয়ে লাবিব শাহরিয়ার বলে, “যখন ফলাফলের তালিকায় নিজের নামের পাশে 'লাবিব শাহরিয়ার - গোল্ড মেডেল’ লেখা দেখলাম, এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ আমি। প্রতিযোগিতায় আমার অবস্থান ভালো ছিল। তাই রৌপ্য বা স্বর্ণ - যেকোনো একটি পদক পাওয়ার আশায় ছিলাম। রৌপ্য পদক নিয়ে আমি প্রায় নিশ্চিতই ছিলাম, আর স্বর্ণের জন্য শুধু আশা করছিলাম। এখন সত্যিই স্বর্ণপদক জিততে পেরে অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এশিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) অলিম্পিয়াডের প্রথম আসরে বাংলাদেশের হয়ে স্বর্ণপদক জয় করা এবং দেশের জন্য এই গৌরব বয়ে আনতে পারা আমার জন্য অসীম আনন্দ ও গর্বের। এই অর্জন সম্ভব হয়েছে অনেক মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। এই আয়োজনকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ বিডিওএসএন, বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াড কমিটি এবং এপিওএআই আয়োজক কমিটির প্রতি।” 

স্বর্ণপদকজয়ী আরেক সদস্য মোঃ সাইদুজ্জামান আরাফ তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলে, “নিজের জন্য জেতা কখনোই বড় বিষয় ছিল না, কিন্তু দেশের হয়ে কম্পিটিশনে নামলে বিষয়টা একদম আলাদা হয়। আজ যখন রেজাল্টে নিজের নামের পাশে গোল্ড লেখা দেখলাম আর অফিসিয়াল টি-শার্টে বাংলাদেশের ম্যাপটা চোখে পড়ল, তখন সত্যিই ভালো লেগেছে। এই জয় শুধু আমার না, এটা বাংলাদেশের। আজ আমরা অর্জন করেছি, সামনে যারা আসবে তারাও করবে, আর শেষ পর্যন্ত পরিচয়টা একই থাকবে, বাংলাদেশি।”

আরেক স্বর্ণপদকজয়ী সদস্য ত্রিদিব রায় আর্য জানায়, “এপিওএআই-তে স্বর্ণপদক পাওয়ায় আমি সত্যিই খুব আনন্দিত। নিজ দেশ ও মাতৃভূমির মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারায় আমি অত্যন্ত গর্বিত। আগামীর পথচলায় সকলের দোয়া ও আশীর্বাদ প্রত্যাশী। ” 

বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক-এর প্রেসিডেন্ট মুনির হাসান বলেন, "প্রথমবারের মতো আয়োজিত এশিয়া প্যাসিফিক এআই অলিম্পিয়াডে এই অবিস্মরণীয় সাফল্য বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত! পুরো এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে আর কোনো দেশ যেখানে দুটির বেশি গোল্ড মেডেল পায়নি, সেখানে আমাদের শিক্ষার্থীরা একাই ৩টি গোল্ড মেডেল অর্জন করেছে! এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের এবং আনন্দের। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আর নানা প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও বিডিওএসএন টিম যেভাবে এই পুরো আয়োজনটিকে সফল করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। পুরো টিম এবং বিজয়ীদের আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে অভিনন্দন!"

বাংলাদেশ দলের এই অসাধারণ সাফল্য নিয়ে আনন্দ ও গর্ব প্রকাশ করেছেন দলের দলনেতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেন। তিনি বলেন, “এই ফলাফল আমাদেরকে আশান্বিত করে তোলে। নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মাঝেও আমরা যে কার্যক্রম চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, সেটি অর্থবহ হয়ে উঠে আমাদের এই প্রতিযোগীদের ভালো ফলাফলের মাধ্যম। এটি শুধু আমাদের অর্জন নয়, এটি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক উপস্থির দৃঢ় ঘোষণা।“ তিনি আরও বলেন -  “যেমন করেই হোক, আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য, আগামী প্রজন্মের জন্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার আয়োজন অব্যাহত রাখবো।"

বাংলাদেশ দলের কোচ ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এসোসিয়েট প্রফেসর ড. মো: আজম খান বলেন, “টিম বাংলাদেশের এই অসাধারণ সাফল্য আমাদের সবার জন্য গর্বের। আমাদের শিক্ষার্থীদের নিরলস পরিশ্রম, সাহস, অধ্যবসায় এবং দেশের জন্য সেরাটা দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ই এই ঐতিহাসিক অর্জনের মূল ভিত্তি। আঞ্চলিক ও জাতীয় বাছাইপর্ব, প্রশিক্ষণ ক্যাম্প এবং নিবিড় অনুশীলনের মাধ্যমে আমাদের আটজন মেধাবী শিক্ষার্থী নিজেদের অসাধারণ নিষ্ঠা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। প্র্যাকটিস সেশনে তাদের শেখার আগ্রহ, কৌতূহল এবং দ্রুত উন্নতি আমাকে অত্যন্ত অনুপ্রাণিত করেছে। আমরা শুধু একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিইনি; আমরা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের তরুণদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং দক্ষতার প্রতিনিধিত্ব করেছি। আমি বিশ্বাস করি, এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আরও অনেক আন্তর্জাতিক সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করবে।” 

বাংলাদেশ দলের একাডেমিক কোঅর্ডিনেটর তাসনিম মাহফুজ নাফিস বলেন, “বাংলাদেশ দলের সবার পারফর্মেন্সে আমি ভীষণ আনন্দিত। এবারের এপিওএআই-তে ৪টি প্রবলেমের মধ্যে একটি ছিল এস্ট্রোনমি ডোমেইনের, একটি ছিল অডিও প্রসেসিং-এর, একটি ওয়াইল্ডলাইফ ইমেজ সংক্রান্ত, এবং বাকি প্রবলেমটি ছিল কেমিস্ট্রি ডোমেইনের। ফলে একজন হাই স্কুল বা কলেজের শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে যে ডোমেইনেই কাজ করার স্বপ্ন দেখুক না কেন, এআই এবং মেশিন লার্নিং-এ দক্ষতা তাকে অনেকটা পথ এগিয়ে রাখবে। কারণ সব ডোমেইনেই নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে হলে কাজ করতে হয় প্রচুর ডেটা নিয়ে। একজন হাই স্কুল শিক্ষার্থী অল্পবিস্তর পাইথন শিখে ক্যাগল প্ল্যাটফর্মে খুব সহজেই মেশিন লার্নিং হাতেকলমে শেখা শুরু করতে পারে।  মাত্র এক যুগ আগেও এই চমৎকার ব্যাপারটি সম্ভব ছিল না।” 

গত ১৩ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট (আইআইটি) থেকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে অনলাইনে ভিডিও প্রক্টরিং ও স্ক্রিন রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের আট সদস্যের দল প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। ছয় ঘণ্টাব্যাপী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা মেশিন লার্নিংভিত্তিক চারটি বাস্তবধর্মী সমস্যা সমাধান করেন।

তিন মাসব্যাপী জাতীয় নির্বাচন ও প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অলিম্পিয়াডের আয়োজক বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) জাতীয় দল নির্বাচন করে।

//ডিবিটেক/এমএম/ইকে//