এআই ব্যবহারে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করছে বিপিসিএল
দেশের প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ও রিসাইক্লিং বিজনেস ইউনিট (আরবিইউ) মডেলের ব্যবহার শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোকেমিকেল কোম্পানি লিমিটেড (বিপিসিএল)। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্লিজ প্রকল্পের আওতায় ফেনী, কক্সবাজার, রূপগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ, বগুড়া, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় সাতটি রিসাইক্লিং বিজনেস ইউনিট (আরবিইউ) প্রতিষ্ঠা করেছে বিপিসিএল। এরই মাধ্যমে ৬১৭ মেট্রিক টনের বেশি প্লাস্টিক পুনরুদ্ধার এবং ৫ হাজার ৬১৫ জনের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।
প্লিজ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খাদেম মাহমুদ ইউসুফ জানান, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্লকচেইন প্রযুক্তির পাশাপাশি এআই-চালিত ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে পিইটি বর্জ্য সংগ্রহ থেকে পুনর্ব্যবহার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
তিনি আরও জানান , এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভাঙারি সরবরাহকারীদের কেজিপ্রতি নিট মুনাফা ২ টাকা থেকে বেড়ে ৩ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই প্রকল্পে বিপিসিএলের অংশীদার প্রতিষ্ঠান সিদীপ, যাদের সহায়তায় বিপিসিএল ১ হাজার ৪০৪ জন অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রাহককে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, ৭০ জন শিশুকে শিশু যত্নকেন্দ্র এবং ১ হাজার ৪৭৫ জনকে জীবনদক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে।
রাজধানীর গুলশানের রেনেসাঁ হোটেলে ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত "ডিকার্বনাইজিং বাংলাদেশ'স প্লাস্টিক ওয়েস্ট: ইনোভেটিভ সলিউশনস ফর দ্য সার্কুলার ইকোনমি" শীর্ষক ওয়ার্কশপে মুক্ত আলোচনার পাশাপাশি প্রকল্পের উদ্ভাবনী কার্যক্রম প্রদর্শন করা হয়। প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে কিভাবে তা পূণব্যবহারের মাধ্যমে প্লাস্টিকের ব্যবহার কামানোর পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির টেকসই ববহার তুলে ধরা হয় ভেন্যু প্রাঙ্গনে।
এ নিয়ে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম, জাতিসংঘ প্রকল্প সেবা কার্যালয় (ইউএনওপিএস), বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ম্যানেজার সুধীর মুরালিধরন এবং ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি'র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান জামান চৌধুরী। পাশাপাশি আরও উপস্থিত ছিলেন সুইডেন এম্ব্যাসি, হাঙ্গেরি এম্ব্যাসি, ইউনিসেফ, আইএলও, ইউএনডিপি, ইউএনওপিএস, আইএফসি, এডিবি, কোর্ডএইড, আইইউসিএন ও প্র্যাক্টিকাল অ্যাকশনের প্রতিনিধি, পরিবেশ অধিদপ্তর, কোকা-কোলা, ট্রান্সকম, লাফার্জ-হোলসিম, আরলা-সহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ।
আবদুল আউয়াল মিন্টু তার বক্তব্যে বলেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, কারণ প্লাস্টিক দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বরং পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে। আগামীতে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে আমরা বদ্ধপরিকর।
একই মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম বিপিসিএলের এই কার্যক্রমে সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে বলে উল্লেখ করে বলেন, সরকার এ ব্যাপারে সবরকম কারিগরি সহায়তা করতে প্রস্তুত। বিশেষ করে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টে সরকারের বিশেষ আগ্রহের কথা বলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ'র প্রফেসর ড. মেলিতা মেহজাবিন জানান, পুরো এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ একটি সুগঠিত ফাইন্যানশিয়াল মডেলের আওতায় করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হবে। প্রতিষ্ঠানটির টেকসই ক্রেতা নিশ্চিত করার বিষয়টির তিনি বিশেষ প্রশংসা করেন।
জাতিসংঘ প্রকল্প সেবা কার্যালয় (ইউএনওপিএস), বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ম্যানেজার সুধীর মুরালিধরন বিপিসিএলের প্রকল্পের উদ্ভাবনকে উজ্জ্বলতম আখ্যা দিয়ে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন প্রতিষ্ঠানটির এই প্রকল্প সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।
সুইডেন অ্যাম্বাসির ফার্স্ট সেক্রেটারি নায়োকা মার্টিনেজ ব্যাকস্টর্ম বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপিসিএলের কার্যক্রমকে যথেষ্ট প্রশিক্ষিত বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ব্যক্তি পর্যায় থেকে যে সাপ্লাই চেইন তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি, তা অনেক কঠিন একটি কাজ এবং তারা এই কাজকে সহজ করে ফেলেছে।
ইউএনডিপি'র গ্রিন গ্রোথ প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট জ্যাকব ফিঙ্ক ফার্দিনান্দ বিপিসিএলের সার্বিক ডিজিটাল আর্কিটেকচারের প্রশংসা করে বলেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের নিবিড় পর্যবেক্ষণ থাকা উচিত।
জিআইজেড-এর হেড অব প্রজেক্ট মাইকেল ক্লোড বিপিসিএলের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জানান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইকোসিস্টেমে সরকারের অংশগ্রহণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে পিইটি পরিবেশবান্ধব ডেলিভারিকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ কার্যকর বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে ট্র্যাকিং সিস্টেম বেশি কঠিন একটি বিষয়, যেটাতে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
ডিবিটেক/এফএইচ/এমইউএম



