বোনাস চুক্তির পর স্যামসাংয়ের শ্রমিকদের ধর্মঘট স্থগিত
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ বাজারের এক বড় বিপর্যয় আপাতত কেটে গেছে। চিপ ও ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট স্যামসাংয়ের সবচেয়ে বড় শ্রমিক ইউনিয়ন তাদের পূর্বঘোষিত ১৮ দিনের মেগা ধর্মঘট স্থগিত করেছে। কর্তৃপক্ষের সাথে বোনাস ও লভ্যাংশ বণ্টন নিয়ে একটি সম্ভাব্য বা খসড়া চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় আজ (২১ মে) থেকে শুরু হতে যাওয়া এই কর্মবিরতি স্থগিত করা হয়।
এই ধর্মঘটে স্যামসাংয়ের প্রায় ৪৮ হাজার শ্রমিকের অংশ নেওয়ার কথা ছিল, যার বেশিরভাগই কোম্পানির সবচেয়ে লাভজনক খাত ‘মেমোরি চিপ’ উৎপাদন বিভাগের কর্মী। ধর্মঘটটি সফল হলে স্যামসাংয়ের পাশাপাশি পুরো দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা ছিল।
ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে ভাগ্য
ইউনিয়ন নেতা চোই সেউং-হো জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষের সাথে হওয়া এই খসড়া চুক্তির ওপর আগামী ২২ থেকে ২৭ মে পর্যন্ত শ্রমিকদের ভোট গ্রহণ করা হবে। ভোটের ফলাফলের পরই চুক্তিটি চূড়ান্ত রূপ পাবে।
এক বিবৃতিতে স্যামসাং কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, “অত্যন্ত নমনীয় ও আন্তরিক মনোভাব নিয়ে আমরা শ্রমিক-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের একটি পরিপক্ব ও গঠনমূলক ভিত্তি তৈরি করব, যেন ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি আর কখনো না ঘটে।”
এসকে হাইনিক্সের সাথে টক্কর ও বোনাস বিতর্ক
মূলত বার্ষিক বোনাসের ওপর থাকা সর্বোচ্চ সীমা (ক্যাপ) তুলে দেওয়া এবং কোম্পানির বার্ষিক পরিচালন মুনাফার ১৫ শতাংশ বোনাস ফান্ডে দেওয়ার দাবিতে এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছিল। স্যামসাংয়ের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ‘এসকে হাইনিক্স’ তাদের কর্মীদের ওপর থেকে বোনাসের এই সীমা আগেই তুলে নিয়েছিল। স্যামসাংয়ের শ্রমিকদের অভিযোগ ছিল, গত বছর এসকে হাইনিক্সের কর্মীরা স্যামসাংয়ের চেয়ে তিন গুণ বেশি বোনাস পেয়েছেন, যার ফলে অনেক দক্ষ কর্মী স্যামসাং ছেড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থায় যোগ দিচ্ছিলেন।
রয়টার্সের তথ্যমতে, নতুন চুক্তিতে স্যামসাং বোনাসের ওপর থাকা ৫০ শতাংশের সর্বোচ্চ সীমা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করতে রাজি হয়েছে এবং বার্ষিক পরিচালন মুনাফার ১০.৫ শতাংশ কর্মীদের বোনাস হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। ইয়োনহাপ নিউজ জানিয়েছে, এই বোনাস ফান্ডের ৪০ শতাংশ পাবেন কেবল মেমোরি চিপ বিভাগের কর্মীরা এবং বাকি ৬০ শতাংশ অন্যান্য বিভাগের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
তবে এই বোনাস পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে মেমোরি বিভাগকে অন্তত ২০০ ট্রিলিয়ন ওন (প্রায় ১৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার) মুনাফা করে দেখাতে হবে। এছাড়া বোনাসের একটি অংশ আগামী ১০ বছর কোম্পানির শেয়ার হিসেবে দেওয়া হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জিডিপির ১২.৫% ও সরকারের হস্তক্ষেপ
১৮ দিনের এই ধর্মঘটের ঘোষণার পরপরই দক্ষিণ কোরিয়া সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে মধ্যস্থতায় নামে। কারণ, দক্ষিণ কোরিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১২.৫ শতাংশই আসে এককভাবে স্যামসাং থেকে। বিশ্বখ্যাত এই মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি চলতি ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ)-এ একাই ৫৩.৭ ট্রিলিয়ন ওন পরিচালন মুনাফা করেছে।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিম মিন-সিউক এর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, এই ১৮ দিনের ধর্মঘটের কারণে সরাসরি প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ওন-এর ক্ষতি হতে পারত। তবে উৎপাদন লাইনে থাকা চিপগুলো নষ্ট হয়ে গেলে পরোক্ষ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতি ১০০ ট্রিলিয়ন ওন (প্রায় ৬৬ বিলিয়ন ডলার) ছাড়িয়ে যেতে পারত, যা থেকে রক্ষা পেল বিশ্ববাজার।
ডিবিটেক/বিএমটি । সূত্র: এনগ্যাজেট



