অ্যাপলের ৫০ বছর: গ্যারেজ থেকে শুরু হওয়া এক বিপ্লবের গল্প

অ্যাপলের ৫০ বছর: গ্যারেজ থেকে শুরু হওয়া এক বিপ্লবের গল্প
৩০ মার্চ, ২০২৬ ১৯:৫৫  

১৯৭৬ সালের ১ এপ্রিল। ক্যালিফোর্নিয়ার লস অল্টোসের একটি সাধারণ গ্যারেজ। তিনজন মানুষ মিলে হাতে গোনা কয়েকটি কম্পিউটার বানিয়ে বসেছিলেন। তাদের কেউই জানতেন না, এই ছোট্ট শুরুটিই একদিন বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে। পঞ্চাশ বছর পর অ্যাপলের বাজার মূল্য ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, বার্ষিক আয় ৪১৬ বিলিয়ন ডলার, আর সক্রিয় ডিভাইসের সংখ্যা ২২০ কোটির বেশি।

অ্যাপলের এই পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে সিইও টিম কুক বলেছেন, "পঞ্চাশ বছর আগে একটি ছোট গ্যারেজে একটি বড় ধারণার জন্ম হয়েছিল। অ্যাপল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই সরল বিশ্বাসে যে প্রযুক্তি ব্যক্তিগত হওয়া উচিত—যে বিশ্বাসটি তখন ছিল বৈপ্লবিক"।

শুরুটা যে তিনজনের
আমরা সবাই জানি স্টিভ জবস ও স্টিভ ওজনিয়াকের নাম। কিন্তু অ্যাপলের জন্মগল্পে আরও একজন ছিলেন—রোনাল্ড ওয়েন। তিনিই মূল অংশীদারিত্বের চুক্তিটি খসড়া করেছিলেন, লিখেছিলেন অ্যাপলের প্রথম পরিচালনা ম্যানুয়াল, এমনকি ডিজাইন করেছিলেন প্রথম লোগো। কিন্তু কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাত্র চল্লিশ দিন পর তিনি তার ১০ শতাংশ শেয়ার মাত্র ৮০০ ডলারে বিক্রি করে দেন।

কারণ? অ্যাপল তখন মাত্র একটি গ্যারেজের ব্যবসা—দুই প্রকৌশলী, কোনো মূলধন নেই। ওয়েন ভেবেছিলেন, ব্যবসা ব্যর্থ হলে ঋণের দায় ভাগ করতে হবে। সেই ১০ শতাংশ শেয়ার আজকের মূল্যে প্রায় ৩৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তগুলোর একটি এটি।

প্রাপ্তবয়স্কের আগমন
অ্যাপলের প্রথম দশকের সবচেয়ে অবমূল্যায়িত ব্যক্তি মাইক মার্কুলা। ইন্টেল থেকে সম্প্রতি অবসর নেওয়া এই ৩৩ বছর বয়সী প্রকৌশলী ১৯৭৭ সালে অ্যাপলে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করেন এবং নিজেও যোগ দেন তৃতীয় কর্মী হিসেবে।

তিনি লিখেছিলেন 'অ্যাপল মার্কেটিং ফিলোসফি'—ফোকাস, ইম্পিউট, এমপ্যাথি—তিনটি শব্দের একটি দর্শন। পঞ্চাশ বছর পরও অ্যাপলের প্রতিটি পণ্যের সিদ্ধান্তে এই দর্শনের ছাপ স্পষ্ট। তিনিই বুঝিয়েছিলেন, জবস ও ওজনিয়াকের কেউই ব্যবসা চালানোর মতো নন। তাই তিনি নিয়ে এলেন মাইকেল স্কটকে—অ্যাপলের প্রথম পেশাদার সিইও।

স্কটের সময়েই অ্যাপল ২-এর বাণিজ্যিক সাফল্য আসে, ১৯৮০ সালে আইপিও হয়—ফোর্ডের পর ততদিনে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় আইপিও।

ওজনিয়াকের একক কৃতিত্ব
অ্যাপল ২ ছিল সম্পূর্ণ ওজনিয়াকের একক কৃতিত্ব। তিনি একাই এটি ডিজাইন করেছিলেন। কালার গ্রাফিকস, ওপেন এক্সপেনশন স্লট, ইন্টিগ্রেটেড বেসিক ইন্টারপ্রেটার—প্রতিটি ফিচার প্রতিযোগীরা অসম্ভব বলে মনে করেছিল। অ্যাপল ২-ই ছিল বিশ্বের প্রথম সত্যিকার অর্থে ব্যবহারযোগ্য ব্যক্তিগত কম্পিউটার।

এরপর এলো ১৯৮৪ সালের ম্যাকিনটোশ। গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেস, আইকন, মাউস—কম্পিউটারকে কমান্ড-লাইনের জটিলতা থেকে বের করে এনে সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার এই দর্শনটির জনক কিন্তু জবস নন।

ইতিহাসের পাতা থেকে যার নাম মুছে গেল
১৯৭৯ সালে অ্যাপলের ২৬ বছর বয়সী কর্মী জেফ রাসকিন একটি মেমো লিখলেন। তিনি প্রস্তাব করলেন এক নতুন ধরনের কম্পিউটারের—নাম দিলেন ম্যাকিনটোশ। তার ধারণা ছিল, কম্পিউটার এতটাই সহজ হবে যে মানুষ ম্যানুয়াল না পড়েই ব্যবহার করতে পারবে।

তিনিই মূল টিম গড়লেন। লিখলেন 'দ্য বুক অব ম্যাকিনটোশ'—১৭২ পৃষ্ঠার একটি ডকুমেন্ট যেখানে পণ্যটির নকশার মূলনীতি স্থির হয়। ১৯৮০ সালের শেষে জবস এই প্রকল্পে আগ্রহী হন। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে তিনি প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। রাসকিনকে বাধ্য করে ছুটি নেওয়ানো হয়। পরে তিনি অ্যাপল ছেড়ে চলে যান।

১৯৮৪ সালে যে ম্যাকিনটোশ বাজারে এলো, তা বহন করল রাসকিনের নাম ও দর্শন। কিন্তু কৃতিত্ব গেল জবসের ঝুলিতে। ইতিহাসের এক চমৎকার প্রতিষ্ঠানিক মুছে ফেলার ঘটনা এটি।

হার্ডওয়্যার ও সফটওয়ারের অদেখা কারিগররা
ম্যাকিনটোশের হার্ডওয়্যার সম্ভব করেছিলেন বারেল স্মিথ। মেরামতকারী টেকনিশিয়ানের চেয়ার থেকে উঠে তিনি ডিজাইন করলেন এমন একটি বোর্ড যা প্রত্যাশিত গতির দ্বিগুণে চলত অথচ চিপের সংখ্যা অর্ধেক করে দিয়েছিল।

অ্যান্ডি হার্জফেল্ড লিখলেন ম্যাকের সিস্টেম সফটওয়্যার। স্টিভ কারে ডিজাইন করলেন কম্পিউটিং-এর ভিজুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ—ট্র্যাশ ক্যান, হ্যাপি ম্যাক, কমান্ড সিম্বল, হ্যান্ড কার্সর। শিকাগো ও জেনেভা টাইপফেস।

বিল অ্যাটকিনসন বানালেন কুইকড্র—গ্রাফিক্স ইঞ্জিন যা ম্যাকের ডিসপ্লে সম্ভব করল। ম্যাকপেইন্ট বানালেন। হাইপারকার্ড বানালেন—ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের সরাসরি পূর্বসূরি।

এই সবাই—রাসকিন, স্মিথ, কারে, হার্জফেল্ড, অ্যাটকিনসন—তাদের কারোর নাম সাধারণ অ্যাপল ইতিহাসে জবসের পাশে বসে না। অথচ তারাই অ্যাপলকে তৈরি করেছেন।

ফিরে আসা, আর সেই বিখ্যাত 'থিংক ডিফারেন্ট'
১৯৮৫ সালে জবস অ্যাপল থেকে বেরিয়ে যান। এরপরের বছরগুলোতে অ্যাপল ধুঁকতে থাকে। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি নাগাদ বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিলেন, অ্যাপল কি টিকে থাকবে?

ফিরে আসার পথ তৈরি হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে। ততদিনে অ্যাপলের সিইো গিল অ্যামেলিও নেক্সট কোম্পানি কিনে নেন ৪২৯ মিলিয়ন ডলারে। ছয় মাস পর অ্যামেলিওকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ফিরে এলেন জবস।

প্রথম কাজ—পণ্যের লাইন আঁচড়ে ফেলা। কয়েক ডজন পণ্য বাদ দেওয়া হলো। ফোকাস করা হলো মাত্র কয়েকটিতে।

১৯৯৮ সালে এলো আইম্যাক। স্বচ্ছ প্লাস্টিকের শরীর, ক্যান্ডির মতো রং—আইম্যাক দেখতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অফিস-ডমিনেট করা বেইজ রঙের পিসিদের মধ্যে আইম্যাক ছিল বিদ্রোহের প্রতীক।

২০০১ সালে আইপড। বাজারে তখন অনেক এমপি৩ প্লেয়ার। কিন্তু আইপড-ইটিউন্সের সমন্বয় গান শোনার অভিজ্ঞতাকে পাল্টে দিল। ২০০৩ সালে আইটিউন্স স্টোর—ডিজিটাল মিউজিক ডাউনলোডের প্রথম বড় মার্কেটপ্লেস।

২০০৭ সালের জানুয়ারি। স্টিভ জবস মঞ্চে ঘোষণা করলেন: "আজ অ্যাপল ফোন আবিষ্কার করবে।" আইফোন। ফিজিক্যাল কীবোর্ড নেই। বড় টাচস্ক্রিন। ইন্টারফেস এতটাই সরল যে যেকেউ ব্যবহার করতে পারে।

পরের বছর অ্যাপ স্টোর এল। স্মার্টফোন তখন থেকে আর শুধু ফোন নয়—ক্যামেরা, গেমিং ডিভাইস, নেভিগেশন টুল, পেমেন্ট সিস্টেম। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আইফোন বিক্রি হয়েছে ৩১০ কোটির বেশি, আয় হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার।

২০১০ সালে আইপ্যাড। 'থার্ড ক্যাটাগরি অব ডিভাইস'—ফোন আর ল্যাপটপের মাঝামাঝি।

টিম কুকের যুগ
২০১১ সালে জবসের মৃত্যুর পর প্রশ্ন উঠেছিল—অ্যাপল কি আগের মতো উদ্ভাবনী থাকতে পারবে? সিইও টিম কুকের উত্তরটা ভিন্ন রকম। যেখানে জবস ছিল ড্রামাটিক প্রোডাক্ট রিইনভেনশনে সিদ্ধহস্ত, কুক ফোকাস করলেন স্কেল, অপারেশনাল এফিসিয়েন্সি আর ইকোসিস্টেম সম্প্রসারণে।

তার অধীনেই এল অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডস। বেড়েছে সার্ভিস বিজনেস—অ্যাপল মিউজিক, অ্যাপল টিভি+, আইক্লাউড। আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন—ম্যাক-এ অ্যাপল নিজেদের সিলিকন চিপ ব্যবহার শুরু। ইন্টেলকে পেছনে ফেলে।

সমালোচকরা বলছেন, কুকের যুগে অ্যাপল আগের চেয়ে বেশি সতর্ক, রিফাইনমেন্টে মন দিচ্ছে, ঝুঁকি নেওয়ার অভ্যাস কমে গেছে। কিন্তু তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৫ সালের অক্টোবরে অ্যাপলের বাজার মূল্য ৪ ট্রিলিয়ন ডলার স্পর্শ করেছিল।

সেই সব ব্যর্থতা, আর সামনের পথ
অ্যাপলের ইতিহাস কিন্তু শুধু সাফল্যের নয়। নিউটন মেসেজপ্যাড—হ্যান্ডরাইটিং রিকগনিশনে ব্যর্থ, সময়ের আগেই চলে আসা একটি ডিভাইস। অ্যাপল কার—বছরের পর বছর গবেষণার পর পরিত্যক্ত প্রকল্প। ম্যাকবুকের কীবোর্ড নিয়ে বিতর্ক। অ্যাপ স্টোর নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর চাপ।

সামনে চ্যালেঞ্জ জেনারেটিভ এআই। সিরির আপগ্রেড আসতে দেরি হচ্ছে। অ্যাপল ইন্টেলিজেন্সের প্রতিশ্রুত ফিচার এখনো হাতে পৌঁছায়নি। অ্যাপলকে এবার গুগলের সঙ্গে হাত মেলাতে হচ্ছে এআই মডেলের জন্য।

চীন—অ্যাপলের উত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ—এখন জটিলতায়। একদিকে উৎপাদন বহুমুখীকরণের চাপ, অন্যদিকে বাজারে স্থানীয় প্রতিযোগী হুয়াওয়ের আগ্রাসন।

তবুও পঞ্চাশ বছরের পথচলার অভিজ্ঞতা বলছে, অ্যাপল যে ক্যাটাগরিতে প্রবেশ করে, সেটি রিইমাজিন করে, ডিজাইন ও ইন্টিগ্রেশনের মধ্য দিয়ে স্কেলে পৌঁছে দেয়। ম্যাকিনটশ যেমন করেছিল গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেস নিয়ে, আইপড যেমন করেছিল মিউজিক প্লেয়ার নিয়ে, আইফোন যেমন করেছিল স্মার্টফোন নিয়ে।

টিম কুকের ভাষায়, "আমরা যদি কিছু শিখে থাকি, তাহলে তা হল—যেসব মানুষ পাগলের মতো ভাবে যে তারা পৃথিবী বদলে দিতে পারে, তারাই সেটা করে। তাই সেই পাগলদের প্রতি সালাম। বিদ্রোহীদের। সমস্যা সৃষ্টিকারীদের। বর্গাকার গর্তে ঢুকতে না চাওয়া গোল পেরেকগুলোর প্রতি"।

পঞ্চাশ বছরে অ্যাপল প্রমাণ করেছে, প্রযুক্তি কেবল যন্ত্র নয়—মানুষের হাত ধরে হাঁটার নাম। এখন দেখার, আগামী পঞ্চাশ বছরে সেই হাত ধরে কোথায় নিয়ে যায়।

ডিবিটেক/বিএমটি