মানুষ উড়তে পারেনা। তাই তারা বানালো প্লেন। মানুষ বেশি ওজন তুলতে পারে না সেজন্য সে বানালো ক্রেন। কিন্তু মানুষের একটা ইগো আছে। সে ভাবে বুদ্ধিমানের জগতে অন্য কাউকে পার্টনার হিসেবে নেওয়া যাবে না। কিন্তু আমার যেহেতু বুদ্ধি কম, আমি প্রথম থেকেই ভেবে নিয়েছি মানুষের বুদ্ধিমান পার্টনার দরকার। মানুষ খেলবে অন্য লেভেলে।
কারণটা সহজ। যে কাজগুলো করতে আগে বুদ্ধি লাগত - ডেটা অ্যানালাইসিস, হিসাব কষা, ডাটা প্রসেস করা - সেগুলো এখন মেশিন করছে। এআই করছে। আর মেশিন এই কাজগুলোতে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত আর নির্ভুল। এই জিনিসটা আমি মেনে নিয়েছি অনেক আগেই। সে কারণেই এতগুলো বই লেখা। তাহলে মানুষের সুবিধা কোথায়?
উত্তরটা হলো ইকিউ - ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স।
ইকিউ মানে শুধু আবেগপ্রবণ হওয়া না। এটা চারটা জিনিসের সমন্বয়। প্রথমত, নিজের আবেগ বোঝা - আমি এখন কেন রাগছি, কেন ভয় পাচ্ছি। দ্বিতীয়ত, সেই আবেগকে কন্ট্রোল করা। তৃতীয়ত, অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা - যাকে বলে এমপ্যাথি। আর চতুর্থত, মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখার দক্ষতা। আমার যেহেতু বুদ্ধি কম (মানে যন্ত্রকে আউটসোর্স করে দিয়েছি), সে কারণেই এই চারটা বিষয়ে রপ্ত করে নিয়েছি শুরুতেই।
আরেকটা মজার বিষয় হলো টেকনোলজির প্যারাডক্স। আমরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কানেক্টেড - ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম। কিন্তু একাকীত্ব বাড়ছে। মানুষের সাথে ইমোশনাল কানেকশন কমছে। কারণ ইকিউ বাড়াতে হলে সামনাসামনি মানুষের সাথে সময় কাটাতে হয়, একসাথে কষ্ট পেতে হয় (মিলিটারি একাডেমিতে যখন আমাদেরকে একসাথে "ডলা" দেওয়া হয়েছে, সেটা আমরা এখনো চেরিশ করি), একসাথে হাসতে হয়। এটা মেশিন শেখাতে পারবে না।
বর্তমান যুদ্ধ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মেরুকরণ - আজকের বড় বড় সমস্যাগুলো সমাধান করতে শুধু ডেটা দরকার না। দরকার এমপ্যাথি। দরকার ভিন্নমতের মানুষকে বোঝার ক্ষমতা। এটা ভয়ংকর ভাবে কমে আসছে ইদানিং।
আমরা সারাজীবন আবেগকে দুর্বলতা মনে করেছি। ভেবেছি লজিক দিয়ে সব কিছু জেতা যাবে। কিন্তু এআই-এর যুগে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের আবেগ - কানেক্ট করার ক্ষমতা, অন্যকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা, মানে সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষমতা।
মেশিন এটা পারবে না। এটা শুধু মানুষই পারে।
.......
ঢাকার একটা স্টার্টআপ। ফাউন্ডার গর্বের সাথে বললেন - "আমাদের AI এজেন্ট চব্বিশ ঘণ্টা চলে। ঘুমের মধ্যেও কাজ করে।"
কিন্তু বিল দেখলে সেটা আর দারুণ মনে হয় না।
মাস শেষে OpenAI-এর ইনভয়েস আসলো। পঞ্চাশ হাজার টাকা। পরের মাসে আরো বেশি। তৃতীয় মাসে ফাউন্ডার হিসেব করতে বসলেন। এজেন্ট চব্বিশ ঘণ্টা কী করছে আসলে?
দেখা গেল - একই ডেটা বারবার চেক করছে। একই সিদ্ধান্ত বারবার নিচ্ছে। একই কনটেক্সট বারবার প্রসেস করছে।
কাজ হচ্ছে না। টোকেন পুড়ছে।
.........
দুই ধরনের সিস্টেম।
পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছেন।
এক দল AI দিয়ে সিস্টেম চালায়। অন্য দল AI দিয়ে সিস্টেম বানায়।
প্রথম দল প্রতিদিন বিল দেয়। দ্বিতীয় দল একবার বানিয়ে রেখে দেয়।
অটোনোমাস সিস্টেম মানে AI সারাক্ষণ জেগে আছে। প্রতিটা সেকেন্ডে টোকেন খাচ্ছে। কিছু হোক বা না হোক।
ডিটাচড সিস্টেম মানে AI একবার কাজ করেছে। সিস্টেম বানিয়ে দিয়েছে। এখন সিস্টেম নিজেই চলছে। AI শুধু ডাক পড়লে আসে।
আমাদের দেশে ডলারের দাম বেশি।
GPT-4 Turbo-তে প্রতি মিলিয়ন টোকেনে খরচ $30। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা।
দিনে ৬ হাজার ট্রানজেকশন। প্রতিটায় গড়ে ৫০০ টোকেন। মাসে দাঁড়ায় ৯ কোটি টোকেন।
এই বিলটা দিয়ে একজন ভালো ডেভেলপারের এক বছরের বেতন হয়ে যায়।
চব্বিশ ঘণ্টার রিসার্চ কথাটা ঠিক না।
কয়েক দিনের কাজ কয়েক মিনিটে।
তাহলে সারাদিন ধরে রিসার্চ চলছে মানে কী? মানে লুপ চলছে। একই তথ্য বারবার প্রসেস হচ্ছে। একই আউটপুট বারবার আসছে।
হাইকিং করতে গিয়ে বলছেন AI কাজ করছে। ফ্লাইটে বসে বলছেন AI কাজ করছে। ঘুমের মধ্যেও বলছেন AI কাজ করছে।
একই টাস্ক। ভিন্ন সাইকেল। একই আউটপুট। আর বাড়ছে টোকেন খরচ।
চব্বিশ ঘণ্টা চলা মানে দক্ষ না। চব্বিশ ঘণ্টা চলা মানে প্রসেস লিক করছে।
আমার রাস্তা এই মুহূর্তে একটাই।
সিস্টেম বানাতে AI লাগাই। সিস্টেম চালাতে না।
n8n-এ একটা ওয়ার্কফ্লো বানিয়ে রাখি। ট্রিগার ছাড়া AI জাগে না। ট্রিগার এলে AI কাজ করে। কাজ শেষে ঘুমায়।
ডিপ্লয়মেন্টের পরে টোকেন খরচ অনেক কমে এসেছে।
মাসে $20-এর মধ্যে ৬ হাজার ট্রানজেকশন? সম্ভব। কিন্তু শুধু তখনই - যখন AI সিস্টেম চালাচ্ছে না, সিস্টেম বানিয়ে দিয়েছে।
এখনো বানাচ্ছেন? ROI ধীরে আসবে। স্বাভাবিক।
সিস্টেম লাইভ কিন্তু এখনো টোকেন পুড়ছে চব্বিশ ঘণ্টা? এটা স্কেলিং না।
পাইপে ছিদ্র থাকলে পাম্প বড় করলে কাজ হয় না। আগে ছিদ্র বন্ধ করতে হয়।
চব্বিশ ঘণ্টা যন্ত্রের কামলা খাটা আমাকে ইমপ্রেস করে না।
কম টোকেনে বেশি কাজ - এটাই আসল মুন্সিয়ানা। বাংলাদেশে বসে ডলারে বিল দিচ্ছেন। সেই বিলটা যত কম রাখা যায়, তত ভালো।
তারপর AI-কে ছুটি দিন।
লেখকঃ মেশিন লার্নিং ও টেলিকম বিশেষজ্ঞ ও লেখক