আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬

প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা: এখনই প্রতিরোধ ও প্রশমনের সময়

অধিকার, ন্যায় ও কর্মের সমন্বয়েই গড়ে উঠুক ডিজিটাল নিরাপদ বাংলাদেশ

প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা: এখনই প্রতিরোধ ও প্রশমনের সময়
৮ মার্চ, ২০২৬ ১৪:০৫  

প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের শুধু একটি দিন স্মরণ করিয়ে দেয় না, বরং নারী অধিকার, মর্যাদা, সমতা ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসকে নতুন করে সামনে আনে। ১৯০৮ সালে নিউইয়র্কে নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কম কর্মঘণ্টা ও ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলন থেকে শুরু করে আজকের বৈশ্বিক নারী অধিকার আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে, কোনো অর্জনই সহজে আসে না। প্রতিটি অধিকার লড়াই করে আদায় করতে হয়, প্রতিটি অগ্রগতি টিকিয়ে রাখতে হয় সচেতনতা, সংগঠন ও নীতিগত প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে।

বাংলাদেশও এই পথচলার বাইরে নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই এ দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। সংবিধানে নারী-পুরুষের সমঅধিকার, সমমর্যাদা ও বৈষম্যহীনতার নীতি স্বীকৃত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, পোশাকশিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রশাসন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নারীর অগ্রগতি আজ দৃশ্যমান। বাংলাদেশের নারীরা কেবল পরিবারের ভরসা নন, তাঁরা অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের অন্যতম চালিকাশক্তি।

কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতাও সামনে এসেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের পথে প্রযুক্তির বিস্তার যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি নতুন ধরনের সহিংসতারও জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা বা টিএফজিবিভি আজ নারীর নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, মানসিক সুস্থতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সামাজিক মর্যাদার ওপর গুরুতর হুমকি হয়ে উঠেছে।

এই সহিংসতা কেবল ফেসবুকে অপমানজনক মন্তব্য, ইনবক্সে হুমকি বা ভুয়া আইডি খুলে হয়রানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে রয়েছে অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, সাইবার স্টকিং, ডিজিটাল নজরদারি, গোপন রেকর্ডিং, জিপিএস ট্র্যাকিং, চরিত্রহনন, পরিচয় চুরি, এমনকি প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্র ব্যবহার করে নারীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। অর্থাৎ এটি এমন এক সহিংসতার রূপ, যা অনলাইন ও অফলাইন, দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নারীর জীবনকে আতঙ্ক, অপমান ও অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সহিংসতাকে এখনও অনেকেই “অনলাইন ঝামেলা” বলে হালকাভাবে দেখেন। কিন্তু এর প্রভাব গভীর। একটি কিশোরী স্কুলে যেতে ভয় পেতে পারে, একজন ছাত্রী সামাজিক অপমানের চাপে ভেঙে পড়তে পারে, একজন কর্মজীবী নারী চাকরি হারানোর আশঙ্কায় নীরব থাকতে পারেন, একজন নারী সাংবাদিক বা অধিকারকর্মী মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করতে বাধ্য হতে পারেন। প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত সহিংসতা তাই কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি নারীর নাগরিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রকে সংকুচিত করে, গণতান্ত্রিক পরিসরকে দুর্বল করে এবং সমাজে ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সমস্যাটি আরও জটিল। একদিকে ডিজিটাল ব্যবহারের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং অধিকার বিষয়ে সচেতনতা এখনো অসম। শহর ও গ্রামের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের পার্থক্য যেমন আছে, তেমনি নারী ও পুরুষের মধ্যে ডিজিটাল সক্ষমতার বৈষম্যও রয়েছে। অনেক পরিবারেই মেয়েদের প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে নিয়ন্ত্রণ বেশি, কিন্তু সুরক্ষা বিষয়ে শিক্ষা কম। ফলে মেয়েরা ঝুঁকিতে পড়ে, কিন্তু নিজেদের রক্ষা করার কৌশল জানে না।

এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন সপ্তাহ ২০২৬-এ প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা: এখনই প্রতিরোধ ও প্রশমনের সময় অধিকার, ন্যায় ও কর্মের সমন্বয়েই গড়ে উঠুক ডিজিটাল নিরাপদ বাংলাদেশ বিষয়টি সামনে আনা অত্যন্ত সময়োপযোগী। এটি কেবল একটি থিম নয়, বরং বর্তমান বাংলাদেশের একটি জরুরি সামাজিক ও নীতিগত প্রশ্ন। কারণ নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ ছাড়া নারী ক্ষমতায়ন, টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায় বা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের কথা পূর্ণভাবে বলা যায় না।

বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন, সংক্ষেপে বিএনএনআরসি, দীর্ঘদিন ধরে নারীর তথ্যপ্রাপ্তি, মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত ক্ষমতায়নে কাজ করে আসছে। এই প্রচেষ্টা নারীর সুরক্ষা ও ক্ষমতায়নের পাশাপাশি এসডিজি-৫ এবং এসডিজি-১৬ অর্জনের পথও শক্তিশালী করছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলা, বিশেষ করে বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা ও ময়মনসিংহে মাঠপর্যায়ের কাজ ও সংলাপ থেকে যে অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে, তা আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট চিত্র হাজির করে। তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতার ঘাটতি, অভিযোগ করতে ভয়, বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতা, ডিজিটাল আলামত সংরক্ষণে দুর্বলতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব নারীদের নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলছে।

এই সংকট মোকাবিলায় তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে দেখতে হবে: অধিকার, ন্যায় এবং কর্ম।

প্রথমত, অধিকার। নারীর ডিজিটাল অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি ও চর্চা করতে হবে। একজন নারী অনলাইনে নিরাপদে কথা বলবেন, মতপ্রকাশ করবেন, যোগাযোগ করবেন, শিখবেন এবং কাজ করবেন, এটি কোনো দয়া নয়, তার অধিকার। ডিজিটাল স্পেসকে পুরুষ-প্রাধান্যশীল ভয়ভিত্তিক ক্ষেত্র হতে দেওয়া যাবে না। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কমিউনিটিভিত্তিক কর্মসূচিতে ডিজিটাল আচরণবিধি, গোপনীয়তা, সম্মতি, অনলাইন নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল নাগরিকত্ব বিষয়ে শিক্ষা চালু করতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরীদের সুরক্ষায় পরিবার, শিক্ষক এবং স্থানীয় সমাজকে সম্পৃক্ত করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, ন্যায়। আইনি প্রতিকার ভুক্তভোগী-বান্ধব না হলে অধিকার কাগজেই থেকে যায়। অনেক নারী অভিযোগ করতে গিয়ে দ্বিতীয়বার হেনস্তার শিকার হন। কোথায় অভিযোগ করবেন, কীভাবে ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করবেন, কোন আইন প্রযোজ্য হবে, কতদিনে প্রতিকার পাবেন, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না থাকলে ন্যায়বিচার দূরবর্তী হয়ে যায়। জেলা পর্যায়ে লিগ্যাল এইড ব্যবস্থায় টিএফজিবিভি-কে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, ভুক্তভোগীদের জন্য নিবেদিত সহায়তা ডেস্ক চালু করা, পুলিশ, আইনজীবী, প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া, এবং কাউন্সেলিং ও মনোসামাজিক সহায়তা যুক্ত করা এখন জরুরি।

তৃতীয়ত, কর্ম। শুধু আলোচনা করে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি কোম্পানি, ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী, মোবাইল অপারেটর, ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের গণশুনানিতে টিএফজিবিভি-কে অন্তর্ভুক্ত করা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সম্পাদক ও মিডিয়া গেইটকিপারদের সংবেদনশীল করা, এবং নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর নিয়মিত কর্মসূচিতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে টিএফজিবিভি-র প্রবণতা, ঘটনা ও প্রতিকার নিয়ে বার্ষিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে নীতিনির্ধারণ আরও বাস্তবভিত্তিক হবে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, নারীর অধিকার কোনো আলাদা খাতের বিষয় নয়; এটি সমাজের ন্যায়, রাষ্ট্রের মানবিকতা এবং উন্নয়নের মানদণ্ড। আজকের বাংলাদেশে নারীর অগ্রযাত্রা বাস্তব, কিন্তু তার নিরাপত্তাও হতে হবে বাস্তব। ডিজিটাল অগ্রগতি যদি নারীর জন্য ভয়, অপমান ও নীরবতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই অগ্রগতি অসম্পূর্ণ।

তাই এখনই সময় স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ুক, কিন্তু তার সঙ্গে বাড়ুক দায়বদ্ধতা। ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারিত হোক, কিন্তু তার সঙ্গে শক্তিশালী হোক নিরাপত্তা, বিচার ও মর্যাদার সুরক্ষা। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬-এর অঙ্গীকার হোক এই: নারীর জন্য ডিজিটাল জগৎ হবে নিরাপদ, সম্মানজনক এবং সহিংসতামুক্ত।

সুরক্ষিত হোক ডিজিটাল মাধ্যম। জয় হোক নারীর সমঅধিকারের।


লেখকঃ  প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এনজিও নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) এবং বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক অ্যাম্বাসাডর।


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।