মধ্যরাতে উত্তাল বুয়েট

ধর্ষণের অভিযোগে বুয়েট শিক্ষার্থী সাময়িক বহিষ্কার

ধর্ষণের অভিযোগে বুয়েট শিক্ষার্থী সাময়িক বহিষ্কার
২২ অক্টোবর, ২০২৫ ০২:৩৩  

২২ অক্টোবরের শুরুতেই উত্তাল ছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ক্যাম্পাস। যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের অভিযোগে বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (ইইই) বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ২১তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থীকে গ্রেফতারের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে বুয়েট ক্যাম্পাস। মূলত  রাত ১১টার দিকে ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার ও স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি জানান।

পরে গুরুতর অপরাধের অভিযোগে আহসানউল্লাহ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী শ্রীশান্ত রায়কে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) দিনগত রাত সাড়ে ১২টায় বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। 

অভিযোগ রয়েছে, শ্রীশান্ত এক মুসলিম ছাত্রীকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ধর্ষণ করেন এবং পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রেডিটে বিষয়টি নিয়ে গর্ব করেন। এছাড়া তিনি বোরকা, হিজাব ও নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বুয়েট ক্যাম্পাসে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

রাতেই ওই শিক্ষার্থীর শাস্তির দাবিতে অনড় হন তারই সতীর্থরা। রাত ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা অভিযুক্ত ওই শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল ও ধর্ষণ মামলায় গ্রেফতার করার দাবিতে বুয়েট কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সংলগ্ন ডিএসডব্লিউ ভবনের (ছাত্রকল্যাণ পরিদফতর) সামনে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠে বুয়েট ক্যাম্পাস। 

এসময় শিক্ষার্থীরা ‘ধর্ষকের ঠিকানা, এই বুয়েটে হবে না’, ‘ধর্ষকদের বিরুদ্ধে, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘বিচার বিচার বিচার চাই, ধর্ষকের বিচার চাই’সহ  নানা স্লোগান দেন। তখন বিক্ষোভকারীদের বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক (ডিএসডব্লিউ) অধ্যাপক এ কে এম মাসুদ  শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি বহিষ্কার আদেশ জারি করেছে। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী শ্রীশান্ত রায়কে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

তবে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা এই ঘোষণা শোনার পর ‘না না’ বলে ওঠেন। তাঁরা ওই শিক্ষার্থীর স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি তোলেন। তখন অধ্যাপক এ কে এম মাসুদ বলেন, ‘স্থায়ীভাবে ছাত্রত্ব বাতিল করার ক্ষমতা আমার নেই, আমি উপাচার্যের নির্দেশক্রমে এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছি। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তার নামে মামলা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হবে এবং তাকে গ্রেফতার করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘যদিও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে মামলা করার কথা, তবে আমরা ছাত্রদের কথা বিবেচনায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেই মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

অভিযুক্ত শ্রীশান্ত রায়ের বিরুদ্ধে বুয়েট ২১ ব্যাচের প্রকাশিত ধর্ষণ ও প্রমাণে বলা হয়- 

১) রেডিট ব্যবহারকারী নিজেকে ‘বুয়েট ইইই-২১’-এর শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

২) একাধিক মন্তব্যে সে বাসইউস ব্র্যান্ডের এয়ারবাডস ব্যবহার করেন বলে উল্লেখ করেছেন, যা সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর সঙ্গেও মেলে।

৩) রেডডিট আইডি থেকে জানা যায়, সে জুন মাসে মুসটাং,নেপাল সফর করেছেন— একই সময়ে (৩ জুন) শ্রীশান্ত রায় তার ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়ায় মুসটাং থেকে ছবি পোস্ট করেছেন।

৪) ওই রেডডিট আইডির অশালীন মন্তব্যগুলোর ভাষা, টোন ও লেখনশৈলী বহু সহপাঠী শনাক্ত করেছেন, যা অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর স্বভাবগত লেখনভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

৫) যখন বুয়েট শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বর্জনের পক্ষে সম্মিলিত স্বাক্ষর প্রদান করেন, তখন একমাত্র সেই কাগজে স্বাক্ষর করেননি, যা তার দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘এসব প্রমাণ ও মিলের ভিত্তিতে আমরা দৃঢ়ভাবে সন্দেহ করছি যে, আমাদের ব্যাচের শ্রীশান্ত রায়ই ওই রেডডিট আইডির ব্যবহারকারী এবং সে-ই সচেতনভাবে নারীদের প্রতি অশালীন, লাঞ্ছনাকর ও হয়রানিমূলক আচরণ করেছেন।’

এছাড়া ‘যদি ওর কাছ থেকে আগেও এরকম কোনো আচরণের শিকার হয়ে থাকে বা কোনো প্রমাণ থেকে থাকে, সে যেন গোপনীয়তা বজায় রেখে হলেও সেটা প্রকাশ্যে আনে।’

পরে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ছাত্রকল্যাণ পরিদফতরের পরিচালক অধ্যাপক ড. এ কে এম মাসুদ লিখিত বিজ্ঞপ্তিতে সাময়িক বহিষ্কারাদেশ জারি করেন। 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘এতদ্বারা সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই বিভাগের ‘২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী শ্রীশান্ত রায় (আইডি: ২১০৬১৬৯)-এর ছাত্রত্ব সাময়িকভাবে বাতিল করা হলো।’