গ্রামীণফোনের ১৫৯ জন স্থায়ী কর্মচারীর চাকরিচ্যুতি
কর্মী ছাঁটাই ইস্যুর তৃতীয় দফা সালিশও পণ্ড; পরের সালিশ ১৭ নভেম্বর
করোনার অতিমারিতে লকআউটের মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করা ১৫৯ কন কর্মীর বিষয়ে তৃতীয় দফায় শ্রম অধিদফতরের সালিশি বৈঠকে হাজির হতে হয়েছে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষকে। কর্মী ছাঁটাইয়ের বৈধতা নিয়ে অপারেটরটির যুক্তি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে খারিজ হয়ে যাওয়ায় ২১ অক্টোবর, সোমবার রাজধানীর বিজয়নগরস্থ শ্রম অধিদফতরের বোর্ডরুমে এই সালিসি বৈঠক হয়েছে। তবে এসময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও শেষ পর্যায়ে বাগ-বিতণ্ডার মধ্য দিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয় ত্রিপক্ষীয় এই সালিশী বৈঠকটি। ফলে পরবর্তী বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ নভেম্বর।
সালিশে সমঝোতাকারী পক্ষে শ্রমিক অধিদফতরের (DOL) ট্রেড ইউনিয়ন ও সালিশি শাখার পরিচালক শামীমা সুলতানা বারী, ট্রেড ইউনিয়ন শাখার উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন এবং সালিশি ও প্রশিক্ষণ বিভাগের উপ-পরিচালক মিতসু সাওলিনসহ পাঁচ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
অপরদিকে অভিযুক্ত গ্রামীণফোনের পক্ষে অপারেটরটির হেড অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস (IR) আওলাদ হোসেনের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিলেন।
আর বাদী পক্ষ, গ্রামীণফোন এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (CBA) প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক, সেক্রেটারি মাতুজ আল কাদরীসহ ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিলেন।
সালিশ নিষ্পতি না হওয়ায় বৈঠকে উপস্থিত প্রতিনিধি ছাড়াও বাইরে অপেক্ষমান ছাঁটাই হওয়া কর্মীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের প্রশ্ন “গ্রামীণফোন গত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে আইন লঙ্ঘন ও অসৎ শ্রম আচরণ করেই যাচ্ছে। এইভাবে আর কতদিন তারা এই অন্যায় চালিয়ে যাবে?”
তবে চার বছর ধরে অধিকার ফিরে পাওয়ার আন্দোলনে নিয়োজিত শ্রমিকরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন — “আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, এবং আমরা আইনগত পথেই আমাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করব।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রামীণফোন জানায়, " মহামান্য আদালত থেকে কোনো কর্মীকে পুনর্বহালের জন্য এ ধরনের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। মহামান্য আদালতের রায় অনুযায়ী এই বিষয়ে সালিসী কার্যক্রম চলতে পারে। এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতেই আজ শ্রম অধিদপ্তরে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শ্রম অধিদপ্তরের মধ্যস্ততায় সালিসী কার্যক্রম চলমান অবস্থায় কোনো ধরনের মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।"
প্রসঙ্গত, করোনার অতিমারিতে ২০২০ সালের ৩১ মে ১৮০ স্থায়ী কর্মীকে লকআউট করে Job description less kore গ্রামীণফোন। ওই বছরেরই ৩১ ডিসেম্বর এই JD less কর্মীদের স্বীয় কাজে পুণর্বহালের জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপুট উত্থাপন করেন গ্রামীণফোন এমপ্লিয়জ ইউনিয়ন (জিপিইউ)। কিন্তু তখন প্রতিষ্ঠানে একাধিক ইউনিয়েন রয়েছে যুক্তি দেখিয়ে জিপিইউ এর আপত্তি খারিজ করে গ্রামীণফোন। এরপর ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি একই আপত্তি শ্রম অধিদফতরের সালিশি শাখায় উত্থাপন করে করে ইউনিয়ন বলেন যে, গ্রামীণফোন শ্রম আইনের ১৯১(১)(ঠ) ভঙ্গ করে ১৮০ কর্মীকে কাজ থেকে বিরত রেখেছে বলে নালিশ করে। একই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি শ্রম অধিফতর ডিসপুট খারিজ করে দেয়। এরপর বিষয়টি গড়ায় হাইকোর্টে। অধিদপ্তরের খারিজের বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করে ভুক্তভোগী কর্মীদের ইউনিয়ন। ওই বছরেরই ২০ জুন গভীর রাতে, ১৫৯ জন স্থায়ী কর্মচারীকে শ্রম আইনের ২২৮ অমান্য করে চাকরিচ্যুত করা হয়। আইন অমান্য করে চাকরিচ্যুত করা শ্রমিক পক্ষের উপর গ্রামেনফোনের অসৎ শ্রম আচরণ (Unfair Labour Practice) স্পষ্ট হয়।
এছাড়া, শ্রম বিধিমালা ২০১৫ এর বিধি ১৬(৫) অনুযায়ী স্থায়ী প্রকৃতির পদে অস্থায়ী বা ঠিকাদারি কর্মী নিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও, গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ সেই আইন লঙ্ঘন করে স্থায়ী কাজে ঠিকাদারি জনবল ব্যবহার করছে বলেও অভিযোড় উত্থাপন করা হয়।
গ্রামীণফোন এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন উক্ত মামলাটি হাইকোর্টে হেরে গেলে অ্যাপিলিয়েড ডিভিশনে আবেদন করে তারা। আপিল বিভাগ ২০১২ ও ২০১৩ সালেগ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ যে দুইটি ইউনিয়নের যুক্তিতে ডিসপিউট খারিজ করে সেগুলোর তিন মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে আদেশ প্রদান করেন। ওই ইউনিয়নগুলো হলে- গ্রামীণফোন লিমিটেড শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের এবং গ্রামীণফোন লিমিটেড শ্রমিক ইউনিয়ন।
হাইকোর্ট রায়ে এ ধরনের আউটসোর্স ইউনিয়ন অবৈধ বলে রায় আছে। এসময় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ডিসপিউট আমলে নেয়। ফলে ২০২৩ সালের জুন মাসে শ্রমঅধিদপ্তরের সালিশি শাখাকে ডিসপুটটি পুণর্ম্যূল্যায়নে করতে নির্দেশনা দেন আপিল বিভাগ। সেই রায়ের আলোকে সালিশি শাখা আপোষ মিমাংসার জন্য দুইটি চিঠি দেন।
কিন্তু গ্রামীণফোন ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে সেই সালিশি চিঠির আপিল বিভাগের রায় অপব্যাখ্যা ( misinterprete)করে কল করা হয়েছে উল্লেখ করে হাই কোর্ট থেকে কনসিলিয়েশনের উপর স্টে অর্ডার নেন। সেই মামলার চূড়ান্ত রায়ে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে এবং আপিল বিভাগের রায়ে জুলাই মাসে শ্রম অধিদফতরের সালিশি শাখার করা সালিশির চিঠি দু,টি বৈধ ছিলো বলে আদেশ দেন। আদেশ প্রাপ্তির পর এই মাসের ১২ই অক্টোবর তৃতীয় সালিশি সভা অনুষ্ঠিত হলো।
তবে এর আগে ২০২৩ সালের ৮ নভেম্বর প্রথম সালিশে অনুপস্থিত ছিলো গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ। দ্বিতীয় দফায় ২০২৩ বছরের ২৩নভেম্বরের সালিশে সময় ক্ষেপন করে আদালতে গিয়েছিলো বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
এমন একজন ভুক্তভোগী জানান, কর্মী পুণর্বহালের আদেশ কোর্ট সরাসরি দেননি। বলেছেন, কনসিলিয়েশন ভ্যালিড। কনসিলিয়েশন ভ্যালিড হলে ২২৮ এর প্রটেকশন পাওয়া যাবে। গ্রামীণফোন ১৫৯ কে চাকরিচ্যুত করেছে সেটা অবৈধ। আর ধারা ২২৮ বলছে: যেসব ক্ষেত্রে কোনো শ্রমসংক্রান্ত বিরোধ (industrial dispute) বা তার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রক্রিয়া চলছে — সেই সময় নিরাপদভাবে বলা হয়েছে, নিয়োগকর্তা সাধারণভাবে শ্রমিককে চাকরিচ্যুত বা বরখাস্ত করতে পারবে না যতক্ষণ না ওই বিরোধ-প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায়। ফলে সালিশের মাধ্যমেই আমাদের সঙ্গে করা অন্যায়ের নিষ্পত্তি করতে হবে গ্রামীণফোনকে।
এদিকে জিপিইউ জানায়, স্থায়ী কর্মচারীকে জব ডেসক্রিপশনলেস করার ঘোষণা ও পরবর্তী ছাঁটাই কেবল জাতীয় শ্রম আইন নয়, বরং আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮–এরও সরাসরি লঙ্ঘন।
“বহুজাতিক কোম্পানি হিসেবে গ্রামীণফোনের উচিত ছিল আন্তর্জাতিক শ্রম মান ও মানবাধিকার সম্মান করা, কিন্তু তারা বারবার আদালতের রায় ও শ্রম আইনের মৌলিক নীতিমালা অমান্য করেছে,” — বলেন ইউনিয়ন নেতা মোঃ ইমরান হোসেন।



