সার্ক কর্মশালায় বাংলাদেশের মডেল

ভিআরে প্রত্নঐতিহ্য সংরক্ষণে আহমেদ জামান

  • ভিআর ও ফটোগ্রামেট্রিতে ঐতিহ্য সংরক্ষণের মডেল উপস্থাপন
  • ষাট গম্বুজ ও পানাম নগর ডিজিটালি সংরক্ষণ
  • পাহাড়পুরের ডিজিটাল সংস্করণ তৈরির কাজ চলছে

ভিআরে প্রত্নঐতিহ্য সংরক্ষণে আহমেদ জামান
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:৪৭  
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০১  

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, সময়ের ক্ষয় এবং যথাযথ প্রামাণ্য নথির অভাবে দক্ষিণ এশিয়ার বহু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তাদের মূল রূপ। এসব ঐতিহাসিক স্থাপনার কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সেগুলোর অবিকল প্রতিরূপ সংরক্ষণের একটি প্রযুক্তিগত মডেল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের আহমেদ জামান সঞ্জিব।

ভার্চুয়াল মিউজিয়াম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ জামান বাংলাদেশ থেকে রিসোর্স পারসন হিসেবে অংশ নেন শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক হাইব্রিড কর্মশালায়। ‘সার্ক প্রমোটিং ডিজিটাল টেকনোলজি ফর প্রিজারভিং কালচারাল হেরিটেজ’ শীর্ষক কর্মশালাটি ১৬ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর সার্ক কালচারাল সেন্টারের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়।

কলম্বোর দক্ষিণ এশীয় সমবায় পরিবেশ কর্মসূচির সচিবালয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর কর্মশালার উদ্বোধন হয়। শ্রীলঙ্কার ডিজিটাল অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এরাঙ্গা বীরারত্নের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি। সম্মানিত অতিথি ছিলেন সেন্ট্রাল কালচারাল ফান্ডের মহাপরিচালক ড. নিলান কোরে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ডি. এম. সালাহউদ্দিন মাহমুদ, কাউন্সেলর মো. জন্নাতুল হাবিব এবং প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা কমোডর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। ভারতীয় হাইকমিশনের প্রথম সচিব রোশনি থমসন, মালদ্বীপের হাইকমিশনের প্রতিনিধি ইসমাইল মামধুহ, নেপালের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত বিজয় কুমার রাউত, নেপালের দ্বিতীয় সচিব সাগর ভান্ডারি এবং পাকিস্তানের হাইকমিশনার মেজর জেনারেল (অব.) ড. নায়্যার নাসিরসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।

এ ছাড়া দক্ষিণ এশীয় সমবায় পরিবেশ কর্মসূচির মহাপরিচালক নরবু ওয়াংচুক, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক ভারুনি মুথুকুমারানা, সার্ক বিভাগের পরিচালক সাসাঙ্গা নিকাপিটিয়া, পর্যটন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব টি. এম. জে. ডব্লিউ. থেন্নাকুন, বুদ্ধাসাসনা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নিরঞ্জলা ডি. গুনারত্না এবং এস. এল. ধাম্মিকা কে. বিজয়সিংহে উপস্থিত ছিলেন।

কর্মশালায় শ্রীলঙ্কার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিচালক ওয়ারুনা আলাহাকুন, প্রত্নতত্ত্বের স্নাতকোত্তর ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এস. এ. জয়াম্পথ, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের স্থাপত্য সংরক্ষণবিষয়ক নকশাবিদ ডব্লিউ. কে. ইউ. বিক্রমাসিংহে, জাতীয় জাদুঘরের বিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক মানোরি গুনাথিলাকে, সরকারি তথ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক ড. হার্শা আবেকুন এবং অস্পৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান চন্দ্রসোমা বিন্দুহেওয়াও অংশ নেন।

আন্তর্জাতিক কর্মশালায় আহমেদ জামানের উপস্থাপনার মূল বিষয় ছিল—কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ না করেও কীভাবে তার স্থাপত্য, কাঠামো, অলংকরণ ও পরিবেশকে ডিজিটালভাবে ধারণ করে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা যায়।

বাস্তব স্থাপনা থেকে ডিজিটাল প্রতিরূপ

আহমেদ জামানের উপস্থাপিত মডেলের প্রথম ধাপ হলো ড্রোন ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডিজিটাল ক্যামেরার মাধ্যমে ফটোগ্রামেট্রি। বিভিন্ন কোণ থেকে ধারণ করা বিপুলসংখ্যক ছবি বিশ্লেষণ করে স্থাপনার ত্রিমাত্রিক তথ্য তৈরি করা হয়। এতে ভবনের ক্ষুদ্র অংশ, কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য ও পৃষ্ঠের বিবরণ পর্যন্ত ডিজিটালভাবে নথিবদ্ধ করা সম্ভব।

এরপর ব্লেন্ডারসহ আধুনিক ত্রিমাত্রিক সফটওয়্যারের সাহায্যে ক্ষয়ে যাওয়া বা ধ্বংসপ্রাপ্ত অংশের ডিজিটাল পুনর্গঠন করা হয়। ঐতিহাসিক তথ্য ও সংগৃহীত দৃশ্যমান উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি করা এই ত্রিমাত্রিক মডেলে প্রয়োজন অনুযায়ী টেক্সচারও যুক্ত করা যায়।

তৃতীয় ধাপে আনরিয়েল ইঞ্জিন ব্যবহার করে তৈরি করা হয় ১:১ স্কেলের ইন্টারেক্টিভ ভার্চুয়াল পরিবেশ। ফলে দর্শনার্থী বা গবেষক বাস্তব স্থানে উপস্থিত না থেকেও একটি স্থাপনার ডিজিটাল পরিবেশে প্রবেশ করে সেটি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যৎ গবেষণা, শিক্ষা ও ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

বাংলাদেশের ঐতিহ্যে প্রয়োগ

ভার্চুয়াল মিউজিয়াম বাংলাদেশের উদ্যোগে ইতোমধ্যে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য ষাট গম্বুজ মসজিদ, পানাম নগর ও এগারো শিব মন্দিরসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন স্থাপত্যের ডিজিটাল সংরক্ষণ করা হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সোমপুর মহাবিহার বা পাহাড়পুরের ১:১ স্কেলের ইন্টারেক্টিভ ভার্চুয়াল পরিবেশ এবং ডিজিটাল টুইন তৈরির কাজ চলছে।

আহমেদ জামানের ভাষায়, প্রযুক্তির লক্ষ্য শুধু কোনো স্থাপনার ছবি বা ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করা নয়; বরং ঐতিহাসিক স্থাপনার যথাসম্ভব পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নথি তৈরি করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সেটির কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করা।

তিনি বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য হলো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অবিকল বাঁচিয়ে রাখা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ঐতিহ্যকে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরা।”

দক্ষিণ এশিয়ায় অভিজ্ঞতা বিনিময়

কর্মশালায় বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত মডেল উপস্থাপনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আহমেদ জামান বলেন, সার্ক কালচারাল সেন্টারের রিসোর্স পারসন হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার আমন্ত্রণ তাঁর জন্য সম্মানের। আয়োজক, আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকেও ভার্চুয়াল মিউজিয়াম বাংলাদেশের বাস্তব প্রয়োগভিত্তিক প্রযুক্তি—বিশেষ করে রিয়েলিটি ক্যাপচার ও ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল পুনর্গঠন—নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ পাওয়া গেছে।

তাঁর মতে, কর্মশালাটি শুধু বাংলাদেশের প্রযুক্তি উপস্থাপনের সুযোগই দেয়নি; দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণের বাস্তব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কেও জানার সুযোগ তৈরি করেছে। জলবায়ুজনিত ক্ষয় থেকে শুরু করে প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—বিভিন্ন দেশের সমস্যার ধরন ও সমাধান নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতবিনিময় হয়েছে।

আঞ্চলিক গবেষক, সংরক্ষণবিদ ও ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনায় মানসম্মত ডিজিটাল আর্কাইভ, ফটোগ্রামেট্রি প্রক্রিয়া এবং আন্তদেশীয় গবেষণা সহযোগিতার সম্ভাবনাও উঠে আসে। আহমেদ জামানের ভাষ্য, এসব আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশে তৈরি করা প্রযুক্তিগত কাঠামো আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

সামনে পাহাড়পুর, প্রশিক্ষণ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা

আগামী দিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে আহমেদ জামান জানান, ভার্চুয়াল মিউজিয়াম বাংলাদেশের ডিজিটাল ঐতিহ্যভান্ডার আরও সম্প্রসারণ করা হবে। এর তাৎক্ষণিক লক্ষ্য সোমপুর মহাবিহারের ১:১ স্কেলের ইন্টারেক্টিভ ভার্চুয়াল পরিবেশ ও ডিজিটাল টুইনের কাজ চূড়ান্ত করা।

এর পাশাপাশি আঞ্চলিক ও একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে ঐতিহ্য সংরক্ষণে যুক্ত পেশাজীবীদের জন্য ড্রোন ফটোগ্রামেট্রি ও ত্রিমাত্রিক পুনর্গঠনের প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।

তার মতে, প্রযুক্তি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হলে শুধু ডিজিটাল নথি তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতাও সংশ্লিষ্ট গবেষক, সংরক্ষণবিদ ও পেশাজীবীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

কলম্বোর এই সার্ক কর্মশালায় বাংলাদেশের ডিজিটাল ঐতিহ্য সংরক্ষণের মডেল সেই বৃহত্তর আঞ্চলিক আলোচনাকেই সামনে এনেছে—যেখানে ধ্বংসপ্রবণ স্থাপত্যকে কেবল অতীতের স্মৃতি হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার জন্য ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল সম্পদ হিসেবেও সংরক্ষণ করা সম্ভব।

//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমই/এমআইএসটি//