ডিজিটাল সহিংসতাই বাস্তব সহিংসতা: কৃত্রিম বিভাজনের ফাঁদ ও নাগরিক অধিকার

ডিজিটাল সহিংসতাই বাস্তব সহিংসতা: কৃত্রিম বিভাজনের ফাঁদ ও নাগরিক অধিকার
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:২২  
  • ডিজিটাল দুনিয়া থেকে অ্যাকাউন্ট বন্ধ বা লগ অফ করা কোনো স্থায়ী প্রতিকার নয়, বরং প্রকাশ্য নাগরিক জীবন থেকে উচ্ছেদ।
  • শারীরিক পদধ্বনি আর ডিজিটাল কমেন্টের মধ্যে শরীর বা কর্টিসল হরমোন কোনো পার্থক্য খোঁজে না; মানসিক আঘাত সমপর্যায়ের।
  • বিবিএস-এর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের ৮৯ শতাংশ নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তত একবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
  • কোনো দৃশ্যমান কালশিটে দাগের জন্য অপেক্ষা করে বিচার করতে গেলে ডিজিটাল অপরাধের গভীর সামাজিক আঘাত আড়াল থেকে যায়।
  • হেল্পলাইন ১০৯-এর কল রেকর্ড কেবল সংখ্যা নয়; জরুরি ভিত্তিতে রাষ্ট্র ও প্ল্যাটফর্মগুলোর সমন্বিত হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ডিজিটাল দুনিয়া থেকে 'লগ অফ' করা বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা কোনো প্রতিকার নয়; এটি মূলত একজন নাগরিককে তার প্রকাশ্য সামাজিক ও নাগরিক জীবন থেকে উচ্ছেদের নামান্তর।

সংবাদকক্ষ থেকে শুরু করে কিছু আদালতের এজলাসেও আজও একটি আপাত-নম্র কিন্তু মারাত্মক মানসিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়—যেখানে অনলাইন সহিংসতাকে অপেক্ষাকৃত 'লঘু' ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়: এটিকে হয়তো দুর্ভাগ্যজনক কিংবা কুৎসিত বলা হয়, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ‘সহিংসতা’ বলে গণ্য করা হয় না। আর এই সমস্যার প্রস্তাবিত দাওয়াই হিসেবে দেওয়া হয় স্ব-উদ্যোগী সমাধানের পরামর্শ—'পাসওয়ার্ড বদলে ফেলুন', 'অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করুন', কিংবা 'ট্রলদের পাত্তা দেবেন না'। এই উপদেশগুলো মূলত নারীদের রাজপথ ও রান্নাঘরে যুগ যুগ ধরে দেওয়া পুরোনো নিষেধাজ্ঞারই আধুনিক সংস্করণ: "ঘর থেকে বেরিয়ো না, ওই ঘর ছেড়ে চলে যাও।" অথচ সেই 'ঘর' বা প্রকাশ্য আঙিনাই আজ কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং, শিক্ষাঙ্গন, সাংবাদিকতা এবং রাষ্ট্রীয় রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু।

স্মার্টফোনের যুগ শুরুর বহু আগেই লিজ কেলি যৌন সহিংসতার ধারাবাহিক রূপরেখা (Continuum of Sexual Violence) নিয়ে লিখেছিলেন। সমকালীন বাস্তবতাকে তা আজও এক নির্মম নির্ভুলতায় চিত্রিত করে। এই ধারাবাহিক কাঠামোর মূল কথা কেবল যৌন নিপীড়নের মাত্রাভেদে অপরাধকে ছোট-বড় হিসেবে তালিকাভুক্ত করা নয়; বরং এটি দেখানো যে, সহিংসতার বহুমুখী রূপের একটাই উদ্দেশ্য—নারীদের মুক্ত বিচরণের পরিসর সংকুচিত করা এবং জনপরিসরে উপস্থিত থাকার মাশুল হিসেবে সাধারণ দর্শকমহলকে ভীতি প্রদর্শন করা। প্রযুক্তি-সহায়ক লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা (TFGBV) কখনোই সনাতন শারীরিক আঘাত বা চারদেয়ালে বন্দিত্বের বিকল্প নয়; বরং এটি ডিভাইসের পর্দা, বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম এবং সিন্থেটিক মিডিয়ার মাধ্যমে সেই নিপীড়নের ভৌগোলিক সীমানাকে আরও বিস্তৃত করে মাত্র। একজন রক্তমাংসের অন্ধ অনুসারী (Stalker) আর সুসংগঠিত ‘ডক্সিং’ প্রচারণা কোনো আলাদা জগৎ নয়; এগুলো মূলত একই শিকারি বা একই চক্রের ব্যবহৃত দুটি ভিন্ন প্রবেশদ্বার।

মানুষের শরীর এই মানসিক ক্ষতের প্রতিটি আঘাত অনুভব করে। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। রক্তের কর্টিসল হরমোন একটি হিংস্র শারীরিক পদধ্বনি আর একটি বিদ্বেষমূলক কমেন্টের মধ্যে কোনো তফাত করে না। ফলে একজন নারী প্রথমে ডিজিটাল ফিড থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন, তারপর সংবাদপত্রের বাইলাইন থেকে সরে দাঁড়ান এবং একপর্যায়ে রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রার্থিতা থেকেই পিছিয়ে যান। ইউএন উইমেন (UN Women)-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—৩৮ শতাংশ নারী ব্যক্তিগতভাবে অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং ৮৫ শতাংশ নারী এর প্রত্যক্ষদর্শী; সহিংসতার আশঙ্কায় ৪০ শতাংশের বেশি নারী আত্ম-নজরদারি বা নিজস্ব মতপ্রকাশ সংকুচিত করেছেন এবং প্রতি পাঁচজনে একজন পেশাগত প্রকাশ্য আলোচনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) এক তথ্যে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের মধ্যে ৮৯ শতাংশই অন্তত একবার অনলাইনে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। অথচ তাদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনে একজনও আইনি প্রতিকার বা অভিযোগের পথ বেছে নেন না। যে ক্ষত এত সর্বব্যাপী এবং যার অভিযোগের হার এত কম, তা নিছক কোনো অনলাইন কনটেন্টের সমস্যা নয়—এটি একটি গভীর নাগরিক অধিকার সংকট।

আমাদের সনাতন আইনি কাঠামো আজও সেই সেকেলে ফরেনসিক যুক্তির ওপর হোঁচট খাচ্ছে—যেখানে মনে করা হয়, কোনো অপরাধের দৃশ্যমান শারীরিক চিহ্ন না থাকলে তা অপরাধ নয়। যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কারও মুখাবয়ব বা সিন্থেটিক ছবি তৈরি করা হয়, তখন বহু তদন্ত কর্মকর্তা কিংবা স্বজন আজও প্রশ্ন তোলেন—ক্ষতিটা কি সত্যিই “বাস্তব”? এই নির্লজ্জ প্রশ্নটিই প্রমাণ করে আমরা এক কৃত্রিম ও মিথ্যা বিভাজনের ফাঁদে বন্দি। এই অপরাধের মূল ক্ষত লুকিয়ে থাকে ছবিটির অবাধ ছড়িয়ে পড়ায়, পরিবারের সাথে সম্মান রক্ষার দেনদরবারে, চাকরি হারানোর মর্মান্তিকতায় এবং সন্তানের সামনে ছড়িয়ে পড়া সেই কলঙ্কিত নথির সামাজিক যন্ত্রণায়। যে বিচারব্যবস্থা কেবল চামড়ার ওপর ক্ষতের কালশিটের অপেক্ষা করে, তা বরাবরই এই ডিজিটাল সহিংসতার সারবত্তা অনুধাবনে ব্যর্থ হবে।

বাংলাদেশে জাতীয় হেল্পলাইন ‘১০৯’-এ প্রতিদিন অনলাইন ব্ল্যাকমেলিং, অনুমতিহীন অন্তরঙ্গ ছবি প্রকাশ, পরিচয় জালিয়াতি (Impersonation) এবং সেক্সটরশনের শত শত ফোন আসছে। যারা এই বিপদে কল করছেন, তারা নিছক কোনো ব্যক্তিগত মেজাজ বা অনুভূতির বর্ণনা দিচ্ছেন না; তারা বর্ণনা করছেন এমন এক সুপরিকল্পিত নির্মম চক্রের, যার চূড়ান্ত পরিণতি রূপ নেয় কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা প্রকাশ্য রাজপথ থেকে তাদের পুরোপুরি ছিটকে পড়ার মাধ্যমে। যে রাষ্ট্র কেবল ভুক্তভোগীর এই আর্তনাদ কলরেকর্ডে নথিভুক্ত করে কিন্তু অপরাধের মূল চক্রকে ভেঙে দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলে না, সেই রাষ্ট্র প্রকারান্তরে এই মিথ্যা বিভাজনকেই নিজস্ব সরকারি নীতি হিসেবে মেনে নেয়।

যতদিন না দেশের আইন, গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় নীতিমালা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর বিধিমালার কেন্দ্রবিন্দুতে ডিজিটাল সহিংসতাকে উন্মুক্ত নাগরিক চলাচলের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হবে, ততদিন এর প্রতিকার কেবল ভুক্তভোগী নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক ব্যক্তিগত দায় হিসেবেই রয়ে যাবে। ‘ঢাকা ডায়ালগ’-এ এই সম্মিলিত সংজ্ঞায়নের জোর দাবি মূলত ইন্টারনেটের 'শূন্যতার তত্ত্ব' (Vacuum theory) কবর দেওয়ার এক সাহসী প্রচেষ্টা। ডিজিটাল দুনিয়ায় কোনো শূন্যতা নেই; এখানে কেবল এমন কিছু নাগরিক পরিসর রয়েছে, যেখান থেকে প্রতিদিন নারীদের মুখ বুজে বেরিয়ে যেতে বলা হচ্ছে।


লেখক || ধান উদ্ভাবন কর্মকর্তা ও মহাপরিচালক, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। তিনি একজন কূটনীতিক ও উদ্ভাবন কৌশলবিদ; কাজ করছেন বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুশাসনের সন্ধিক্ষণে। যুক্ত রয়েছেন Digital@UNGA, শিক্ষা ও এআই, সার্বভৌম কম্পিউট এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির নীতিগত চর্চায়।


এডিটরস নোট || আলোচ্য নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত ও তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ লেখকের নিজস্ব। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নাগরিকের অধিকার রক্ষা, লিঙ্গবৈষম্য নিরসন এবং জনসচেতনতা তৈরির অংশ হিসেবে লেখাটি সম্পাদকীয় প্রমিতকরণসহ প্রকাশ করা হলো।



দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।