লক্ষ্য ট্রিলিয়ন ডলারের ডিজিটাল অর্থনীতি
কূটনীতির কেন্দ্রে এআইকে স্থান দিচ্ছে বাংলাদেশ
- আগামী ১২ মাসের মধ্যে নিজস্ব সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা চালু করবে সরকার
- ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে জ্ঞানভিত্তিক কর্মী তৈরিতে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে
- প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে নারী নিরাপত্তা ও সরকারি সেবায় সমন্বিত আন্তঃকার্যক্ষমতা চালুর তাগিদ
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও রোবোটিক্সের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তি-কূটনীতি ও সরকারি সেবার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নিয়েছে উন্নত অ্যালগরিদম ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি। শুধু প্রযুক্তি আমদানিকারক নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্ভাবক ও প্রযুক্তির নিট সরবরাহকারী হিসেবে দেশকে নেতৃত্বশীল অবস্থানে নিতে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের সূচনা করেছে বাংলাদেশ।
৮ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার ঢাকার সেগুনবাগিচাস্থ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অডিটোরিয়ামে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট (জিআইইউ) ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে “AI and Innovation Dialogue” শীর্ষক জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
২০২৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত “Trade, Growth and Economic Diplomacy” সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশন থেকে সূচিত ধারাবাহিক সংলাপের এটি তৃতীয় পর্ব। এ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশের প্রযুক্তি-কূটনীতি ও নাগরিক সেবার কেন্দ্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে স্থান দেওয়ার জাতীয় অগ্রাধিকার দৃঢ়ভাবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ও গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের প্রধান মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বহুমুখী সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ (হোল-অব-গভর্নমেন্ট অ্যাপ্রোচ) অপরিহার্য। তিনি দেশের প্রথম তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) নীতি প্রণয়নে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদান স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা দিয়ে তিনি সরকারি সেবার প্রতিটি স্তরে নিরবচ্ছিন্ন আন্তঃকার্যক্ষমতা (ইন্টারঅপারেবিলিটি) নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রেহান আসিফ আসাদ সর্বস্তরের জনগণের জন্য ডিজিটাল যন্ত্র ও কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমান সরকারের বাস্তবমুখী নীতির ফলে দেশ শিগগিরই অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ফিচার ফোন উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবনকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি জানান, উচ্চগতির ও নিরাপদ কানেক্টিভিটি অবকাঠামো নির্মাণে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আগামী ১২ মাসের মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (সভরেইন এআই) অবকাঠামো কার্যকর হবে, যার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং চিপ ও মেমরি ব্লক ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনে এআই হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। তিনি জানান, পাট, খেলাধুলা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি প্রযুক্তিকে অর্থনৈতিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রযুক্তি স্টার্টআপে সহায়তা ও অর্থনৈতিক কূটনীতিকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। সম্প্রতি সিলিকন ভ্যালি সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি ঢাকা ও সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমিয়ে আনার আহ্বান জানান। সেখানে এনভিডিয়া, অ্যাপল, সিসকোর মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কম্পিউটিং শক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও গবেষণা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং প্লাগ অ্যান্ড প্লে-এর সঙ্গে এআই সেন্টার অব এক্সিলেন্স মূল্যায়নের সম্মতিপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে।
কোডার হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতায় প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ ও সবার জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিসর তৈরি করা অন্যতম অগ্রাধিকার। এই ভাবনার আলোকে ‘কোড হোপ’ গ্রন্থের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, এআই প্রযুক্তি যেন কোনোভাবেই মানুষের বিকল্প না হয়, বরং তা মানুষের সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়াবে। রূপগঞ্জের জামদানি তাঁতি যেন মিলানের বুটিকে ইতালীয় ভাষায় নিজের পণ্য সরাসরি তুলে ধরতে পারেন কিংবা ফরিদপুরের একজন কৃষক যেন স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম হন—প্রযুক্তির এই জনবান্ধব রূপ নিশ্চিত করতে হবে। নিজস্ব সার্বভৌম ডেটা সেন্টার ও মাতৃভাষাভিত্তিক বাংলা এআই গড়ে তোলার বিকল্প নেই বলেও জানান তিনি।
পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা তৈরি পোশাক খাত ও প্রবাসী আয় দীর্ঘকাল দেশের অর্থনীতির ডিএনএতে ‘ডাবল হেলিক্স’ হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্ধারিত ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে এখন প্রয়োজন তৃতীয় একটি সূত্র, যা হলো ‘জ্ঞানভিত্তিক কর্মী’ (নলেজ ওয়ার্কার)। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে বিচ্ছিন্ন থাকা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার প্রস্তুতি। তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যৌথ সহযোগিতার মাধ্যমে প্রযুক্তি গ্রহণের সুফল পুরোপুরি ঘরে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে পররাষ্ট্র সচিব রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বলেন, বর্তমান বিশ্বের মৌলিক প্রশ্ন হলো এআই কারা নিয়ন্ত্রণ করবে এবং এর সুফল কারা পাবে। বাংলাদেশ কেবল ভোক্তা না হয়ে সুফলের ন্যায্য অংশীদার হতে চায় এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে সেতুবন্ধনকারীর ভূমিকা পালন করবে। জাতিসংঘের “গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্নেন্স”-এ দেশের অবস্থান নির্ধারণে সবার মতামত সমন্বয় করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ঢাকায় একটি ‘এআই পলিসি ল্যাব’ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি (আইটিআইটি) উইং এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) যৌথ কারিগরি রূপরেখা উপস্থাপন করে। এআই প্রযুক্তির বহুমাত্রিক নিরাপত্তা দিক নিয়ে বক্তব্য দেন ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. মাহফুজুর রহমান। এ ছাড়া ব্ল্যাঞ্চার্ড হাউস ইনস্টিটিউটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক জোয়ান আই বিশেষ বক্তব্য প্রদান করেন এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের মহাপরিচালক অতিরিক্ত সচিব ড. দেলোয়ার হোসেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ২৫টি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিদেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের ৮৫টি কূটনৈতিক মিশন এ সংলাপে সরাসরি অংশ নেয়। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কূটনৈতিক প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাবিদ, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও থিংক ট্যাংকের প্রতিনিধিরা সংলাপে সক্রিয়ভাবে মতবিনিময় করেন।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমই/এমআইএসটি//