এআই-নির্ভর রোবোটিক সার্জারি চালু করল ইউনাইটেড হেলথকেয়ার, দুই রোগীর অস্ত্রোপচারে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশে প্রথম রোবোটিক সার্জারির মাইলফলক

  • ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে প্রথম নিয়মিত রোবোটিক সার্জারি
  • টুমাই রোবটের থ্রিডি ভিশন ও ৩৬০ ডিগ্রি নিয়ন্ত্রণ
  • কার্ডিয়াক, নিউরো, ইউরোলজি ও গাইনোকোলজিতে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা

বাংলাদেশে প্রথম রোবোটিক সার্জারির মাইলফলক
৩১ আগষ্ট, ২০২৬ ১৯:২৫  

বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতে রোবোটিক সার্জারির আনুষ্ঠানিক যাত্রায় নতুন মাইলফলক তৈরি হয়েছে। রাজধানীর মাদানী অ্যাভিনিউয়ের ইউনাইটেড সিটিতে অবস্থিত ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে প্রথমবারের মতো রোবোটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফলভাবে দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি বাংলাদেশে প্রথম রোবোটিক সার্জারি কার্যক্রম। ৩১ আগস্ট সম্পন্ন হওয়া এই দুই অস্ত্রোপচারে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক মেডবট টুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট, যা উচ্চ-সংজ্ঞার ত্রিমাত্রিক দৃশ্যায়ন এবং রোবোটিক যন্ত্রের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চিকিৎসকদের জটিল অস্ত্রোপচারে বাড়তি নির্ভুলতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

প্রথম অস্ত্রোপচারটি ছিল পিত্তথলির পাথর অপসারণের জন্য রোবোটিক কোলেসিস্টেকটমি। ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের তথ্য অনুযায়ী, অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীন ৩৪ বছর বয়সী এক পুরুষ রোগীর এই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। একই দিনে অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান (শেলী) জরায়ু থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আক্রান্ত ৪৫ বছর বয়সী এক নারীর রোবোটিক হিস্টেরেকটমি করেন। তবে প্রথম রোগীর বয়স নিয়ে প্রকাশিত সংবাদসূত্রে পার্থক্য রয়েছে; দ্য ডেইলি স্টার ৫৭ বছর বয়স উল্লেখ করেছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রযুক্তি

রোবোটিক সার্জারি মূলত চিকিৎসকের বিকল্প নয়; বরং চিকিৎসকের হাতের সূক্ষ্মতা, দৃশ্যমানতা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ানোর একটি প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা। রোবোটিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চিকিৎসক কনসোল থেকে অস্ত্রোপচারের যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করেন। টুমাই ব্যবস্থায় উচ্চ-সংজ্ঞার ত্রিমাত্রিক ছবি এবং বহু-জয়েন্টযুক্ত রোবোটিক যন্ত্র ব্যবহারের ফলে শরীরের সংকীর্ণ ও জটিল অ্যানাটমিক্যাল স্থানে কাজ করার সক্ষমতা বাড়ে। সাম্প্রতিক একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় টুমাই ব্যবস্থার ত্রিমাত্রিক দৃশ্যায়ন, কবজির মতো নমনীয় যন্ত্র এবং একাধিক মাত্রায় যন্ত্র নড়াচড়ার সক্ষমতাকে এর গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোবোটিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ছোট কাটাছেঁড়া করে অস্ত্রোপচার, রক্তক্ষরণ কমানো, আশপাশের টিস্যুর ক্ষতি কমানো এবং অস্ত্রোপচারের পর রোগীর দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে এসব সুবিধা রোগী, অস্ত্রোপচারের ধরন, চিকিৎসকের দক্ষতা এবং সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে; রোবোটিক সার্জারি নিজে থেকেই সব ক্ষেত্রে দ্রুত বা কম জটিল পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করে না।

৩৬০ ডিগ্রি নড়াচড়া থেকে ত্রিমাত্রিক দৃশ্যায়ন

রোবোটিক সার্জারির অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত সুবিধা হলো চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্ষুদ্র যন্ত্রের বহু-দিকের নড়াচড়া। ইউনাইটেড হেলথকেয়ার জানিয়েছে, তাদের ব্যবহৃত রোবোটিক আর্ম সংকীর্ণ ও জটিল স্থানে কাজ করতে সক্ষম। অন্যদিকে টুমাই প্ল্যাটফর্ম নিয়ে প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় যন্ত্রগুলোর বহু-জয়েন্টযুক্ত নড়াচড়া এবং উচ্চ-সংজ্ঞার ত্রিমাত্রিক দৃশ্যায়নের সক্ষমতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে প্রচলিত ল্যাপারোস্কোপিক অস্ত্রোপচারের তুলনায় কিছু জটিল প্রক্রিয়ায় চিকিৎসকের জন্য সূক্ষ্ম টিস্যু বিচ্ছিন্নকরণ ও পুনর্গঠনের কাজ আরও নিয়ন্ত্রিতভাবে করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শরীরের এমন অংশে, যেখানে সীমিত জায়গার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি বা অঙ্গের আশপাশে কাজ করতে হয়, সেখানে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ।

টুমাই রোবট: বাংলাদেশে নতুন, বিশ্বে দ্রুত সম্প্রসারিত

বাংলাদেশে টুমাই রোবটের ব্যবহার নতুন হলেও প্রযুক্তিটি আন্তর্জাতিকভাবে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। মেডবটের তথ্য অনুযায়ী, টুমাই একটি বহু-আর্ম ল্যাপারোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট এবং প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার সম্প্রসারণ করছে। ২০২৬ সালে টুমাই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে আন্তঃদেশীয় টেলিসার্জারির ঘটনাও ঘোষণা করেছে মেডবট।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত টুমাই-ভিত্তিক সাধারণ সার্জারির আটটি গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে মোট ৪১৬ রোগীর তথ্য বিবেচনা করা হলেও লেখকেরা উল্লেখ করেছেন, প্রাথমিক গবেষণাগুলোর অধিকাংশই চীনে পরিচালিত এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রমাণ এখনো সীমিত। ফলে বাংলাদেশের মতো নতুন বাজারে প্রযুক্তিটি সম্প্রসারণের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, রোগী নির্বাচন, নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

শুধু যন্ত্র নয়, প্রয়োজন দক্ষ জনবল

রোবোটিক সার্জারি চালুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর একটি হলো প্রশিক্ষিত সার্জন, অ্যানেসথেশিয়া দল, নার্স, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও প্রযুক্তিগত সহায়তাকর্মীর সমন্বিত সক্ষমতা। ইউনাইটেড হেলথকেয়ার জানিয়েছে, দুটি অস্ত্রোপচারই একটি বহুবিষয়ক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের সহযোগিতায় সম্পন্ন হয়েছে।

এ কারণে বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারির বিস্তারের ক্ষেত্রে শুধু রোবট আমদানি বা স্থাপন করাই যথেষ্ট হবে না। সার্জন প্রশিক্ষণ, সিমুলেশনভিত্তিক শিক্ষা, যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ, মাননিয়ন্ত্রণ, রোগী নিরাপত্তা এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ফলাফল পর্যবেক্ষণের একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো প্রয়োজন হবে।

চিকিৎসার পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা

অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান (শেলী) জানিয়েছেন, রোবোটিক সার্জারি কার্যক্রম ভবিষ্যতে কার্ডিয়াক সার্জারি, নিউরোসার্জারি, ইউরোলজি, জেনারেল সার্জারি, গাইনোকোলজি ও থোরাসিক সার্জারিতে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। হাসপাতালটির বর্তমান সেবাতালিকাতেও সাধারণ সার্জারি, গাইনোকোলজি, কার্ডিয়াক সার্জারিসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত চিকিৎসা বিভাগ রয়েছে।

এই সম্প্রসারণের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো নয়; উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া রোগীর সংখ্যা কমানো এবং দেশের ভেতরেই জটিল চিকিৎসা সেবা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির নতুন প্রতিযোগিতা

ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে উন্নত সার্জিক্যাল প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিতও দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোয় উন্নত ডায়াগনস্টিক ও সার্জিক্যাল প্রযুক্তির পাশাপাশি রোবোটিক সার্জারি প্ল্যাটফর্ম যুক্ত হয়েছে।

এর ফলে দেশের রোগীদের জন্য উন্নত চিকিৎসার বিকল্প বাড়তে পারে। একই সঙ্গে চিকিৎসা খাতে প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ, বিশেষায়িত চিকিৎসক তৈরি এবং মেডিকেল প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও বাড়বে।

বিদেশমুখী চিকিৎসা কমানোর সম্ভাবনা

বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারির বিস্তার হলে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের একটি অংশ দেশে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রযুক্তির প্রাপ্যতার পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয়, বীমা কাভারেজ, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, রোগীর নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্লিনিক্যাল ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে।

রোবোটিক সার্জারি তাই শুধু একটি নতুন যন্ত্রের সংযোজন নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত রূপান্তরের একটি সম্ভাব্য ধাপ। ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে প্রথম দুটি অস্ত্রোপচার সেই যাত্রার সূচনা করেছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে এই প্রযুক্তিকে নিরাপদ, দক্ষ, সাশ্রয়ী এবং টেকসইভাবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।
//ডিবিটেক/ ডিএমও/এনএপি/এমআইএস//