কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের ১৮তম অন্তরালে
আকাশ ছোঁয়া কীর্তি যেন ধুলোয় মলিন!
১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৬১০ বর্গকিলোমিটারের এই বদ্বীপের মানচিত্রের দিকে তাকালে আজ যেখানেই কোনো পাকা সড়ক, কালভার্ট কিংবা গ্রামীণ সেতুর রেখা দেখা যায়, সেখানেই আসলে খোদাই করা আছে একটি নাম- প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। তিনি কেবল ইঁট-পাথরের কারিগর ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলার অবহেলিত গ্রামীণ জনপদের ভাগ্য বদলের সারথী। তাঁর জীবনের খেরখাতার পাতাগুলো ও ইতিহাস সাক্ষী দেয়, এই মানুষটি জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে কতটা নিঃশব্দে অথচ প্রলয়ঙ্করীভাবে দেশকে ভালোবেসেছিলেন।
১ সেপ্টেম্বর তাঁর ১৮তম অন্তর্ধান দিবস। পবিত্র রমজান মাসের সেই দিনে, নিজ মাতৃভূমির স্মার্ট রূপান্তরে পরিবেশ ও প্রকৌশলবান্ধব উন্নয়নের ইমেইল লিখতে লিখতেই মাত্র ৬৩ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন না ফেরার দেশে। এই বিশেষ ক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন জাগে—আমরা কি আমাদের এই চিরবীরকে বিস্মৃত হতে চলেছি? কেন আজও তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেওয়া হয়নি সর্বোচ্চ স্বাধীনতা কিংবা একুশে পদক? তিনিও কি তবে অতীতে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদের নোংরা রাজনীতির তীরে বিদ্ধ হয়ে আড়ালে পড়ে রইলেন?
ধ্বংসস্তূপের বুকে নবীন সৃজন: মুক্তিযোদ্ধা কামরুল ইসলাম
১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল। চারদিকে পাকিস্তানি হানাদারদের নারকীয় তাণ্ডব। কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কামরুল ইসলামের সামনে ছিল নিরাপদ ও বিলাসী জীবনের হাতছানি। কিন্তু যাপিত জীবনের পাতা উল্টালে দেখা যায়, তিনি বেছে নিলেন কাঁটাতারের পথ। নিজের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও জীবন চরম ঝুঁকিতে ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মুক্তিযুদ্ধে। কুষ্টিয়া জেলা স্কুল, পুলিশ লাইন এবং মিলপাড়া ওয়্যারলেস স্টেশনের পাকিস্তানি তিন পয়েন্টে আক্রমণের নীল নকশায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। ৩০ মার্চ ১৯৭১ সালে হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষকে সাথে নিয়ে কুষ্টিয়ায় পাকিস্তানি সেনাদের তিন পয়েন্ট অবরুদ্ধ করার যে ঐতিহাসিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছিল, সেখানে এই বীরের রণকৌশল জড়িয়ে আছে। শত্রুর পথ আটকাতে কুষ্টিয়া-ভেড়ামারা সীমান্তে উড়িয়ে দেয়া ব্রিজটি শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সচল করেন অসামান্য প্রকৌশল দক্ষতায়।
দেশ স্বাধীন হলো বটে, কিন্তু রেখে গেল এক অক্ষত শ্মশান। চারদিকে শুধু ভাঙা রাস্তা, ধ্বংসপ্রাপ্ত কালভার্ট আর ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা। স্বাধীন দেশ পুনর্গঠনের সেই শূন্যতার দিনে তিনি অস্ত্র জমা দিয়ে হাতে তুলে নিলেন দেশ গড়ার হাতিয়ার। মহাকবি হোমার তাঁর দ্য ইলিয়াড-এ যেমনটি বলেছিলেন:
‘কেবল অস্ত্র হাতে শত্রুকে হঠানোই শেষ কথা নয়; প্রকৃত বীরত্ব হলো যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের স্বদেশকে নতুন করে গড়ে তোলা।’
তিনি ঠিক তাই করেছিলেন। ধ্বংসকে ভয় না পেয়ে অবিশ্বাস্য কর্মস্পৃহায় বুঁদ হন পুনর্গঠনে। তাঁর এই রূপান্তরকে যেন কবি নজরুল ইসলামের চিরন্তন ‘প্রলয়োল্লাস’-এই প্রকাশ করা যায়:
‘ধ্বংস দেখে? ভয় কেন তোর? প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন! আসছে নবীন- জীবন-হারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন!’
প্রাযুক্তিক দূরদর্শিতা এবং এক প্রাতিষ্ঠানিক বিপ্লব
কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ছিলেন বিশ শতকের শেষভাগের এমন এক দূরদর্শী বাঙালি, যিনি বর্তমানের ফ্রেমে দাঁড়িয়ে আগামী শতকের ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন। খেরখাতার তথ্যানুযায়ী, আজ থেকে কয়েক দশক আগে, যখন বাংলাদেশে কম্পিউটার বা ডিজিটাল প্রযুক্তির ধারণা ছিল রূপকথার মতো, তখন তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে সনাতন অ্যানালগ পদ্ধতিতে এই বিশাল জনপদের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি প্রথম বাংলাদেশে গ্রামীণ ম্যাপিং এবং জিআইএস (GIS) প্রযুক্তির মতো বৈপ্লবিক ধারণার প্রবর্তন করেন । নতুনকে স্বাগত জানানোর এই মানসিকতা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর এই বাণীর সাথে হুবহু মিলে যায়:
‘নূতনের আহ্বানকে যে জাতি অবহেলা করে, সে জড়তার অন্ধকারে তলিয়ে যায়। মেধার সাথে প্রযুক্তির মিলনই প্রগতির মূল চাবিকাঠি।’
তিনি ছোট একটি প্রকৌশল সেলকে তিল তিল করে আজকের দানবাকৃতির কিন্তু অসম্ভব দক্ষ ‘স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর’ (এলজিইডি)-এ রূপান্তর করেন। সরকারি দপ্তরের ফাইলবন্দি সংস্কৃতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ‘লালফিতা’ শব্দটিকে তিনি আজীবন বুড়ো আঙুল দেখিয়েছিলেন। তিনি অফিসে বসে সময় কাটানোর মানুষ ছিলেন না; গভীর রাত পর্যন্ত তাঁর বাসায় চলতো দেশের উন্নয়নের চুলচেরা বিশ্লেষণ। তিনি জানতেন, জনগণের সেবার জন্য কোনো অনুমোদনের অপেক্ষায় কাজ আটকে রাখতে নেই। এই অসাধারণ কর্মস্পৃহা ও দূরদর্শিতাকে সম্মান জানিয়ে দার্শনিক লিও তলস্তয় বলেছিলেন:
‘সংগঠনের প্রকৃত শক্তি তার নিয়মে নয়, বরং সেই নেতার ইচ্ছাক্ষমতায়- যিনি হাজারো মানুষকে একটি সাধারণ কল্যাণকর লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন।’
বাংলার এই কাজের মানুষের কোনো ফাঁকি ছিল না। লালন সাঁইয়ের সেই চেনা সুরেই যেন তাঁর জীবন বাঁধা ছিল- ‘কাজের মানুষ কাজের বেলায়, ফাঁকি নাই তার কোনো পাড়ায়।’
খুদির জাগরণ ও মেঠোপথের স্বাধীনতা
কামরুল ইসলাম সিদ্দিক বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে তার সাড়ে ৬৮ হাজার গ্রামে। শহরমুখী উন্নয়নের জোয়ারে গ্রামগুলোকে অবহেলিত রেখে একটি রাষ্ট্র কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। তাই টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনি পাকা রাস্তা আর টেকসই সেতুর জাল বুনে দিয়েছিলেন। তাঁর হাত ধরেই কর্দমাক্ত মেঠোপথগুলো হয়ে উঠেছিল গ্রামীণ অর্থনীতির লাইফলাইন।
একসময় যে গ্রামগুলো ছিল অন্ধকার, যোগাযোগবিচ্ছিন্ন—সেখানে তিনি আধুনিকায়নের আলো জ্বালিয়েছিলেন। রাবার ড্যাম স্থাপন করে রক্ষা করেন ফসলি জমি। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার পেছনে কাজ করেছিল তাঁর আত্মশক্তির এক পরম জাগরণ। আল্লামা ইকবাল যেমনটি বলেছিলেন:
‘নিজের ভেতরের সুপ্ত শক্তিকে (খুদি) এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাও, যেন স্বয়ং ঈশ্বর তোমার ভাগ্য লেখার আগে তোমাকে জিজ্ঞেস করেন—তোমার ইচ্ছা কী?’
তিনি তাঁর অদম্য সংকল্প দিয়ে দেশের ভাগ্যরেখা নতুন করে লিখেছিলেন। তাঁর এই সৃষ্টিশীল উন্মাদনা দেখে বিশ্ববিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার-এর সেই বাণীটি মনে পড়ে:
‘কিছু মানুষ মহান হয়ে জন্মায়, কিছু মানুষ মহানতা অর্জন করে, আবার কিছু মানুষের ওপর মহানতা এসে ভর করে।’
কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি নিজের সততা, মেধা আর ঘাম দিয়ে মেহনতি মানুষের হৃদয়ে মহানতা অর্জন করেছিলেন।
ফ্যাসিবাদের তীর বনাম একটি রাষ্ট্রীয় ঋণ
২০০৮ সালের এক বিষণ্ন দিনে এই কর্মবীর আমাদের ছেড়ে চলে যান। খেরখাতার শেষ পাতাটি পড়লে চোখ ভিজে আসে—মৃত্যুর ঘণ্টা খানেক আগেও তাঁর অবশ আঙুলগুলো মুঠোফোনে টাইপ করছিল ঢাকা শহরের নাগরিক সমস্যার সহজ ও পরিবেশবান্ধব কিছু সমাধান। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও যাঁর পুরোটা মনন জুড়ে ছিল শুধুই দেশ আর দেশের মানুষের কল্যাণ, তিনি আর কেউ নন—তিনি কামরুল ইসলাম সিদ্দিক।
১ সেপ্টেম্বর তাঁর ১৮তম অন্তর্ধান দিবসে কুষ্টিয়ার সেই মেঠোপথ থেকে শুরু করে আধুনিক এলজিইডির বহুতল ভবন—সবকিছুই তাঁর জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, শেক্সপিয়ার যেমনটি বলেছিলেন, ভালো কাজের কীর্তির কাছে কোনো পতন বা মৃত্যু জয়ী হতে পারে না। তাঁর মৃত্যুর পর খেরখাতায় উল্লেখ করা কবিগুরুর সেই একটি লাইনের কবিতাই যেন সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়ায়:
‘স্মৃতিভারে আমি পড়ে আছি / ভারমুক্ত তুমি হেথা নাই।’
আজ তাঁর চলে যাওয়ার দীর্ঘ ১৮ বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও একটি সত্য অত্যন্ত প্রখরভাবে আমাদের তাড়া করে ফেরে। যে মানুষটি ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে দেশের ভৌগোলিক স্বাধীনতা এনেছিলেন এবং স্বাধীনতার পর নিজের মেধা, আধুনিক প্রযুক্তি আর প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত মুক্তির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন- তিনি কেন আজো রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত হননি?
এর পেছনের নির্মম সত্যটি হলো, দলকানা রাজনীতি আর ফ্যাসিবাদের হিংস্র থাবা। ফ্যাসিবাদের স্বভাবই হলো নিজের দলের বাইরের সত্যিকারের যোগ্য, স্বাধীনচেতা ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক গুণীজনদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা বা আড়ালে ঠেলে দেওয়া। কামরুল ইসলাম সিদ্দিক কোনো রাজনৈতিক চাটুকারিতার ধার ধারেননি, তিনি ছিলেন কাজের মানুষ। আর এই আপসহীন যোগ্যতাই হয়তো তাঁকে বিগত ফ্যাসিবাদের নোংরা রাজনীতির তীরে বিদ্ধ করেছে, যার কারণে তাঁর প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিকে ফাইলবন্দি করে রাখা হয়েছিল।
যাঁরা ইতিহাসের পাতা তৈরি করেন, তাঁরা কোনো পদকের মুখাপেক্ষী নন। কিন্তু একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের নিজেদের ঋণমুক্তির জন্য, ফ্যাসিবাদের সেই অন্যায় জঞ্জাল ভেঙে কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের মতো কিংবদন্তিকে অবিলম্বে ‘স্বাধীনতা পদক’ কিংবা ‘একুশে পদক’-এর মতো সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মানে ভূষিত করা আজ সময়ের দাবি; রাষ্ট্রীয় আবশ্যিকতা। কারণ, গুণীর কদর না করলে সে দেশে আর কোনো দিন এমন দেশপ্রেমিক কর্মবীরের জন্ম হবে না।
মেঠোপথের এই মহাকবি চিরকাল বেঁচে থাকবেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে, কোটি মানুষের প্রতিদিনের পথচলায়।





