প্রথম ইউনিটের ট্রায়াল রান প্রক্রিয়াধীন; ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র ও রোসাটমের সঙ্গে পৃথক বৈঠক
রূপপুর থেকে ৮-১০ সপ্তাহে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ
- ৮ থেকে ১০ সপ্তাহের মধ্যে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে যাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ
- সম্পূর্ণ উৎপাদনে গেলে বছরে সাশ্রয় হবে প্রায় ১০০ কোটি ডলার; মোট ২,৪০০ মেগাওয়াটে কমবে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা
- ওয়াশিংটনে মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রীর সঙ্গে পরমাণু সহযোগিতা এবং রোসাটমের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রীর
পাবনার ঈশ্বরদীতে বাস্তবায়নাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আরএনপিপি) প্রথম ইউনিট থেকে আগামী আট থেকে দশ সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল ও প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে চূড়ান্ত ধাপের কারিগরি ও নিরাপত্তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে ধাপে ধাপে গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালন বাড়ানো হবে। ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রথম ইউনিট থেকে আগামী বছরের শুরুর দিকে পুরোদমে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের প্রকৌশল শাখা এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট (Atomstroyexport)। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম ইউনিটটি পুরোপুরি চালু হলে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির পেছনে প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বা বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাসান জানান, আগামী ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে গ্রিড সিনক্রোনাইজেশনের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে। প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সামগ্রিক জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করবে। তিনি বলেন, "সিনক্রোনাইজেশন সফল হওয়ার পর প্ল্যান্টের সক্ষমতা অনুযায়ী ধাপে ধাপে গ্রিডে বিদ্যুৎ পাঠানো হবে। তবে কমিশনিং প্রক্রিয়ায় আমাদের মূল অগ্রাধিকার হলো পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে প্রায় ২,৩০০টি কারিগরি পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করে প্রকৌশলীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা সমীচীন নয়। কোনো পরীক্ষায় জটিলতা দেখা দিলে তা পুনরায় করতে হয়। সব প্রস্তুতি সফল হলে আট থেকে দশ সপ্তাহের মধ্যে গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হবে; নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও পরমাণু শক্তি বিশেষজ্ঞ ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, "রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশে বেসলোড বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখবে, যা কয়লা, গ্যাস ও তেলের মতো আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাবে। প্ল্যান্টটির দুটি ইউনিটের মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পুরোপুরি যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন জটিলতা ও ডলার সংকটের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।" কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাঘাবাড়ী ২৩০ কেভি, বগুড়া ৪০০ কেভি এবং গোপালগঞ্জ ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে, যা বিদ্যুৎ পরিবহনে ব্যবহৃত হবে।
এদিকে রূপপুর প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত প্রথম মিনিস্টিরিয়াল লেভেল ‘অ্যাটমিক টেকনোলজিস লাইসেন্সড ফর অ্যাপ্লিকেশন্স অব সি’ (ATLAS) সম্মেলনের সাইডলাইনে ২৬ আগস্ট বুধবার এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট। বৈঠকে স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর (SMR), ফ্লোটিং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পারমাণবিক সক্ষমতা তিনগুণ বৃদ্ধির বিষয়ে শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হয়।
একই সফরে ওয়াশিংটন ডিসিতে রোসাটমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘রোসাটম এনার্জি প্রজেক্টস জয়েন্ট-স্টক কোম্পানি’-এর মহাপরিচালক আন্দ্রে রোঝদেস্তভিনের (Andrey Rozhdestvin) সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। বৈঠকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চলমান কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং অবশিষ্ট কারিগরি বিষয়গুলো সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়। রোসাটমের প্রতিনিধিদল নির্ধারিত সময়সূচি বজায় রেখে রূপপুর প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ সফলভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
//ডিবিটেক/এনএপি/এসআইএমপি/এসআইএমপি//





