অবকাঠামোর জীবনচক্রে কার্বন নিঃসরণ হিসাবের তাগিদ
- বৃষ্টির পানি, ভূগর্ভস্থ পানি ও সবুজ অবকাঠামোয় গুরুত্ব
- জলবায়ু মোকাবিলায় তরুণ নেতৃত্বের আহ্বান
ঢাকার পরিবেশ ও জলবায়ুজনিত ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণদের শুধু সচেতনতা অর্জন নয়, সেই জ্ঞানকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনা ও স্থানীয় উদ্যোগে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশবিদ, গবেষক, নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, জলবায়ু-সহনশীল নগর গড়তে কম-কার্বন অবকাঠামো, বিশেষ করে সড়ক ও সেতু নির্মাণে পুরো জীবনচক্রের কার্বন নিঃসরণ বিবেচনা করা জরুরি।
একই সঙ্গে নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়া, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাশয় ও সবুজ এলাকা রক্ষা এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধানকে নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। তাদের মতে, এসব ক্ষেত্রে তরুণদের জ্ঞান, উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও নেতৃত্বকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে ঢাকার জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।
রাজধানীর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব ক্লাইমেট চেঞ্জ, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি (আইসিসিইএস)-এর উদ্যোগে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ ক্লাব ও ডিপার্টমেন্ট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের সহযোগিতায় ১৬ আগস্ট, রবিবার ‘সহনশীল ঢাকা: তরুণ-নেতৃত্বাধীন জলবায়ু কার্যক্রম উদ্যোগ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে আইসিসিইএসের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী শেখ তাজুল ইসলাম তুহিনের সঞ্চালনায় ‘সচেতনতা থেকে পদক্ষেপ: শহুরে জলবায়ু মোকাবিলায় তরুণদের ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে একাডেমিয়া, পেশাজীবী, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং যুবকেন্দ্রিক সামাজিক উদ্যোগের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, নগর অবকাঠামোকে শুধু নির্মাণ ব্যয় বা তাৎক্ষণিক ব্যবহারিক সক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করলে জলবায়ু ঝুঁকির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। একটি সড়ক, সেতু বা ভবনের পরিকল্পনা, নির্মাণ, ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং শেষ পর্যন্ত পুনর্ব্যবহার বা অপসারণ—প্রতিটি পর্যায়ে কার্বন নিঃসরণ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে কম-কার্বন অবকাঠামো এবং সবুজ অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঢাকার মতো দ্রুত সম্প্রসারিত নগরে নতুন বসতি ও অবকাঠামো তৈরির সময় জলাশয়, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ এলাকার ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে প্রকৃতিনির্ভর সমাধানকে কেবল পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় হিসেবে না দেখে নগর জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পানি সংকট ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার কার্যকর অবকাঠামো হিসেবেও দেখতে হবে।
আলোচনায় ঢাকার ভূতত্ত্ব, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং নগরায়ণের পরিবেশগত চাপের পারস্পরিক সম্পর্কও উঠে আসে। বক্তারা বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে নগর পানির নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বা গ্রাউন্ডওয়াটার রিচার্জ বিবেচনায় নেওয়া এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। ভবন, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোর নকশায় পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ রাখার মতো পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে নগর পানিব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আলোচনায় মত দেন বক্তারা।
তাদের মতে, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা শুধু পানি সংকট মোকাবিলার বিষয় নয়; এটি নগর জলাবদ্ধতা কমানো, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং জলবায়ু অভিযোজনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
ঢাকার অন্যতম বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। এ ক্ষেত্রে তরুণদের স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যা শনাক্ত, তথ্য সংগ্রহ, সচেতনতা তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান উদ্ভাবনে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বক্তারা বলেন, পরিবেশ বিষয়ে একাডেমিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। ‘শিখতে শিখতে কাজ করা’ পদ্ধতিতে তরুণদের সম্পৃক্ত করলে শিক্ষা ও বাস্তব পরিবেশগত কার্যক্রমের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা কমানো সম্ভব।
সেমিনারে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন এবং জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়নে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা অভিযোজনভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জলবায়ু প্রকল্প ও বাজেটকে জাতীয় অগ্রাধিকার ও সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্ব দেন।
ভবিষ্যৎ পেশাজীবী ও তরুণদের জলবায়ু অর্থায়ন, সরকারি বাজেট এবং জলবায়ু কার্যক্রমের জন্য বিদ্যমান অর্থায়ন ব্যবস্থাগুলো সম্পর্কে ধারণা অর্জনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অর্থায়নের সুযোগ থাকলেও দক্ষ প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সক্ষমতা না থাকলে সেই অর্থ কাঙ্ক্ষিত পরিবেশগত ফল তৈরি করতে পারবে না।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা পরিবেশগত সচেতনতা থেকে বাস্তব ও যুব-নেতৃত্বাধীন কার্যক্রমে অগ্রসর হওয়ার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে ঢাকার চলমান নগর বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ নগর এলাকার জন্য সুশৃঙ্খল নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
তরুণদের স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরিতে যুক্ত করার পাশাপাশি সবুজ অবকাঠামো, প্রকৃতিনির্ভর সমাধান, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনায় তাদের উদ্ভাবনী উদ্যোগকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানানো হয়।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেসের ডিন অধ্যাপক ড. দীপক কুমার মিত্র, ডিপার্টমেন্ট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সুজাউদ্দিন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম সোহেল, ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. আনোয়ার জাহিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউআরপি বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি ড. আদিল মোহাম্মদ খান, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ডিপার্টমেন্ট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ও প্রধান মো. হাফিজুর রহমান পিএইচডি, ফুটস্টেপস বাংলাদেশের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি শাহ রাফায়াত চৌধুরী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক রাফিদ মাহমুদ খান এবং সহযোগী অধ্যাপক শাহ মো. আশিক উল্লাহ পিএইচডি।
বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় তরুণদের কেবল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হিসেবে দেখলে চলবে না; বর্তমান সময়ের পরিবেশগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গবেষণা, উদ্ভাবন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াতেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে আয়োজক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন এবং প্যানেলিস্ট, অংশগ্রহণকারী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। পরিবেশবিষয়ক নিবন্ধ প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত শীর্ষ ১০ জনকে সনদ দেওয়া হয়। শীর্ষ তিনজনকে পুরস্কারের অর্থ ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
সমাপনী বক্তব্যে যুব নেতৃত্বাধীন উদ্ভাবন ও পরিবেশ সচেতনতাকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সেমিনার থেকে মূল বার্তাটি ছিল—ঢাকার জলবায়ু সহনশীলতা শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা সরকারি নীতির ওপর নির্ভরশীল নয়; এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে তরুণদের জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন ও বাস্তবভিত্তিক নেতৃত্ব। পরিবেশগত সিদ্ধান্তে জীবনচক্রভিত্তিক কার্বন হিসাব, প্রকৃতিনির্ভর সমাধান, পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অর্থায়নকে একসঙ্গে বিবেচনা করলেই একটি অধিক সহনশীল ও টেকসই নগর কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
//ডিবিটেক/এসআইবিজে/এমআইএস//





