আইএসপিদের নিরাপত্তা ও আমাদের সার্বভৌমত্ব: আশঙ্কার মেঘ এবং উত্তরণের পথ
দুই বছর আগের সেই জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোর কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যখন আকস্মিকভাবে ইন্টারনেট 'ব্ল্যাকআউট' বা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তখন যেন গোটা দেশের দম বন্ধ হয়ে এসেছিল। ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা কেবল রাজপথেই ফুঁসে ওঠেনি, ভার্চুয়াল জগতের সংযোগ বিচ্ছিন্নতা তাদের প্রতিবাদের আগুনকে আরও উসকে দিয়েছিল। ইন্টারনেট যে এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং মৌলিক অধিকার ও বেঁচে থাকার অন্যতম উপাদান- সেই ঐতিহাসিক সত্যটি বাংলাদেশ সেদিন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল।
সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর- সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইন্টারনেট সেবায় যেকোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতাকে আইন করে নিষিদ্ধ করার। এর আগেই অবশ্য কোভিডকালীন সময়ে ইন্টারনেট বা ডিজিটাল সংযোগ যে যাপিত জীবনের লাইফলাইন তাও প্রতীয়মান হয়। ফলে ইন্টারনেটকে 'জরুরি সেবা' হিসেবে ঘোষণা করা হয় তখনই। পরবর্তীতে জুলাই বিপ্লবে ইন্টারনেট যেন কোনো পরিস্থিতিতেই বন্ধ রাখা না যায় সে জন্য এর নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে নতুন টেলিকম নীতিমালায় আইনে পরিণত করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ইন্টারনেট বন্ধ করতে পারে বিষয়টি পলিসিতে থাকলেও তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় গাইডলাইনটি এখনও আলোর মুখ দেখেনি। কেননা, এই আইন পাশের পরেও ডেসকো, সিটি কর্পোরেশনের মতো প্রতুষ্ঠান থেকেও তারের জঞ্জাল হিসেবে পরিচ্ছন্নতার কথা বলে ক্যাবল কেটে দেওয়া হয়। এতে গ্রাহক এবং ব্যবসায়ী উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন। এজন্য তারা কোনো ক্ষতিপূরণ পান না। ফলে আইন থাকলেও ডিজিটাল অবকাঠামো নিরাপত্তার সেই রক্ষাকবচ আজ মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের হোঁচট খাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্নায়ুকেন্দ্রগুলো যেন ঢেকে গেছে অদৃশ্য ও দৃশ্যমান আতঙ্কের চাদরে।
অন্ধকার গলির হুমকি: যখন ডিজিটাল সেবাদাতারা জিম্মি
সাম্প্রতিক মাসগুলোর পরিসংখ্যান যেকোনো সচেতন নাগরিককে ভাবিয়ে তুলবে। গত কয়েক মাসে সারা দেশে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি ইন্টারনেট সেবাদাতা (ISP) প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে জুন ও জুলাই মাসে এই প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
এই তো গত ১৩ জুলাই চট্টগ্রামের আইএসপি 'ডিজিটাল ডট নেট'-এ চাঁদা না পেয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে হামলা চালিয়েছে। বিষয়টি টক অব দ্য কান্ট্রি হবার পর পুলিশি তৎপরতায়আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু আতঙ্ক কাটেনি। কেননা, এক মাসেরও কম সময় পূর্বে গত ৯ জুন মাত্র এক রাতের ব্যবধানে রাজধানীর লালমাটিয়া, বাড্ডা এবং ঢাকার বাইরে চাঁদপুর, কুমিল্লা, গাজীপুর ও বগুড়ার বেশ কয়েকটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে একযোগে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। সেসব হামলার কোনো সুরহা না হলেও এতোবড় একটা দুর্ঘটনার শিকার হতে হলো ইন্টারনেট সেবাদাতাদের।
এভাবেই পাড়ায় পাড়ায় কিংবা অভিজাত সোসাইটিগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে স্থানীয় প্রভাবশালী ও সন্ত্রাসীদের এই জবরদস্তিমূলক আচরণ পুরো খাতকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল কেটে দেওয়া, পপ (POP) বা নক (NOC) সেন্টারে হামলা চালানো এখন নিত্যদিনের ঘটনা। আইসিটি ও টেলিকম মন্ত্রণালয় এটিকে জরুরি সেবা বললেও, স্থানীয় প্রশাসন বা মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এর গুরুত্ব কতটা অনুধাবন করতে পেরেছে- তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার জন্য বিচার চাইতে গিয়েও রাজপথে নামতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। প্রশাসনিক ভাবেও প্রো-অ্যাক্টিভলি কোনো পদক্ষেপ নেয়ার নজির এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি। তাই এসব হামলা কমার বদলে যেমন বাড়ছে, তেমনি এই জরুরি সেবা ঘোষণাটাও হাস্যকর রূপ ধারণ করেছে। এতে বস্তুত হুমকীতে পড়েছে সরকারের ‘ডিজিটাল অর্থনীতি’ শক্তিশালী করণের প্রচেষ্টাও।
কেন এটি কেবল 'ব্যবসায়িক ক্ষতি' নয়?
আমরা যখন ফ্রিল্যান্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) কিংবা স্টার্ট-আপ নিয়ে বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে কথা বলি, তখন আমাদের মনে রাখা দরকার এই সবকিছুর ভিত্তি হলো ফাইবার অপটিক্যাল তার আর মাঠপর্যায়ের আইএসপিগুলোর নিরলস সেবা। তাই ডিজিটাল অবকাঠামোতে আঘাত আসার অর্থ হলো দেশের ই-কমার্স, টেলিমেডিসিন, এ্যডুটেক, সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রকেই দুর্বল করে ফেলা। এতে করে অচিরেই দেখা দেবে-
বিনিয়োগে স্থবিরতা: অবকাঠামো অনিরাপদ হলে ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিদেশি বা দেশি বিনিয়োগকারীরা টাকা ঢালতে ভয় পাবেন।
ফ্রিল্যান্সারদের জীবিকা সংকট: কয়েক ঘণ্টার ইন্টারনেট বিভ্রাট একজন ফ্রিল্যান্সারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিতে পারে।
বৈশ্বিক ভাব মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়া: আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ একটি 'অস্থিতিশীল কানেক্টিভিটি'র দেশ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
দায় কার?
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) লাইসেন্সি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইএসপিগুলো কিন্তু সরকারের সাথে রেভিনিউ শেয়ার করে, সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল (SOF)-এ অর্থ দেয়। তাহলে তাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার কেন থাকবে না?সঙ্গত কারণেই বিটিআরসি-কেই এক্ষেত্রে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে নীতিমালা হালনাগাদ করণ এবং মাঠপর্যায়ে তদারকিকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে। সেজন্য আসুন এ ধরণের সঙ্কট মোকাবেলায় বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অভিজ্ঞতার দিকে একটু নজর দেয়া যাক।
আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা: প্রতিবেশী দেশগুলোর সুরক্ষাকবচ ও নীতিমালা
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এবং এর ভৌত অবকাঠামোকে (যেমন: NOC, POP, এবং ডেটা সেন্টার) শুধু ব্যবসা হিসেবে না দেখে সেগুলোকে 'গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো' (Critical Information Infrastructure - CII) বা 'কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন' (KPI) ভুক্ত স্থাপনা হিসেবে সুরক্ষিত রাখার আন্তর্জাতিক প্র্যাকটিস রয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর নীতিমালা থেকে আমরা অত্যন্ত কার্যকর কিছু দৃষ্টান্ত গ্রহণ করতে পারি:
ভারতে রয়েছে বিশেষায়িত সাইবার এবং ফিজিক্যাল টাস্কফোর্স
প্রতিবেশী দেশ ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি আইন (IT Act, 2000) এর ধারা ৭০ অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ টেলিকম ও ডেটা অবকাঠামোকে Protected System বা সুরক্ষিত ব্যবস্থা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই অবকাঠামোগুলোতে যেকোনো অনন্যাসঙ্গিক প্রবেশ বা হামলা অ-জামিনযোগ্য ও গুরুতর অপরাধ। এছাড়া, ভারতীয় টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি (TRAI) এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত সাইবার উইং স্থানীয় পুলিশের সাথে মিলে এই খাতের চাঁদাবাজি দমনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে।
পাকিস্তানে রয়েছে PECA এবং বিশেষ সুরক্ষা প্রটোকল
উপমহাদেশের আরেকটি দেশ পাকিস্তানে Prevention of Electronic Crimes Act (PECA) এবং বিশেষ টেলিকম নীতিমালার অধীনে টেলিকম ও ইন্টারনেট সেবাদাতাদের ব্যাকবোন অবকাঠামোকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ইন্টারনেট সেবায় নিয়মতান্ত্রিক বা অনৈতিক বাধা সৃষ্টি করাকে 'গুরুতর রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধ' হিসেবে বিচার করা হয়।
নেপাল ও ভুটান: রেগুলেটরি ও লোকাল পলিসির সমন্বয়
নেপাল টেলিকমিউনিকেশন অথরিটি (NTA) এবং ভুটানের (BICMA) লাইসেন্সিং গাইডলাইনে ইন্টারনেট সেবাদানকারীদের সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা স্পষ্ট করা হয়েছে। সেখানে স্থানীয় ক্যাবল কাটার ঘটনা বা ইন্টারনেট সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোকে সরাসরি জাতীয় সম্পদের ক্ষতি সাধনের সমতুল্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
সিঙ্গাপুর: সাইবার সিকিউরিটি আইন ও কড়া সুরক্ষা ব্লক
সিঙ্গাপুর এ বিষয়ে বিশ্বে রোল মডেল। তাদের Cybersecurity Act অনুযায়ী ১১টি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে Critical Information Infrastructure (CII) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার অন্যতম হলো ইনফোকম বা আইসিটি সেক্টর। সিঙ্গাপুরে যেকোনো পপ (POP), নক (NOC) বা ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জে হামলা বা সেবা ব্যাহত করার ন্যূনতম প্রচেষ্টাও কঠোর অর্থনৈতিক অপরাধ (Economic Crime) এবং দেশের সার্বভৌম নিরাপত্তার ওপর আঘাত হিসেবে বিচার করা হয়।
সংকটের আশু সমাধান: তিনটি সাময়িক পদক্ষেপ
পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে এবং ব্যবসায়ীদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. বিশেষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল: ডিজিটাল অবকাঠামো ও ইন্টারনেট সেবায় বাধা দেওয়াকে 'গুরুতর অর্থনৈতিক অপরাধ' (Serious Economic Offense) হিসেবে গণ্য করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
২. ট্র্যাকিং সিস্টেম সচল করা: যেসব দেশি বা বিদেশি নম্বর (যেমন হোয়াটসঅ্যাপ) থেকে আইপি ফোন বা অন্য মাধ্যমে চাঁদাবাজির হুমকি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোকে বিটিআরসির উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত শনাক্ত করে অ্যাকশন নিতে হবে।
৩. যৌথ সমন্বিত সেল গঠন: ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতা ও অবকাঠামোর সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই বিটিআরসি, স্থানীয় প্রশাসন, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে একটি বিশেষ 'কুইক রেসপন্স সেল' গঠন করা প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষাকবচ: টেকসই সমাধান
সাময়িক মলম দিয়ে এই ক্ষত নিরাময় সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন:
কেপিআই (KPI) ঘোষণা: ইন্টারনেট সেবা ব্যবসায়ের প্রধান লাইফলাইন—নক (NOC), পপ (POP) ও ডেটাসেন্টারগুলোকে অবিলম্বে 'কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন' (KPI) বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।
লাইফলাইন আইন সংশোধন: লাইসেন্স গাইডলাইনেই ইন্টারনেট ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর সুরক্ষাকে জরুরি আইনের আওতাভুক্ত করতে হবে।
সাইবার ইন্টেলিজেন্সের অন্তর্ভুক্তি: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার ক্রাইম বিভাগকে কেবল সোশাল মিডিয়া মনিটরিংয়ে ব্যস্ত না রেখে, ইন্টারনেট সেবাদাতাদের ওপর হুমকি ও চাঁদাবাজি ঠেকাতে বিশেষ সাইবার ইন্টেলিজেন্স ইউনিট হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
বস্তুত কোভিড ও জুলাইয়ের সেই দিনগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে শিখিয়েছে, ইন্টারনেট ছাড়া আধুনিক নাগরিক জীবন অচল। আজ যদি মুষ্টিমেয় কিছু চাঁদাবাজ আর সন্ত্রাসীর কারণে সেই ইন্টারনেট সেবাদাতারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে তার মাশুল দিতে হবে পুরো রাষ্ট্রকে। আমরা যদি সত্যিই একটি জ্ঞানভিত্তিক, স্বনির্ভর ও বৈষম্যহীন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে ডিজিটাল মহাসড়কের পাহারাদারদের নিরাপত্তা আমাদের সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। কালবিলম্ব না করে এখনই অ্যাকশন নেওয়ার উপযুক্ত সময়।
লেখকঃ প্রকাশক, ডিজিবাংলা, সম্পাদক, সারবাংলা, উদ্যোক্তা ও জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি, আইএসপিএবি





