স্টার্টআপে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল, অনুদান ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি

জামানতনির্ভর ঋণের বিকল্পে প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়নের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী; উদ্বোধন হলো জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম

মেধাভিত্তিক উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল থেকে ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, প্রকল্পের সম্ভাবনা মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ কমিটি অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেবে। একই অনুষ্ঠানে জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন এবং ছয়টি স্টার্টআপকে অনুদান দেওয়া হয়।

জামানতনির্ভর ঋণের বিকল্পে প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়নের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী; উদ্বোধন হলো জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম
১৪ জুলাই, ২০২৬ ১৩:০৯  

প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরিতে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল থেকে ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার।  এখান থেকে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের প্রকল্প মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থায়ন দেওয়া হবে এবং এ প্রক্রিয়ায় একটি নিরপেক্ষ কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

১৪ জুলাই, মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘তারুণ্য, স্টার্টআপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এ ঘোষণা দেন। অনুষ্ঠানে ছয়টি নির্বাচিত স্টার্টআপের প্রতিনিধিদের হাতে অনুদান তুলে দেওয়া হয় এবং জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন করা হয়।

এসময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা এবং স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) আল মোজাদ্দেদী আলফেছানি এবং সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খানসহ অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, নির্বাচনি ইশতেহার ২০২৬ অনুযায়ী গঠিত এই ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। উদ্বোধনী পর্ব শেষে দুপুরের পর সাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়া এই অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম’-এর শুভ উদ্বোধন। এই প্ল্যাটফর্মটি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ওয়ান-স্টপ জাতীয় লঞ্চপ্যাড হিসেবে কাজ করবে, যেখান থেকে সরকারি সহায়তা, আবেদন প্রক্রিয়া, মেন্টরিং এবং বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে জানা যাবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের বাজেটে স্টার্টআপ অর্থায়নের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যোগ্য উদ্যোক্তারা প্রকল্পের ধরণ ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সহায়তা পেতে পারেন।

তিনি বলেন, প্রচলিত ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে জামানত ও কাগজপত্র-নির্ভর জটিলতা অনেক নতুন উদ্যোক্তার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে প্রকল্পের সম্ভাবনা মূল্যায়নে একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে কোনো মন্ত্রী বা উপদেষ্টা থাকবেন না। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রশ্নোত্তর পর্বে জামানত ছাড়া অর্থায়নের সুযোগ সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পের সম্ভাবনা বিবেচনা করেই অর্থায়ন করা হবে। কোনো উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল না পেলেও সম্ভাবনা থাকলে পুনরায় অর্থায়নের বিষয় বিবেচনা করা হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, সরকার সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে এবং তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করবে।

কাজ করার সময় এখনই
অনুষ্ঠানে নতুন ও ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তারা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তাদের বিভিন্ন কাজের বিবরণ তুলে ধরেন এবং প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন। এরপর বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এখন আসলে বলার বোধহয় খুব বেশি কিছু নেই। বলাবলি যা বলার, সেটা বলা হয়ে গেছে। এখন বোধহয় কাজ করার সময়।” নতুন ও ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আপনাদের একটা কথা শুধু বলি, আপনারা যেটা করতে চাইছেন, ইটস নট সো ইজি, ইটস ভেরি ডিফিকাল্ট। ইটস ভেরি ডিফিকাল্ট। কিন্তু আপনি পারবেন, যদি আপনার ইচ্ছা থাকে।”

ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা ও লড়াই
তরুণদের উৎসাহিত করতে গিয়ে নিজের জীবনের কষ্টের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, “আমি আমার লাইফের একটু ছোট্ট একটা বিষয় তুলে ধরতে চাইছি। আপনাদের নিরুৎসাহিত করছি না আমি, আপনাদের উৎসাহিত করতে চাইছি। দেখুন, আমার লাইফে আমি ব্যবসা-বাণিজ্য করেছি, যতটুকু ডিসেন্টভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন, আমি ব্যবসা-বাণিজ্য করেছি। কারণ, আমার লাইফে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করতে না করতেই আমি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাই। দুটো জিনিস একসঙ্গে চলে না। কিন্তু বেঁচে থাকতে হবে, সেজন্য যতটুকু ব্যবসা-বাণিজ্য করা প্রয়োজন, ডিসেন্ট লাইফের জন্য, আমি ততটুকু করেছি। বাকি সময়টা আমি আমার রাজনীতির জন্য দিয়েছি। এখানেই আমি ঠিক করে নিয়েছি যে, এখানেই আমাকে এগিয়ে যেতে হবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “এগিয়ে যেতে গিয়ে একটা মানুষকে অনেক কিছুর ভেতর দিয়ে যেতে হয়। আমি গিয়েছি মানসিক নির্যাতন, আমি গিয়েছি শারীরিক নির্যাতন, বিভিন্ন রকম হিউমিলিয়েশন, বিভিন্ন রকম ফিজিক্যাল টর্চার, বিভিন্ন রকম যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে আমি গিয়েছি। অনেক ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তারপর আমি আজকে আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর রহমতে, একটা জায়গায় এসেছি। আপনাদের খুব সংক্ষেপে এটা বলার অর্থ হলো—আপনাদেরও এরকম অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।”

তবে উদ্যোক্তাদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, “আপনাদের এতটুকু বলতে পারি, এই মুহূর্তে আমার সরকারের অবস্থান থেকে আমি বলতে পারি—আমরা আছি আপনাদের সঙ্গে। আপনাদের হেল্প করার জন্য, আপনাদের পথ দেখানোর জন্য, আপনাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা আছি। কতটুকু পারব আমি জানি না, বাট আমরা আছি। যতটুকু পারব, সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আমরা আপনাদের পাশে থাকার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।”

তরুণদের দেখে আত্মবিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রী
নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যেহেতু আমি রাজনীতি করি, মাঝে মাঝেই হয়তো হতাশ হয়ে যেতাম বা এখনও মাঝে মাঝে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা হতাশা লাগে। কিন্তু কিছুদিন আগে একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম, যেখানে বাংলাদেশের প্রাইমারি স্কুলের প্রায় ২২ লাখ বাচ্চা পার্টিসিপেট করেছিল। ক্লাস টু, থ্রি, ফোর, ফাইভ পর্যন্ত বিভিন্ন স্পোর্টসে। ওদের ফুটবল ম্যাচটা আমি দেখতে গিয়েছিলাম। এই বাচ্চাদের দেখার পরে নিজেকে খুব কনফিডেন্ট মনে হয়েছে। আজকে আপনাদের কাজ এবং কয়েকটা বক্তব্য দেখে নিজেকে আরও কনফিডেন্ট হয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, “দেখুন, যেহেতু রাজনীতি করি, একটা তো আমার লক্ষ্য আছে, উদ্দেশ্য আছে, রাজনীতি আছে, দলের পরিকল্পনা আছে, সবকিছু আছে, কাজ আছে। কিন্তু যেহেতু দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছি-ই, আমাদের দেশকে নিয়েও চিন্তা করতে হয়। দেশের বিভিন্ন সেক্টর নিয়ে চিন্তা করি। আজকে যখন আপনাদের দেখলাম এবং ওইদিন ওই দুটো ইভেন্টে ওই বাচ্চাদের দেখেছি, আজকে আমার কাছে মনে হচ্ছে, এই যে আমরা রাতদিন পরিশ্রম করার চেষ্টা করছি, চেষ্টা করছি একটু চেঞ্জ করার জন্য, আমার মনে হলো যে হ্যাঁ, আমরা কিছুসংখ্যক মানুষের হাতে দিয়ে যেতে পারব, যারা আমরা যেখানে ছেড়ে যাব, সেখান থেকে তারা দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।”

ব্যাংক হ্যাসেল এড়াতে নিরপেক্ষ কমিটি ও প্রশ্নোত্তর
তারেক রহমান জানান, উদ্যোক্তাদের যেন ব্যাংকের ভোগান্তি (হ্যাসেল), সিকিউরিটি বা অতিরিক্ত কাগজপত্রের মুখোমুখি হতে না হয়, সেজন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে কোনো মন্ত্রী বা উপদেষ্টা নেই; এটি সম্পূর্ণ একটি নিরপেক্ষ কমিটি যা সার্বিক বিষয় দেখভাল করবে।

প্রশ্নোত্তর পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান প্রশ্ন করেন, সাধারণত বাবার জমি বা সম্পত্তি দেখে ব্যাংক ঋণ দেওয়া হয়, যা সবার জন্য যথার্থ নয়। জামানতহীন কিন্তু ভালো স্টার্টআপ আইডিয়া সম্পন্ন তরুণদের ঋণ প্রাপ্তি সহজ করতে সরকার কী করছে? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ সংক্রান্ত নিরপেক্ষ কমিটি সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তার প্রজেক্ট দেখে ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করবে।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, এই ফান্ডটি পাবলিক মানি বা জনগণের টাকা। যদি কোনো প্রজেক্টে সম্ভাবনা থাকে, তবে ফের ফান্ডিং বা দ্বিতীয়বার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে, কারণ অনেক ব্যবসা শুরুতেই ভালো করতে পারে না।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসআই//