সোনালি মুরগির চেয়ে বাচ্চার ওজন বেশি, মাংস অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত ও শতভাগ নিরাপদ

বাকৃবিতে ১৫ বছরের গবেষণায় নতুন ‘রঙিন মুরগি’র জাত উদ্ভাবন

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের গবেষকরা দীর্ঘ ১৫ বছরের গবেষণায় সফলভাবে ‘রঙিন মুরগি’ নামের একটি নতুন মাংস উৎপাদনকারী মুরগির জাত উদ্ভাবন করেছেন। প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিডিপি)-এর অর্থায়নে উদ্ভাবিত এই জাতটির মাংস সম্পূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত এবং এটি খামারিদের অধিক মুনাফা নিশ্চিত করবে।

বাকৃবিতে ১৫ বছরের গবেষণায় নতুন ‘রঙিন মুরগি’র জাত উদ্ভাবন
১ জুলাই, ২০২৬ ০০:০০  

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের গবেষকরা দীর্ঘ ১৫ বছরের নিরলস গবেষণায় সফলভাবে একটি নতুন রঙিন মাংস উৎপাদনকারী মুরগির জাত উদ্ভাবন করেছেন। উজ্জ্বল রঙের পালক ও অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে এই নতুন জাতের নামকরণ করা হয়েছে ‘রঙিন মুরগি’।

গত ৩০ জুন, মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো: শওকত আলীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. কে. ফজলুল হক ভূঁইয়া।

এই নতুন জাত উন্নয়নে মূল নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বজলুর রহমান মোল্যা। তিনি জানান, প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিডিপি) এর অর্থায়নে এবং ভোক্তার চাহিদা ও খামারিদের অর্থনৈতিক লাভের কথা মাথায় রেখে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্যারেন্ট লাইন সংরক্ষণ, নির্বাচন ও সংকরায়ণের মাধ্যমে এই নতুন লাইন উন্নয়ন করা হয়েছে।

গবেষণায় ‘সেক্স-লিংক হোয়াইট লাইন’কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে এর সমজাতীয়তা বা হোমোজাইগোসিটি ৮৯ থেকে ৯৩.১১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা একটি স্থায়ী জাত হিসেবে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া মুরগির পালকের রঙ নির্ধারণকারী এসওএক্স-১০ (SOX-10) জিনের ডিলিশন শনাক্তে একটি সহজ পিসিআর পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজনন কর্মসূচিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

অধ্যাপক ড. মো. বজলুর রহমান মোল্যা আরও জানান, জাতটির কিছু প্যারেন্ট লাইন ৬২ সপ্তাহে প্রায় ২০৫টি পর্যন্ত ডিম উৎপাদনে সক্ষম। প্রচলিত সোনালি মুরগির একদিন বয়সী বাচ্চার ওজন যেখানে সাধারণত ২৬ থেকে ২৮ গ্রাম হয়, সেখানে এই নতুন জাতের বাচ্চার ওজন পাওয়া গেছে প্রায় ৩৮ গ্রাম। একদিন বয়সী বাচ্চার ওজনে প্রতি এক গ্রাম বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব বাজারজাতকরণের সময় প্রায় ৫০ গ্রাম অতিরিক্ত চূড়ান্ত ওজনে প্রতিফলিত হয়, যা খামারিদের বাড়া মুনাফা নিশ্চিত করবে। ঢাকার একটি উন্নত গবেষণাগারে এই মুরগির মাংস পরীক্ষা করে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়নি। উন্নত স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও শতভাগ নিরাপদ মাংসের নিশ্চয়তা দিয়ে এটিকে বাজারে একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই মূল লক্ষ্য।

এই গবেষণা প্রকল্পের অন্যতম অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল প্রথাগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সীমাবদ্ধতা দূর করে সরাসরি গ্রামে গিয়ে ১৫ থেকে ২৫ জনের ক্লাস্টারভিত্তিক নারী খামারিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান। মাঠপর্যায়ের ফলাফলে দেখা গেছে, কারিগরি সহায়তা ও সঠিক সময়ে টিকা দেওয়ায় খামারে মুরগির বৃদ্ধি বেড়েছে এবং মৃত্যুহার হ্রাস পেয়েছে। বাজারে ভালো চাহিদা থাকায় খামারিরা প্রতি কেজি ৭০০ টাকা পর্যন্ত উচ্চ মূল্যে এই মুরগি বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. কে. ফজলুল হক ভূঁইয়া প্রযুক্তিটি খামারিদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেন। একই সাথে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিসম্পদ অনুষদের বন্ধ থাকা বিক্রয় কেন্দ্রটি দ্রুত চালুর নির্দেশ দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গবেষণায় উৎপাদিত দুগ্ধ, মাংস ও পোলট্রিজাত সব পণ্য সরাসরি এই বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সুলভ মূল্যে পৌঁছে দেওয়া হবে। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত শিক্ষক, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের মাঝে নতুন উদ্ভাবিত এই মুরগির মাংস দিয়ে প্রস্তুত খাবার পরিবেশন করা হয়।

//ডিবিটেক/ এএইচ/ আইএইচ//