আটককৃতদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি; ৩৩ কোটি টাকারও বেশি পাওনার হিসাব নিয়ে অপারেটরের দ্বিমত

বকেয়ার দাবিতে গ্রাহক ও কর্মীবান্ধব জিপি গঠনের আহ্বান গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মীদের

২০১০-২০১২ সালের লভ্যাংশের ৫ শতাংশ বিলম্ব বকেয়া পরিশোধ এবং একটি গ্রাহক ও কর্মীবান্ধব জনকল্যাণমুখী অপারেটর গঠনের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে ‘গ্রামীণফোনের ৫% বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদ’

বকেয়ার দাবিতে গ্রাহক ও কর্মীবান্ধব জিপি গঠনের আহ্বান গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মীদের
১ জুলাই, ২০২৬ ০০:৪৬  
১ জুলাই, ২০২৬ ১০:৩১  

বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে একটি গ্রাহক, কর্মী ও জনকল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যে কয়েক দফা কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠন ‘গ্রামীণফোনের ৫% বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদ’। ৩০ জুন, মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। 

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ৩০ জুন সকালে গ্রামীণফোন হাউসের সামনে পূর্বঘোষিত শান্তিপূর্ণ গণঅবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দেয় এবং কয়েকজন আন্দোলনকারীকে গ্রেফতারর করে। সংগঠনটির আহ্বায়ক আবু সাদাত মোঃ শোয়েব এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আটককৃতদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানান। 

সংবাদ সম্মেলন থেকে ১ জুলাই থেকে পাওনাদার শ্রমিকদের অধিকারভুক্ত কোনো সম্পত্তিতে গ্রামীণফোন বা তাদের ভেন্ডরদের কর্মচারীদের অনুপ্রবেশ না করার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

অপারেটরটির সাবেক কর্মীদের দাবি করেন, শ্রম আইনের একটি সুনির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী যদি জিপি’র বার্ষিক লভ্যাংশের ওপর ৭৫ শতাংশ হারে বিলম্বিত সুদ হিসাব করা হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৪,০০০ কর্মীর প্রত্যেকে ৩৩ কোটি টাকারও বেশি (মোট প্রায় ৩৩,১৪৭ কোটি টাকা) পাওয়ার অধিকারী হবেন। সংগঠনের যোগাযোগ সম্পাদক আদিবা জেরিন চৌধুরী বলেন, যদি ওই কঠিন ধারাটি প্রয়োগ নাও করা হয়, তাহলেও প্রত্যেকে অন্তত ২২ কোটি টাকা করে পাবেন।

তবে গ্রামীণফোন এই হিসাব ও আইনি ব্যাখ্যা দুটো নিয়েই তীব্র আপত্তি তুলে একে ভুল আখ্যা দিয়েছে। অপারেটরটির দাবি, হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে মুচলেকা দিয়ে ৪,৩০০ জনেরও বেশি কর্মী আগেই স্বেচ্ছায় তাঁদের মূল টাকা তুলে নিয়েছেন এবং তারা আদালতের নির্দেশনা পুরোপুরি মেনে চলেছেন। এ নিয়ে গ্রামীণফোনের অবস্থান ও বক্তব্য স্পষ্ট করেছেন প্রতিষ্ঠানটির হেড অব কমিউনিকেশনস শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেছেন, গ্রামীণফোনের কিছু সাবেক কর্মী চাকরি সংক্রান্ত নানাবিধ দাবি-দাওয়া নিয়ে গত কয়েক মাসে বিভিন্ন সময় জিপি হাউজের সামনে এবং আরো কয়েকটি জায়গায় সমবেত হয়েছেন। আমাদের জানা মতে, তাদের বেশিরভাগ বেশ কয়েক বছর আগেই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যান এবং আইন অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য গ্রহণ করেন। এছাড়া তারা যে দাবিগুলো তুলেছেন সেগুলো বর্তমানে মহামান্য আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতেই খুব দ্রুত এসব বিষয়ের সুষম নিষ্পত্তি হবে। তিনি আরও দাবি করেন, "গ্রামীণফোন এবং এর কর্মীদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও আমাদের নজরে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে, গ্রামীণফোন তার কর্মী এবং কোম্পানির সম্পদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যথাযথ আইনি প্রতিকার নিতে বাধ্য হয়েছে।"

অপরদিকে গ্রামীণফোন এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আদিবা জেরিন এই দাবি খণ্ডন করে বলেন, গ্রামীণফোন শুধু মূল টাকাই দিয়েছে, সুদের বিষয়টি আদালতের রায়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।”

তিনি অভিযোগ করেন, আমরা যখন আদালতের চূড়ান্ত রায়ের একেবারে সন্নিকটে , তখন ২০২৩ সালে কোম্পানি কৌশলে সরকারের বিরুদ্ধে করা রিট প্রত্যাহার করে নেয়। এর ফলে মামলার আইনি গতিপথ পরিবর্তিত হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

সূত্রমমতে, গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মীদের সঙ্গে অপারেটরটির এই বিরোধের সূত্রপাত হয় ২০১০ সালের অক্টোবরে, যখন সরকারি এক আদেশে মোবাইল অপারেটরদের শ্রম আইনের আওতায় এনে লভ্যাংশ তহবিল গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়। গ্রামীণফোন ২০১১ সালে হাইকোর্টে এর বিরুদ্ধে মামলা করে স্থগিতাদেশ নিলেও ২০১৩ সালে সংসদ আইন সংশোধন করে এই তহবিল গঠন স্পষ্টভাবেই বাধ্যতামূলক করে। এরপর গ্রামীণফোন তহবিল গঠন করে নিয়মিত টাকা দিলেও ২০১০ থেকে ২০১২ সালের বকেয়া টাকা ও তার বিলম্বিত সুদ নিয়ে মূল বিরোধটি থেকে যায়।

শ্রম আদালতে দেওয়া কর্মীদের এই বিপুল সুদের দাবিটি বিটিআরসি’র অডিট নিয়ে সরকারের সাথে গ্রামীণফোনের ১ বিলিয়ন ডলারের বিরোধের চেয়েও বড়। তবে আদালত এখনো এ বিষয়ে কোনো রায় দেননি।

 এর আগেও ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাবেক কর্মীদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের জলকামান ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটেছিল। এদিকে, গ্রামীণফোন এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আদিবা জেরিন তাকে শ্রমিক ইউনিয়ন করার কারণে বেআইনিভাবে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় (আইএলও) উত্থাপন করেছেন, যাকে আইএলও ‘গুরুতর’ বলে অভিহিত করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের টেকসই উন্নয়নে এবং জনকল্যাণে ৬ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়: ১. আগামী এক বছরের মধ্যে প্রায় ২০,০০০ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়ে সম্প্রসারণ পরিকল্পনা গ্রহণ। ২. থার্ড-পার্টি কর্মীদের কাজের প্রকৃতি বিবেচনা করে ন্যায্য নীতিমালার আওতায় নিয়মিত কর্মী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। ৩. ডিস্ট্রিবিউশন হাউসে কর্মরত কর্মীদের শ্রম অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা ও ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করা। ৪. কলরেট কমানো, মোবাইল ডেটার মূল্য হ্রাস এবং ডেটার মেয়াদ বৃদ্ধি করে গ্রাহকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা। ৫. করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (CSR) আওতায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক খাতে অধিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। ৬. রাষ্ট্রের প্রতি সকল বৈধ কর ও ভ্যাট যথাসময়ে পরিশোধের মাধ্যমে দায়িত্বশীল করপোরেট সংস্কৃতি শক্তিশালী করা। 

এসময় সংবাদ সম্মেলনে গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মী  কামরুল হাসান, মোবাশ্বের,নেহরুন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। জানাযায়, সকালে গ্রামীণফোন সেন্টারের সামনে থেকে আন্দোলনরত যে ৬ জনকে ভাটারা থানা পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিলো তাদেররকে কোর্ট রাতে জামিনে মুক্তি দিয়েছে।   

//ডিবিটেক/এজেড/আইএইচ//