বাকৃবি গবেষকদের গবেষণায় খামারের ব্রুসেলোসিস ও দুধ উৎপাদন হ্রাসের চাঞ্চল্যকর তথ্য
গবাদিপশুর ব্রুসেলোসিসে প্রতি বছর কোটি টাকার ক্ষতি
- বাকৃবি গবেষকদের গবেষণায় দেখা গেছে ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত গাভী দৈনিক ১.০১ লিটার পর্যন্ত কম দুধ দেয়
- অলক্ষ্যে থাকা সুপ্ত সংক্রমণের কারণেও বড় ডেইরি খামারগুলোতে বছরে গড়ে প্রায় ২ কোটি ৪১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়
- পরিকল্পিত গণটিকাদানের মাধ্যমে প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগে ৮ টাকা ১৪ পয়সা পর্যন্ত ক্ষতি এড়ানো সম্ভব
বাংলাদেশে গবাদিপশুর ব্রুসেলোসিস রোগ শুধু দুগ্ধ খামারের অর্থনীতিতেই বড় আঘাত হানছে না, বরং খামারিদের অজান্তেই কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি করছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষকের দীর্ঘ দুই বছরের গবেষণায় উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, সক্রিয় ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত একটি গাভী সুস্থ গাভীর তুলনায় দৈনিক গড়ে ১.০১ লিটার এবং কোনও বাহ্যিক লক্ষণ ছাড়াই সুপ্ত বা লুকিয়ে থাকা রোগে আক্রান্ত গাভী দৈনিক গড়ে ০.৫৩ লিটার কম দুধ দেয়। এর ফলে দেশের বড় ডেইরি খামারগুলোতে বছরে গড়ে প্রায় ২ কোটি ৪১ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘অ্যানিমেল ডিজিজ’-এ প্রকাশিত এ গবেষণায় দেখা যায়, গাভী বাচ্চা প্রসবের পর ফুল না পড়া বা ‘রিটেইন্ড প্লাসেন্টা’ ব্রুসেলোসিসের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ কারণ।
গবেষণার বিস্তারিত তথ্য জানান প্রধান গবেষক বাকৃবির মেডিসিন বিভাগের ল্যাবরেটরি অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের অধ্যাপক ড. এ কে এম আনিসুর রহমান।
অধ্যাপক ড. এ কে এম আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় আরও ছিলেন—একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সিদ্দিকুর রহমান, অধ্যাপক ড. এম আরিফুল ইসলাম এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তা ও পিএইচডি শিক্ষার্থী মো. শফিউল আলম। গবেষক দলের অন্য সদস্যরা হলেন নাজমুল ইসলাম, বিশ্ব জ্যোতি অধিকারী, শান্তা ইসলাম, আর এস মাহমুদ ও মুহাম্মদ আকতারুজ্জামান। এ ছাড়া রোগ শনাক্তের আধুনিক গাণিতিক পদ্ধতি নিয়ে এই দলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছেন গ্রিসের থেসালি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বিশেষজ্ঞ লেফটেরিস मेलेটিস ও পলিক্রোনিস কস্তুলাস। সরকারের লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এলডিডিপি) অর্থায়নে এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এ গবেষণা সম্পন্ন হয়।
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের প্রধান দুধ উৎপাদনকারী অঞ্চলের ১৭টি বড় বাণিজ্যিক ডেইরি খামার থেকে মোট ২,৬৯৬টি দুগ্ধবতী গাভীর তথ্য ও দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বায়েসিয়ান মিক্সড-ইফেক্টস মাল্টিনোমিয়াল রিগ্রেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে গাভীগুলোকে সুস্থ, সুপ্ত এবং সক্রিয়—এই তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। ড. আনিস বলেন, "সুপ্ত অবস্থায় থাকলে বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও দুধ উৎপাদন কমে যায়। আবার সক্রিয় রোগে গর্ভপাত ও প্রজনন ব্যর্থতা দেখা দেয়।" তিনি আরও সতর্ক করেন, কাঁচা দুধ পানের মাধ্যমে মানুষও এই বিপজ্জনক জুনোটিক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিকল্পিত গণটিকাদানে প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগে ৮ টাকা ১৪ পয়সা পর্যন্ত ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে বিএএস-ইউএসডিএ-র অর্থায়নে অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে গবাদিপশুর এই রোগের স্বল্পমূল্যের টিকা উদ্ভাবন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ইতোপূর্বে বিএএস-ইউএসডিএ-র অর্থায়নে অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে গবাদিপশুর এই রোগের স্বল্পমূল্যের টিকা উদ্ভাবন করা হয়েছে। একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মোছা. মিনারা খাতুন, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. জামিনুর রহমান, বাকৃবির স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মো. রাইসুল ইসলাম, স্নাতকের শিক্ষার্থী অর্ণব সাহা এবং নাহিদুজ্জামান এই গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন।
ব্রুসেলোসিস এর ভ্যাকসিন তৈরির উদ্দেশ্য জানতে চাইলে তথখন অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল হক জানিয়েছিলেন, ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথের (ডব্লিউওএএইচ) নির্দেশনা অনুযায়ী ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত প্রাণীকে হত্যা করে তাকে পুঁতে ফেলতে হবে অথবা ইনসিনারেশন (পুড়িয়ে ফেলা) করে ফেলতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই নির্দেশনা মানা হলেও বাংলাদেশে তা মানা খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। কেননা অন্যান্য দেশে ক্ষতিপূরণ দেয়া হলেও বাংলাদেশে এর ব্যবস্থা থাকলেও প্রয়োগ বললেই চলে। বিদেশি অনেক ভ্যাকসিন থাকতেও এ ভ্যাকসিন টি তৈরির উদ্দেশ্য হলো প্রতিটি অণুজীবের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় অনেক পার্থক্য দেখা যায়, এর উপর ভিত্তি করে ভ্যাকসিনের কার্যক্ষমতা। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় জীবাণু নিয়ে গবেষণা করে ভ্যাকসিন টি তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ কমমূল্যে খামারিদের ভ্যাকসিন (টিকা) সরবরাহ ও জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করেই আমাদের এ ভ্যাকসিনের উদ্ভাবন।
//ডিবিটেক/ বিটিও/ইডিপি//





