প্রযুক্তি মানুষের পাশে দাঁড়াল, নাকি মানুষের ওপর দাঁড়াল?
বাংলাদেশে ডিজিটাল অগ্রগতির গল্প অনেক শোনা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অগ্রগতি কি নাগরিককে আরও স্বাধীন করেছে, নাকি আরও নির্ভরশীল? যোগাযোগ-অধিকারের দৃষ্টিতে বিচার করলে দেখা যাবে, ডিজিটাল ন্যায়বিচার মানে শুধু ইন্টারনেট সংযোগ নয়; এর অর্থ হলো প্রবেশযোগ্যতা, নেটওয়ার্ক ও প্ল্যাটফর্মের দায়িত্বশীল ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, এবং প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব। এই চারটি প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে “ডিজিটাল রূপান্তর” বলা যায়, কিন্তু ন্যায্য বাংলাদেশ গড়া যায় না।
সংযোগের সংখ্যা বাড়লেই ন্যায়বিচার হয় না
বাংলাদেশে এখনো প্রায় অর্ধেক মানুষ সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না। ২০২৫ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৪৮.৯ শতাংশ; ৫৬.২ শতাংশ পরিবারে অন্তত একজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী আছেন; ৭২.৪ শতাংশ পরিবারের কাছে স্মার্টফোন আছে, কিন্তু কম্পিউটার আছে মাত্র ৯.১ শতাংশ পরিবারের। অর্থাৎ আমরা এমন এক ডিজিটাল কাঠামোর কথা বলছি, যা মূলত মোবাইলনির্ভর, সীমিত সক্ষমতাভিত্তিক, এবং বহু ক্ষেত্রে অসম প্রবেশাধিকারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই বাস্তবতায় শুধু “সংযোগ বেড়েছে” বলে আত্মতুষ্টি আসলে বিপজ্জনক। কারণ সংযোগ আর ক্ষমতায়ন এক জিনিস নয়।
প্রবেশযোগ্যতা বাদ দিলে ডিজিটাল রাষ্ট্র আসলে অর্ধেক নাগরিকের রাষ্ট্র
সরকারি মহলে প্রায়ই বলা হয়, দেশে এক হাজারের বেশি ই-সেবা চালু হয়েছে এবং প্রায় ৩৩ হাজার সরকারি ওয়েবসাইট সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সরকারি ও উন্নয়ন অংশীদারদের আলোচনায় স্বীকার করা হয়েছে, বহু প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এখনও এসব সেবা নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারেন না। সহায়ক প্রযুক্তির অভাব, সাশ্রয়ী ইন্টারনেটের ঘাটতি, অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে অ্যাক্সেসিবিলিটি ফিচারের অনুপস্থিতি, এমনকি অনলাইন সেবার শেষ ধাপে আবার কাগজে ফর্ম জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা দেখিয়ে দেয়, ডিজিটালাইজেশন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ন্যায্য ডিজিটালাইজেশন হয়নি। ডিজিটাল ন্যায়বিচার শুরু হয় এই স্বীকারোক্তি থেকে: যে সেবা সবার ব্যবহারের উপযোগী নয়, তা প্রকৃত অর্থে জনসেবা নয়।
নেটওয়ার্ককে যদি সুইচের মতো বন্ধ করা যায়, তবে অধিকার কাগজেই থাকে
বাংলাদেশ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেখেছে, ইন্টারনেট কেবল প্রযুক্তি নয়, এটি নাগরিক জীবনের শ্বাসনালী। দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের ফলে মানুষ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়েছে, তথ্যপ্রবাহ বন্ধ হয়েছে, এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় ডিজিটাল সেবাও ভেঙে পড়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, নেটওয়ার্ক বন্ধ করা প্রশাসনিক কৌশল নয়, এটি নাগরিক অধিকার, অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং জনবিশ্বাসের ওপর সরাসরি আঘাত। কাজেই নেটওয়ার্কের দায়িত্বশীল ব্যবহার বলতে শুধু “নিয়ন্ত্রণ” বোঝালে চলবে না; বোঝাতে হবে স্বচ্ছতা, আইনসঙ্গততা, প্রয়োজনীয়তা এবং জবাবদিহি।
ইন্টারনেটকে নাগরিক অধিকার বলা যথেষ্ট নয়, সেটি বাস্তবে সুরক্ষিতও হতে হবে
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ নিয়ে সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এতে প্রথমবারের মতো ইন্টারনেট অ্যাক্সেসকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটি নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু কঠিন প্রশ্ন হলো: যদি একই রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনে সহজেই নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে পারে, তবে সেই অধিকার কতটা বাস্তব? অধিকার তখনই অর্থপূর্ণ, যখন তা প্রশাসনিক ইচ্ছার ওপরে আইনি সুরক্ষা পায়। নইলে “ইন্টারনেট অধিকার” বাক্যটি নীতিগত সৌন্দর্য হয়ে থাকে, কার্যকর নাগরিক গ্যারান্টি হয়ে ওঠে না।
প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা চাই, কিন্তু দমনমূলক নীরবতা নয়
বাংলাদেশে অনলাইন প্রতারণা, ঘৃণা, যৌন হয়রানি, শিশু নির্যাতন, এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কিন্তু নিরাপত্তার নামে যদি এমন কাঠামো তৈরি হয়, যেখানে কনটেন্ট সরানো, তদন্ত, নজরদারি বা শাস্তির প্রক্রিয়া অস্পষ্ট থাকে, তবে তা সহজেই স্বাধীন মতপ্রকাশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। বাংলাদেশকে এখন এই সূক্ষ্ম কিন্তু জরুরি ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে: প্ল্যাটফর্মকে নিরাপদ করতে হবে, কিন্তু সমাজকে নীরব করে নয়। দায়িত্বশীল প্ল্যাটফর্ম শাসন মানে কেবল কনটেন্ট সরানো নয়; এর মানে হলো স্বচ্ছ নিয়ম, বাংলা ভাষায় কার্যকর সুরক্ষা, আপিলের সুযোগ, এবং ব্যবহারকারীর মর্যাদা রক্ষা।
ডাটা সুরক্ষা ছাড়া ডিজিটাল রাষ্ট্র খুব সহজেই নজরদারি রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে
বাংলাদেশে ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ গেজেট হয়েছে, এবং আইনের ভাষায় ব্যক্তিগত উপাত্তকে ব্যক্তির মালিকানাধীন বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই প্রথমবার রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিচ্ছে যে নাগরিকের তথ্য কেবল প্রশাসনিক সম্পদ নয়। কিন্তু এখানেই আত্মতুষ্টির জায়গা নেই। ডাটা সুরক্ষা আইন থাকলেই ডাটা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। যদি নাগরিকের সম্মতি প্রকৃত না হয়, যদি অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত থাকে, যদি ডাটা শেয়ারিংয়ের সীমা অস্পষ্ট থাকে, যদি স্বাধীন তদারকি না থাকে, তবে আইন কাগজে থাকবে, আর ক্ষমতা থাকবে প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে। ডিজিটাল ন্যায়বিচার বলে: নাগরিককে সেবা নিতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বন্ধক রাখতে বাধ্য করা যাবে না।
নারীর জন্য অনলাইন ভয়ের জায়গা হলে ডিজিটাল অগ্রগতি ভুয়া হয়ে যায়
প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ আছে এমন নারীদের মধ্যে ২০২৪ সালের জরিপে দেখা গেছে, ৮ শতাংশের বেশি জীবদ্দশায় প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন, আর গত এক বছরে এই হার ৫ শতাংশের বেশি। এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রমাণ করে যে অনলাইন পরিসর বহু নারীর জন্য সমান অংশগ্রহণের জায়গা নয়, বরং ঝুঁকি, লজ্জা, ভয় এবং ব্ল্যাকমেইলের ক্ষেত্র। যে ডিজিটাল স্পেস নারীর কণ্ঠকে টিকতে দেয় না, তাকে উন্নত বলা যায়, ন্যায্য বলা যায় না। যোগাযোগ-অধিকারের দৃষ্টিতে নারীর ডিজিটাল নিরাপত্তা কোনো আলাদা “নারী বিষয়ক” প্রশ্ন নয়; এটি মূলধারার নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন।
প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব মানে বিদেশবিরোধিতা নয়, জনস্বার্থে নিয়ন্ত্রণক্ষমতা
বাংলাদেশের সামনে এখন আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব। এর অর্থ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়; বরং এমন সক্ষমতা গড়ে তোলা, যাতে গুরুত্বপূর্ণ ডাটা, সফটওয়্যার, এআই সিস্টেম এবং সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামো জনস্বার্থভিত্তিক মানদণ্ডে পরিচালিত হয়। খসড়া জাতীয় এআই নীতি ২০২৬-২০৩০-এ ওপেন স্ট্যান্ডার্ড, interoperable APIs, National Source Code Repository, এবং vendor dependency কমানোর কথা বলা হয়েছে। এই দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যদি রাষ্ট্রের ডিজিটাল ব্যবস্থা এমন প্রযুক্তির ওপর দাঁড়ায়, যা নাগরিক অডিট করতে পারে না, স্থানীয়ভাবে বোঝা যায় না, এবং জনঅর্থে তৈরি হয়েও জননিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, তবে সেটি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হতে পারে, কিন্তু সার্বভৌম উন্নয়ন নয়।
বাংলাদেশের এখন কী করা দরকার
বাংলাদেশের ডিজিটাল ন্যায়বিচারের রূপরেখা জটিল নয়, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর। প্রথমত, অ্যাক্সেসিবিলিটিকে সব সরকারি ডিজিটাল সেবায় বাধ্যতামূলক নকশাগত শর্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নেটওয়ার্ক বন্ধ বা সীমিত করার ক্ষমতার ওপর কঠোর আইনগত নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও স্বাধীন পর্যালোচনা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, প্ল্যাটফর্ম নিরাপত্তাকে নাগরিক স্বাধীনতার প্রতিদ্বন্দ্বী বানানো যাবে না। চতুর্থত, ডাটা সুরক্ষাকে প্রশাসনিক অনুশীলন নয়, নাগরিক অধিকার হিসেবে কার্যকর করতে হবে। পঞ্চমত, প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বকে ওপেন স্ট্যান্ডার্ড, স্থানীয় ভাষা, জনঅর্থে তৈরি কোডের জবাবদিহি, এবং জনগণের অডিট-অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অন্যথায় “ডিজিটাল বাংলাদেশ” শুধু এক প্রযুক্তিগত স্লোগান হয়ে থাকবে।
কেমন ডিজিটাল রাষ্ট্র চাই?
বাংলাদেশের সামনে আসল সিদ্ধান্তটি প্রযুক্তিগত নয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক। আমরা কি এমন ডিজিটাল রাষ্ট্র চাই, যেখানে নাগরিক সুবিধা পাবে কিন্তু স্বাধীনতা হারাবে? নাকি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের কণ্ঠ, অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে শক্তিশালী করবে? যোগাযোগ-অধিকারের দৃষ্টিতে উত্তর একটাই: ডিজিটাল ন্যায়বিচার ছাড়া ডিজিটাল অগ্রগতি টেকসই নয়। প্রযুক্তি তখনই উন্নয়ন আনে, যখন তা নাগরিককে সক্ষম করে; যখন তা শুধু রাষ্ট্রকে আরও দক্ষ নয়, আরও জবাবদিহিমূলকও করে।
বাংলাদেশের সামনে এখন আসল প্রশ্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের নয়, ক্ষমতার ব্যবহারের। ডিজিটাল রাষ্ট্র কি নাগরিককে সক্ষম করবে, নাকি কেবল তাকে আরও নজরদারি, নির্ভরশীলতা এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ঠেলে দেবে? যদি ইন্টারনেট থাকে কিন্তু তা সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য না হয়, যদি প্ল্যাটফর্ম থাকে কিন্তু মানুষ নিরাপদে কথা বলতে না পারে, যদি সেবা থাকে কিন্তু তার বিনিময়ে নাগরিককে নিজের ব্যক্তিগত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ হারাতে হয়, তবে তাকে ডিজিটাল অগ্রগতি বলা যেতে পারে, ডিজিটাল ন্যায়বিচার নয়।
এখন সময় এসেছে স্লোগান থেকে সরে এসে জবাবদিহির রাজনীতিতে প্রবেশ করার। বাংলাদেশে ডিজিটাল ভবিষ্যৎ ন্যায্য হবে কি না, তা নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নে: প্রযুক্তি কি মানুষের অধিকারকে শক্তিশালী করছে, নাকি কেবল শাসনক্ষমতাকে আরও কেন্দ্রীভূত করছে? রাষ্ট্র, বাজার এবং প্ল্যাটফর্ম যদি নাগরিকের কণ্ঠ, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার না দেয়, তবে “স্মার্ট” শব্দটি শুধু অলংকার হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের এখন দরকার এমন ডিজিটাল ব্যবস্থা, যা দ্রুত নয় শুধু, ন্যায্যও; আধুনিক নয় শুধু, মানবিকও; বিস্তৃত নয় শুধু, অন্তর্ভুক্তিমূলকও। কারণ ডিজিটাল ন্যায়বিচার ছাড়া ডিজিটাল রূপান্তর শেষ পর্যন্ত কেবল অসমতাকে প্রযুক্তির ভাষায় পুনর্লিখন করে।
বাংলাদেশে এখন প্রশ্ন প্রযুক্তি কতদূর এগোল তা নয়, বরং প্রযুক্তি মানুষের পাশে দাঁড়াল, নাকি মানুষের ওপর দাঁড়াল।
লেখকঃ বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর



